কাঁটাতারহীন বিশ্বটাই রবীন্দ্রনাথের সুরের পৃথিবী

| বুধবার , ১৩ মে, ২০২৬ at ৭:৪২ পূর্বাহ্ণ

আমাদের সাহিত্যে একমাত্র নোবেল জয়ী কবিগুরু রবি ঠাকুরের জীবনে ৭ তারিখ টা জড়িয়ে আছে। তাঁর জন্ম ৭ মে ১৮৬১ এবং মৃত্যু ৭ আগস্ট ১৯৪১ সাল। এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষটির গানের সুর নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেন। কেউ বলেন, তিনি নাকি ভারতের বাইরের বিভিন্ন দেশে ঘুরতে গিয়ে গান শুনেছেন তাঁর সুরের উপর কথা বসিয়ে গান সৃষ্টি করেছেন। এসব রটনা বা রিউমার নিয়ে আমি ছোটবেলা থেকেই একটু উৎসুক ছিলাম। তাই পড়াশোনা করেছি এবং জানতে চেয়েছি আপামর জনগণের এসব কথাবার্তা কতটুকু সত্য। এসব যারা বলেন তাদের কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন তাঁর সুরের কী কোনো দেশ আছে? তিনি তো বিশ্বের কবি। আমি মনে করি রবীন্দ্রনাথের গানে তাঁর বিশ্বায়িত কল্পনাশক্তির নির্ভুল দিকচিহ্ন পাওয়া যায়। এসব বিষয়ে পড়াশোনা করে যতটুকু মনে হয়েছে কবি গুরু তরুণ বয়সের পর আর সরাসরি বিদেশি গানের সুরে কথা বসাননি। ‘অল ল্যাং সাইন’এর সুরে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, ‘ইয়ে ব্যান্‌কস অ্যান্ড ব্রিজ’এর সুরে ‘ ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’, অথবা ‘ ব্রিটিশ গ্রেনেডিয়ার’এর সুরে ‘ কালমৃগয়া’র ‘ তুই আয় রে কাছে আয়’ সবই তাঁর একুশ বা বাইশ বছরের মধ্যে করা কাজ।

কিন্তু আশৈশব শোনা পাশ্চাত্য সুর, বিটোফেনমোৎজার্টবাখওয়াগনার, অথবা পরবর্তী কালের স্ট্রাউস বা চায়কভস্কি তাঁর মননে যে ছাপ ফেলেছিল, জোড়াসাঁকোয় একই সঙ্গে চলতে থাকা পিয়ানো আর যদু ভট্টের গান যে ভাবে মিলেমিশে গিয়েছিল তাঁর সঙ্গীত বোধে, রবীন্দ্রনাথের সুর সারা জীবন বহন করেছে সেই উত্তরাধিকার। কিন্তু সে কথায় যাওয়ার আগে প্রত্যক্ষ বিদেশি সুরের কথাই বলি। চার মাত্রার গান ‘অল ল্যাং সাইন’ নিলেন তিনি কিন্তু ‘ পুরানো সেই দিনের কথা’ বাঁধলেন তিন মাত্রায়, লয় কমিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে গানটা তাঁর নিজস্ব হয়ে গেল। অথবা, সেনাবাহিনীকে উজ্জীবিত করার জন্য যে ‘ব্রিটিশ গ্রেনেডিয়ার’ গানটি , তার সুর সামান্যতম না বদলেও তাঁকে পরিয়ে দিলেন শৃঙ্গারের আভরণ্ত‘ কালমৃগযায় ঋষি কুমার গাইল, ‘তোর হাতে মৃণালবালা’ তোর কানে তাঁহার দুল, তোর মাথায় বেলের সিঁথি, তোর খোঁপায় বকুল ফুল।’ গানের শরীর থেকে খসে গেল বারুদের গন্ধ, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে স্নিগ্ধ করলেন।

শুরুতেই বলেছিলাম, তরুণ বয়সের পর আর সরাসরি বিদেশি সুর নেননি রবীন্দ্রনাথ, তবে পাশ্চাত্যের সুরের চলন থেকে গিয়েছে তাঁর গানের অন্তঃপুরে। কিন্তু, তারুণ্যে প্রবেশ করার আগেই, কিশোর রবি যখন ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ লিখেছেন ? তাঁর ভাষা বৈষ্ণব কবিদের, সুরের বহিরঙ্গে রয়েছে কীর্তন। কিন্তু, অন্তরে? ‘গহনকুসুম কুঙ্‌জমাঝে’ গানটিকে যদি একটু লয় বাডিয়ে পিয়ানোতে বাজানো যায়, নির্ভুল ফুটে উঠবে, ‘ওয়াল্টজের’ চলন।

বলরুমে যে সুরে নাচ হয়, রাধা কৃষ্ণকে রবীন্দ্রনাথ বেঁধেছেন সেই সুরের চলনে। একবার নয়, বারবার। আবার, যে গান নিতান্ত ব্যক্তিগত, সেখানে নিয়ে আসছেন কীর্তনের সুর ‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়’ তার সুরকে কোনো প্রচলিত খাঁচায় বন্দি করতে পারা অসম্ভব। মাঝে মাঝে মনে হয়, জন লেনন যে গেয়েছিলেন, ‘ইম্যাজিন’, দেয়ার’স নো কান্ট্রি’ ্তসেই কাঁটাতারহীন বিশ্বটাই রবীন্দ্রনাথের সুরের পৃথিবী।

কীভাবে চলত তাঁর সুরের মন, সত্যজিৎ রায় ধরতে পেরেছিলেন। ‘ঘরে বাইরে’তে বিমলা যখন বাইরে আসছে, দীপক চৌধুরীর সেতার তখন বাজছে, ‘এ কী লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণেশ হে’। সেতারে স্বভাবত যতখানি মিড থাকে, এই ক্ষেত্রে তার চেয়ে কম। আর তার পরই বেজে উঠছে অর্কেস্ট্রা চেলে, ভিয়োলা, ভায়েলিন উদযাপন। প্রশ্ন হল, সত্যজিৎ এখানে এই অর্কেস্ট্রা পেলেন কীভাবে? রবীন্দ্রনাথ তাঁর বীজ রেখে গিয়েছিলেন বলেই পেলেন। গানের হারমোনিক প্রগ্রেশন সেই অবকাশ তৈরি করে দেয় বলেই পেলেন। প্রত্যক্ষ ভাবে তো এই গান বিদেশি সুর থেকে পাননি রবীন্দ্রনাথ। সাবিত্রী দেবীর কণ্ঠে ত্যাগরাজের সুরে বিখ্যাত ‘লাবণ্যে পূর্ণ রানা’ শুনে তার থেকে তৈরি করেছিলেন গানটি। অথচ তাঁর কাঠামোয় নির্ভুল ভাবে ছিল বাখ, ব্রাহমসের প্রভাব সত্যজিৎ এখানে রবীন্দ্রনাথকে ডিকোড করলেন, ডিকনষ্ট্রাক্ট করলেন কিন্তু, অর্কেস্ট্রা রেখে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথই। এমন ভাবে, যাতে আপাতদৃষ্টিতে তা ধরা না পড়ে। তাকে ধরতে প্রয়োজন হয় সত্যজিতের মতো কোনোও জিনিয়াসকে। অন্য একটি গান ‘সহে না যাতনা’ শুনে দেখুন, তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ।

কোথা থেকে তাঁর সুর নিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ? কেন নিচ্ছেন ? প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা এখন গুগল খুঁজলেই পাওয়া যায়। দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে হলে অন্তরে তাকাতে হবে। ‘হরিনাম দিয়ে জগৎ মাতালে একলা নিতাই’এর সুর থেকে তৈরি হল ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’। সুরের খাপে খাপে বসে গেল কথা। কিন্তু এই সুরটাই কেন?

তার কারণ কি এই নয় যে, শ্রীচৈতন্যকেও ‘একলা’ই চলতে হয়েছিল? স্রোতের বিপরীতে, বিরুদ্ধতার বাঁধ ঠেলে সেই চলাকেই কি তার একলা চলার গানে স্বীকৃতি দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ? এই প্রশ্নের তর্কাতীত উত্তর পাওয়া যাবে না। কিন্তু তর্কটা শুরু করা দরকার। অন্য দিকে, অনেকে যাতে এক সঙ্গে গেয়ে উঠতে পারেন ‘বন্দে মাতরম’, তার জন্য গানটির আগের সুরকে পাল্টে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। নিলেন সেই দেশ রাগকেই, কিন্তু সুরের চলনকে ভেঙে দিলেন ছোট টুকরায়, যাতে সহজে গাওয়া যায় সেই গান। আবার, সেই বন্দে মাতরম্‌ ধ্বনি এল তাঁর গানে, রূপ পাল্টে ঝিঁঝিট রাগ হয়ে তো বটেই গানের চলনও পাল্টাল। ‘এক সুত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’ একেবারে লং মার্চ সং। এমন ভাবে তৈরি, যাতে হারমোনাইজ করা যায়। ‘সহস্রটি মন’ এক সঙ্গে চলতে হলে মার্চিং সংই তো দরকার।

আসলে তিনি কী দেখছেন, আর তাঁর শিল্পে সেই দেখা কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে তাঁর আঁকা ছবি। তিনি দেখছেন নদী, আঁকছেন চোখ। দুইয়ের মধ্যে মিল, উভয়ের বিস্তার। মনে হয়, পৃথিবীর সব সমুদ্র থেকে, সব প্রান্তর থেকে মণিমুক্তো এসে জড়ো হয়েছিল তাঁর মনের ঘরে। তারপর সেই ঘরের দরজা যখন খুলল, সঞ্চিত ঐশ্বর্যের দ্যুতিতে চোখ ঝলসে গেল। কিন্তু, তখন আর আলাদা করে বলার উপায় নেই যে, কোন মণিটি বিশ্বের কোন প্রান্ত থেকে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর দেশের মাটিতে মাথা ঠেকিয়েছেন বারং বার। কিন্তু তিনি জানতেন, সেই মাটিতেই বিশ্বময়ীর, বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা আছে। এই বিশ্বায়িত মন তাঁর গানকে আলাদা করেছিল, তাঁর গানকে পাশ্চাত্য কাঠামো দিয়েছিল। বাংলার নিজস্ব রামপ্রসাদী নিধুবাবুর টপ্পা, হাজার চেষ্টা করলেও তাকে অর্কেস্ট্রায় বসানো যাবে না। সে সব অনন্য সম্পদ, কিন্তু তার কোনও পরতে সাগর পারের আহ্বান নেই।

রবীন্দ্রনাথের আছে তাঁর গানে রাগরূপ বজায় থাকছে না। এই নিয়ে কম অপমান সহ্য করতে হয়নি রবীন্দ্রনাথকে। তিনি ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। এখন মনে হয়, কী অকারণ আক্রমণ! রাগের কাঠামোয় বাঁধা পড়ার কথা তো তাঁর নয়। তাঁর সৃষ্টির তো কোনও ভূগোল নেই। সীমান্তবিহীন দেশে দেশে তাঁর সুরের অবাধ বিস্তার।

তুমি রবে নীরবে’ গানটার কথাই ধরা যাক। এই গানের চলন সান্ধ্য সন্ধ্যাবেলার বিষণ্ন, নুয়ে পড়া আকাশ রয়েছে এই গানের সুরে। ‘নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা’ কথাটা উচ্চারণ করার জন্য গানের সুর নামছে উদারার পঞ্চমে শুনলে মনে হয়, যেন চেলো কনচের্তো বাজছে। সেখান থেকে গান যখন ‘মম জীবন যৌবন’ পেরিয়ে পৌঁছচ্ছে ‘মম অখিল ভুবন’ কথাটিতে, সুর ছুঁয়ে আসছে তারার পঞ্চমে দুই সপ্তকের দূরত্ব অতিক্রম করছে সুর, দুই পঙক্তির ব্যবধানে। তার পর সেই ঝড় স্তব্ধ হচ্ছে, গান এসে দাঁড়াচ্ছে মুদারার শুদ্ধ গান্ধারে।

লেখক: প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউর্মি ও বুলেট : মানবতার এক অমর কাহিনি
পরবর্তী নিবন্ধদূরের টানে বাহি পানে