মৃত্যুকে ভয় না করলেও বিশেষ করে বার্ধক্যের সময় মৃত্যুচিন্তা যে কবির মনে ধীরে ধীরে ঠাই করে নিয়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় কবির কাছের মানুষের সঙ্গে আলাপ চারিতায়। ১৯১৫ সালে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে কবি লিখেছেন শরীর–মনের কিছু সমস্যার কথা। কিছুদিন থেকে আমার মনের মধ্যে যে উৎপাত দেখা দিয়েছে সেটা শারীরিক ব্যামো। প্রথম কিছু কাল থেকেই একটা নার্ভাস ব্রেকডাউল হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। যখন কানে এবং মাথার বাঁ দিকে ব্যথা করতে লাগল তখন বুঝেছিলাম সেটা ভাল লক্ষণ নয়। এই ধরনের মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথের জীবনে বারবার এসেছে। ১৯১১ সালে ডাক্তারের বর্ণনার সময় এ ধরনের চিন্তা তাকে প্রায় গ্রাস করেছিল।
কবিগুরু সাধারণত স্বাভাবিক মৃত্যুকে ভয় করতেন না। তবে কোন অস্বাভাবিক মৃত্যু যেমন অপঘাত, অস্ত্রাঘাত এমন মৃত্যুকে ভয় পেতেন। এ প্রসঙ্গে জয়ন্ত রায়কে ১৯৩৯ সালে তিনি বলেছিলেন শান্তিপূর্ণ মৃত্যুকে বিন্দুমাত্র ভয় করি না। ভয় করি অপঘাত, অস্ত্রাঘাতের মৃত্যুকে। যেন মৃত্যুর পূর্বে হাসিমুখে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারি। সেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে কোন দ্বিধা করি না। অথচ অস্ত্রাঘাতের কারনেই কবিগুরুর মহাপ্রয়াণ ঘটলো। রবীন্দ্রনাথের নাতবৌ অমিতা ঠাকুরের কাছ থেকে শোনা, প্রতিমা দেবী বারবার আক্ষেপ করে বলতেন বাবা মশায়ের যাবার সময় সেই যন্ত্রণার চিন্তা চোখে মুখে থেকে গেল। প্রোস্টেট গ্ল্যান্ডের উৎপাত অসুখের মূল কারণ। মাঝে মধ্যে এ উৎপাত বাড়লেও ভীষণ রূপ কিন্তু নেয় পরে। ১৯৪১ সাল ৩০ শে জুলাই ছোট্ট একটি অপারেশন হয় মাত্র পঁচিশ মিনিটে। ফুটো করে আলাদা নল বসিয়ে ইউরিন বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা। এই ছোট্ট অপারেশনেই হয়ে গেল সেপটিক। ইউরেমিয়া শরীরে ঝাঁকিয়ে বসলো। বলেছিলেন তিনদিন পার হলে নিশ্চিত হওয়া যাবে কিন্তু তিন দিনের মাথায় কবি গুরু অজ্ঞান হয়ে যান। তবে এ সন্দেহ যেন কারো না জাগে যে চিকিৎসার ত্রুটি হয়েছিল। তাঁকে দেখেছেন সেকালের সব বড় বড় ডাক্তার, যেমন স্যার নীলরতন সরকার, বিধান চন্দ্র রায়, ইন্দ্রভূষণ বসু, সমীর সেন, সত্যেন রায় প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথ অস্ত্রোপচারের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন কবিরাজী চিকিৎসা করাতে। কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ শুরু করেছিলেন কবিরাজী চিকিৎসা, স্যার নীল রতন সরকারও ছিলেন অপারেশনের বিরুদ্ধে। কিন্তু বিধান রায় ও অন্য ডাক্তারেরা অপারেশন চান। দ্বিমতে বিপন্ন কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ রায় শেষ মুহূর্তে অপারেশনের জন্য রায় দেন। ডাক্তার বিধান রায়ের মত ছিল অপারেশন ছাড়া এ রোগের কোন চিকিৎসা নাই। যদি না করা হয় পরে জাতির কাছে অপরাধী হয়ে যাবো।
সে মুহূর্তে কবিগুরু বলতেন কী দরকার এমনিতেই আর কয়টা দিন বাঁচি। যে কয়টা দিন বাঁচবো দৈহিক গ্লানী একটু কম থাকলেইতো হয়। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এ কথা শোনে না। তারপর ৬ই আগস্ট একুশে শ্রাবণ রাখী পূর্ণিমার জোয়ারে শরীর আরো অবনতির দিকে যায়। কবিগুরু বুঝলেন আর হেসে বললেন, ’মরণ চরণে স্মরণ নিয়েছে আর তাকে বিমুখ করবো না’। সেই অন্তিম মুহূর্তে পৌঁছিয়েই তার মধ্যে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত এক আত্মসমর্পণের ভাব। কবিগুরু বললেন, ‘অনেকতো বেঁচেছি, বিধাতার বিরুদ্ধে আমার কোন নালিশ নেই, তিনি আমাকে অনেক দিয়েছেন, সব তোদের কাছে রেখে গেলাম’। পরদিন সেই ঐতিহাসিক ৭ ই আগস্ট ২২ শে শ্রাবণ ধ্যান ভঙ্গ করে কবিগুরু অন্তিম যাত্রা। ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’।














