আতশ কাচ

সনিয়া কাদেরী | মঙ্গলবার , ৫ মে, ২০২৬ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

মা তুমি যেনো ছিলে সেই অত্যাশ্চর্য আতশ কাচটিনয় মাস মাতৃজঠরের নরম আলো আঁধারিতে অভ্যস্ত সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুটি যখন চোখ ধাঁধানো উৎকট আলোয় হতচকিত, তখন জগতের সব আলোকরশ্মিকে কেন্দ্রীভূত করে আলোর দিশারী হয়ে ওঠা সেই আতশ কাচটি ছিলে তুমি মা, যার মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয়ে উঠেছিলো জন্মলগ্নে ক্ষুদ্র আমার আমিত্ব।

টলোমলো পা ফেলা ছোট্ট আমাকে স্থির হাতে ধরে রেখেছো, যেনো সদা বিচ্ছুরিত বিশৃংখল আলোক কণাগুলোকে জড়ো করে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছো আত্মঅন্বেষণের এই জীবনযাত্রায় স্থির অবিচল থাকতে। অপরিণত আমার অজস্র দোষত্রুটিগুলোও যেনো সেই আতশ কাচের মধ্য দিয়ে কোমল আলোয় ধরা দিতো, আত্মসমালোচনা নয়, বরঞ্চ নিজেকে শোধরানোর জীবনপাঠগুলি সহনীয় হয়ে উঠতো তোমার মহানুভবতায়।

মা তুমি ছিলে সেই অলৌকিক প্রিজমাকার আতশ খণ্ডটি। যেখানে বয়োঃসন্ধির অজানা নিরাকার আবেগগুলি সাত রঙে বিশ্লিষ্ট হয়ে সুস্পষ্ট আকার ধারণ করত তোমার আদর, মায়া, স্নেহ, দয়া, সহমর্মিতা, উদারতা, আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে। মা তুমি ছিলে সেই আশ্চর্য শক্তিধর স্ফটিকের মতন, হাজার যোজন ইথারে ভ্রমণ করে পৌঁছানো, যা থেকে নির্গত আলোকিত বাণী বড়বেলায় ও আমার প্রতিটি দিনকে নতুন আলোয় দীপ্তিময় করে তুলতো ।

দুবছর গড়িয়ে গেলো আমার সে আতশ কাচটি লক্ষাধিক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র টুকরোয় হয়েছে চুরমার, অসীম এই বিশ্বব্রহ্মাান্ডে মিলেমিশে বিলীন পঞ্চইন্দ্রিয়ের সকল অনুভূতি উজাড় করেও পাইনি নাগাল তার। তবে কি এতোটাই ভঙ্গুর ছিলো আতশ কাচটি তা বোঝার আগেই হারিয়ে গেলো চিরতরে গহীন অতলে, আগলে রাখতে না পারার ব্যর্থতা জগদ্দল পাথরসম যেনো। যাপিত প্রহরগুলি কেটে গেছে নিশ্চুপ হাহাকারে, নিকষ কালো আঁধারে।

অলীক আশায় হাতড়ে ফিরেছি বারবার আতশ কাচটি বহুদিন। সে আতশ কাচের বিনাশ নেই তা বুঝিনি আগে, সে ফিরে আসে নতুন রূপে, মেঘাচ্ছন্ন শোকাতুর হৃদয় আড়াল করে রেখেছিলো তার অপার্থিব ছটা।

আদতে অগণিত আতশ কাচের টুকরো ছড়িয়ে আছে সবখানে প্রতিটি সূর্যোদয়ের রশ্মির মাঝে। প্রতিটি শিশির সিক্ত ঘাসের ডগায় বিচ্ছুরিত ক্ষুদ্র আলোকনায়। মা নামের সেই আতশ কাচটি অবিনশ্বর হয়ে রয়ে যায় মণিকোঠায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদুর্বল বিচার, বাড়ছে ছিনতাই ও মাদক
পরবর্তী নিবন্ধমক্কাতুল মুকাররমাহ থেকে মদিনাতুল মুনাওয়ারাহ : মানুষ গড়ার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রা