চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও প্রাসঙ্গিক কথা

ড. মোঃ আবুল কাসেম | সোমবার , ৪ মে, ২০২৬ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা তিনটি কারণে দেখা যাচ্ছে, যেমন হঠাৎ ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পসমূহের চলমান কাজ এবং জনগণের সচেতনতার অভাব। উল্লেখ্য যে, গত মঙ্গলবার (২৮ শে এপ্রিল) পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৬ মিলিমিটার, তাতে কিন্তু জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় নাই, সৃষ্টি হয়েছে অল্প সময়ে অধিক পরিমাণ বৃষ্টি হওয়াতে। সাধারণত এপ্রিল মাসে ১১৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার তথ্য আছে, তাতে প্রতি ঘন্টায় বৃষ্টির গড় পরিমাণ ০.১৭ মিলিমিটারের নিচে কিন্তু মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ঐ তিন ঘণ্টার বৃষ্টির পরিমাণ ছিল তার ১০০ গুণ বেশি। বৃষ্টির সাথে তাল মিলিয়ে পানি সরে যেতে না পারায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যেই সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোড, বদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার, প্রবর্তক, মেডিকেল এলাকা, বাকলিয়া এক্সেস রোড, দক্ষিণ বাকলিয়া, রাহাত্তরপুল পশ্চিম বাকলিয়া পুরাটাই পরিদর্শন করেন। প্রবর্তক, পাঁচলাইশ ও কাতালগঞ্জ এই তিনটি এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বাঁধের ফলে কোমর ও বুকসমান পানি দেখতে পান। এ খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সরে জমিনে জনদুর্ভোগ দেখে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্রিগেডের সাথে আলোচনা করে বিকাল ৩ টার দিকে বাঁধগুলো খুলে দেওয়ার পরামর্শ দেন, তাতে ধীরে ধীরে পানি কমে যায় এবং জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। অন্যদিকে, ২৮ এপ্রিল অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন স্থান পানিতে ডুবে যাওয়ার বিষয়টি বুধবার (২৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ তুলে ধরেন বিএনপির সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রী সমস্যাটা উপলব্ধি করে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে চট্টগ্রামে পাঠান। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বুধবার রাত থেকেই বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন। একই দিনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর পানির ওপর ভাসছে এ রকম দৃশ্য সরেজমিনে দেখেন নাই। ‘বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কাল্পনিক। ২০২৪ সালের ছবি প্রচার করে একটি অপপ্রচার চালানো হয়েছে। আমাদের একজন সংসদ সদস্য বা খবরের ওপর ভিত্তি করে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) দুঃখ প্রকাশ করে ফেলেছেন। প্রতি মন্ত্রীর এ বক্তব্য আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে, আমরা যা স্বচক্ষে দেখলাম সবই কি ভুল?

আসলে ২৮ তারিখ, মঙ্গলবারের বাস্তব চিত্রটা প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের দেখার সুযোগ হয়নি, কারণ তিনি ভারী বর্ষণের প্রায় ৩০ ঘণ্টা পরে অর্থাৎ বুধবার রাতে চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন। তিনি যদি মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৩টার মধ্যে আসতেন, প্রকাশিত তথ্যগুলোর সাথে মিল খুঁজে পেতেন, এলাকাগুলো পরিদর্শনের স্পিডবোট বা নৌকার প্রয়োজন হতো এবং সাঁতার জানার অভিজ্ঞতার ও প্রয়োজন হতো। জলাবদ্ধতা দুই ধরনের স্থায়ী এবং অস্থায়ী। মঙ্গলবারে হঠাৎ ভারী বৃষ্টির কারণে অস্থায়ী জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম শহরের অধিকাংশ জায়গা ডুবে যায়, এবং জনগণ দুর্ভোগের শিকার হন এ তথ্য কিন্তু সকলের জানা।

উল্লেখ্য যে, মেয়র মহোদয়সহ সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্তারা প্রতিমন্ত্রীকে যেসব এলাকা ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন, সেগুলো চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সম্পর্কে প্রকৃত চিত্র পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, বাদুড়তলা, ডিসি রোড, শুলকবহর এই সমস্ত জায়গায় নিয়ে গেলে তিনি কিছুটা আঁচ করতে পারতেন। যদিও জলাবদ্ধতার প্রকৃত চিত্র তিনি সরেজমিনে দেখতে পান নাই তবুও তিনি আন্তরিকভাবে জলাবদ্ধতাসংকটের বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন এবং খালগুলো পুনরুদ্ধারের চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ করার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। অন্যদিকে সাঈদ আল নোমান প্রধানমন্ত্রীকে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার বাস্তব চিত্রটা তুলে ধরে সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি তার দায়িত্ব পালন করেছেন, যেটা চট্টগ্রাম শহরে বসবাসরত ৭০ লক্ষ লোকের মনের কথা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জলাবদ্ধতার কারণে কষ্টের শিকার হওয়া চট্টগ্রাম মহানগরের বাসিন্দাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তাদের ভালোবাসা অর্জন করছেন। অপারগতা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ, বিপদে জনগণের পাশে থাকা, একাত্মতা ঘোষণা করা, গণমানুষের অন্তরের ভাব অনুধাবন করা ইত্যাদি আমাদের সংস্কৃতিতে নেই, যেটা পৃথিবীর সব দেশে আছে, তার ব্যবহার থাকলে আমাদের দেশে ৫ই আগস্ট হয়তো আসত না। অতীত ভুলে গেলে চলবে না, অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে, কাজ কর্মে, কথাবার্তায় এবং ব্যবহারে দাম্ভিকতা পরিহার করে, সত্য উপস্থাপন করে জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে হবে। বর্তমান গণমাধ্যম এবং তরুণ প্রজন্ম খুবই সচেতন, এ ব্যাপারে প্রতিনিধিদেরকে খুব সচেতন থাকতে হবে। মাননীয় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সামান্য দুঃখ প্রকাশ করে কোনও ভুল করেননি বরং একটি শব্দের মাধ্যম চট্টগ্রাম বাসীর মন জয় করে নিয়েছেন। জাতীয় সংসদে অন্যান্য সাংসদ এবং মন্ত্রীরা যেভাবে আলাপ আলোচনা করেন, বক্তব্য উপস্থাপন করেন, উৎফুল্ল থাকেন সেটা কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দেখা যায়নি। তিনি সংসদের শেষ অধিবেশনে বলেছেন, ওনার চেয়ারটা জ্বলন্ত চেয়ার অর্থাৎ প্রতিনিয়তই তিনি দগ্ধ হচ্ছেন, মন দিয়ে সবার বক্তব্য শুনেন, কথা কম বলেন, দেশ নিয়ে ভাবেন। তিনি বুঝেন কোনটা সত্যি কোনটা সত্যি না, যাতা উপস্থাপন করে উনাকে বিভ্রান্ত করা ঠিক হবে না। দলমত নির্বিশেষে দেশের স্বার্থে ওনাকে সহযোগিতা করা সকলের দায়িত্ব।

বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দীর্ঘ দিনের, দেশের মানুষ এবং সরকার এ ব্যাপারে অবগত আছেন। জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে চলমান প্রকল্প সমূহের কাজ শেষ হওয়ার পথে। আগামী বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। শহরে জলাবদ্ধতা নিরসনকে টেকসই করতে হলে জনগণকে সচেতন হতে হবে, নইলে এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ভেস্তে যাবে। এই নিরসন শুধু সিটি কর্পোরেশনের কাজ নয়, এটি নাগরিক দায়িত্ব। সিটি মেয়র খালগুলো পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন রেখে ২০২৫ সালে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সমাধান করতে সক্ষম হয়েছেন। জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসনে আমাদেরকে বিভিন্ন উন্নত দেশের আলোকে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ ময়লাআবর্জনাকে উৎপত্তিস্থলে পচনশীল (), পলিথিন/প্লাস্টিক (), কাগজ () ও অন্যান্য (), কমপক্ষে এই চারটি ভাগে বিভক্ত করে সিটি কর্পোরেশনকে সহায়তা করতে হবে। তাতে বর্জকে, জৈব সার, মাছ ও পশু খাদ্য, পুনঃ ব্যবহার ও রিসাইকেল করে সার্কুলার ইকোনমিতে পরিণত করা যাবে। এর দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ে মহল্লা বাসী, বাজার কমিটি, আবাসিক ভবন কমিটি, স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসা কমিটি সকলকে নিতে হবে। আসুন আমরা সকলে সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করে চট্টগ্রাম শহরকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা করি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, প্রফেসর, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকা জরুরি
পরবর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল