সমকালের দর্পণ

মির্জা গালিব-এর অন্তর্দৃষ্টির আলোকে আমরা

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ৩ মে, ২০২৬ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

আজাদীতে লেখা শুরু করেছিলাম একটি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার, সেটি হল সত্যকে ধারণ এবং পাঠকদের সামনে তা উপস্থাপন। তাই শুরুর লেখাটির শিরোনাম রেখেছিলাম ‘সত্য যে কঠিন কঠিনেরে ভালবাসিলাম’। মননশীল, সৃজনশীল সাহিত্যিক জনাব রাশেদ রউফ আমার কলামের নাম রাখেন ‘সমকালের দর্পণ’। সমকালের দর্পণে স্থির সময়ের বুকে চলমান ঘটনাসমূহ অবলোকন করেছি, উপস্থপন করেছি নিঃশঙ্ক নিরপেক্ষ অবস্থন থেকে। এই প্রচেষ্টায় আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের অসংগতি যেমন ‘রাজনীতির তামাশার গল্প’, ‘এক অস্থির সময়ে স্থির সামরিক বাহিনী’ আমাদের দুই প্রতিবেশী মায়ানমার এবং ভারতের বিষয়ে যথাক্রমে ‘মায়ানমার পরিস্থিতি জটিলতর হচ্ছে’, ‘ধর্মভারতীয় রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট’ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ইউক্রেনরাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য তথা গাজায় ইসরাইলের নির্মম গণহত্যা, সর্বশেষ আমেরিকাইসরাইলের ইরান আক্রমণ ইত্যাদি বিষয়ে ইতিমধ্যে শতাধিক লেখা সম্ভব সত্য এবং তথ্য নির্ভরভাবে উপস্থাপন করেছি। এরই মাঝে আমার বেশ কয়েকজন সচেতন পাঠক অনুযোগ এবং অনুরোধ করেছেন দেশের সর্া্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোকপাত করতে। এই অনুযোগ অনুরোধে সারা দিতে গিয়ে আজ লিখতে বসেছি।

আমার অন্যতম প্রিয় কবি র্মিজা গালিব। গালিব এর জন্ম ২৭ ডিসেম্বর ১৭৯৭ সালে, ভারতের আগ্রায়। মৃত্যু ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯ সালে। অস্তগামী মোঘল সাম্রাজ্য আর উদীয়মান বৃটিশ শাসনের ক্রান্তিকালে মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ গালিবের জীবন যাপন।

উর্দু এবং ফারসী উভয় ভাষার স্বনামধন্য কবি গালিবকে তার অনন্য সাধারণ কাব্য প্রতিভার জন্য দাবিরউলমালিক এবং নাজিমউদদৌলা উপাধি দেওয়া হয়। ১৮৫৭ সালের মহা বিদ্রোহকে তিনি গ্রন্থিত করেন তার বই ‘দাস্তম্বু’তে। র্মিজ্জা গালিব তার অমর সব ভাবনা আর অনুভূতির জন্য এখন ভুবনব্যাপী বিখ্যাত।

মির্জ্জা গালিবের কিছু কবিতার বিখ্যাত পংক্তি আমার মাঝে এক ধরনের আলোড়ন জাগিয়েছে, গালিবের সেই অন্তর্দৃষ্টির আলোকে আমাদের বর্তমান অবস্থন বিচারে আজ চেষ্টা করব। গালিব লিখেছেন

জীবন বড়ই বিচিত্র, সন্ধ্যা কাটে না

অথচ দিব্যি বছর কেটে যাচ্ছে”

কী এক নিদারুণ অনুভব! জীবন থেকে সময় ক্ষয়ে যাচ্ছে, কিন্ত্তু চেপে বসা আঁধার কাটছে না। এটি একটু অন্যভাবে অর্থ করে নিলে বা প্রকাশ করে যদি বলা হয় একটি জাতির মূল্যবান সময় পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্ত্তু জাতির ললাট থেকে জেকে বসা অন্ধকার, দুর্ভাগ্য, দারিদ্র বিদূরিত হচ্ছে না, অমানিশা কাটছে না। আসলে আমাদের ক্ষেত্রে তাই নয় কি? এ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে আমাদের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ আমাদের দীনতা কাটছে না, সেটি অর্থনৈতিক, সেটি সামাজিক, রাজনৈতিক বা নৈতিক। সর্বক্ষেত্রে।

এমনই এক বোধকে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এক কবি নির্মলেন্দু গুণ হয়ত তার স্বাধীনতা, উলঙ্গ কিশোর কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন

বলো উলঙ্গতা স্বাধীনতা নয়

বলো দুঃখ কোন স্বাধীনতা নয়

বলো ক্ষুধা কোন স্বাধীনতা নয়

বলো ঘৃণা কোন স্বাধীনতা নয়”।

কিন্ত্তু আমরা গালিব এর সন্ধ্যা কাটে না

অথচ দিব্যি বছর কেটে যাচ্ছে’র সেই অনুভব এর বাস্তবতার গ্যাড়াকলে পড়ে আছি যেন আমরা।

একটি জাতি যখন সামাজিক নৈরাজ্য, আর্থিক দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয়, আত্মিক দৈন্যতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে উদগ্রীব, উন্মুখ হবে না তখন ধরে নিতে হবে দিব্যি বছরের পর বছর কেটে যাবে কিন্ত্তু তার সন্ধ্যা কাটবে না তার আঁধার ঘুচবে না।

আমরা কি তেমন এক অবস্থয় নই? সব ক্ষেত্রে আমরা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রবণতায়! আর এই দুর্নীতির এক দুর্বিনীত প্রশ্রয়ে নিজেদের আশ্রয় খুঁজছি। এ প্রসঙ্গেও র্মিজা গালিব’র অসাধারণ এক বোধ আমাদের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য। গালিব’এর অনুভূতি প্রকাশ এভাবে

পাপ করে কোথায় পালাবে গালিব

এ আকাশ পাতাল মহা সমুদ্র সব ত তারই”।

কী অনুভব! গালিব’ এর অনুভূতির এ ছোঁয়া আহা যদি আমাদের অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঝেঁকে বসা দুর্নীতিবাজদের একটুও ছুঁয়ে যেত! যারা এ গরীব দেশের অর্থ পাচার করে নিয়ে যায়, যারা এ দেশের হাড়খাটুনি মানুষ গুলির রক্ত ঘামের অর্জিত অর্থ লুটে নিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ফুর্তিতে উড়ায় তারা যদি গালিব’এর উপরোক্ত দু লাইন আত্মস্থ করত তবে হয়ত এ সমাজ ভিতর থেকে বদলে যাওয়ার একটি উপায় খুঁজে পেত। নীচের এই পঙক্তিগুলিই বা কম কিসে! মানুষ তার বিবেক তাড়িত না হয়ে, বিবেকের মানদণ্ডে নিজেকে দাড় না করিয়ে অন্যকে তথা পারিপার্শ্বিকতার উপর দোষ চাপিয়ে নিজেকে নিঃস্কৃতি দিতে সতত সচেষ্ট থাকে, এই ধ্রুব সত্য গালিবের এই রচনায়।

সারা জীবন একই ভুল করে গেলে গালিব

ধূলা ছিল চেহারায় আর তুমি কেবল

আয়নাই পরিষ্কার করে গেলে”

গালিব মানুষের বোধোদয়ের লক্ষ্যে, মানুষের অবচেতনে নাড়া দেওয়ার জন্য স্বগোক্তিও করেছেন এভাবে

পৃথিবীতে পোশাক বিহীন এসেছিলে হে গালিব

একটি কাফনের কাপড়ের জন্য এত লম্বা সফর করলে”

অতি লোভী মানুষ, যারা সম্পদের পাহাড়ে চড়ার জন্য কেবলি দৌড়ের উপর আছেন তাদের জন্যই গালিব’এর এ পংক্তি। যারা পৃথিবীকে চিরস্থয়ী ভেবে এই সমাজে অন্যায়ের আশ্রয় নিচ্ছেন, দুর্নীতির ছায়ায় বসে ক্ষণস্থয়ী পৃথিবীকে চিরস্থায়ী ভাবছেন, ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়েছেন তাদের মানসচক্ষু উন্মিলনে গালিব’এর এ এক অন্তর্বেদী মন্তব্য।

How much Land Does a Man Require? ‘একজন মানুষের কতটুকু সম্পদ বা জমি প্রয়োজন’? ১৮৮৬ সালে বিশ্বখ্যাত রুশ ঔপান্যাসিক লিও টলস্টয় রচিত ছোট গল্প। এ গল্পে টলস্টয় উপমা হিসাবে লোভী এক মানুষের জীবনকে করুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ গল্পের মূল চরিত্রকে লোভী সেই মানুষকে বলা হল তুমি সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত যতটুকু জমি হেঁটে যাবে ততটুকু জমি তোমার। লোকটি হাঁটা বাদ দিয়ে দৌড়ানো শুরু করল। কারণ দৌড়ালে সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত অনেক জমি তার হবে। দৌড় থামে না। না পানি পান না খাওয়া কোন কিছুর খেয়াল নেই। গল্পের লোকটি কেবল দৌড়াচ্ছে ত দৌড়াচ্ছে। তার দৌড় আর দৌড়। যত দৌড় তত জমি। এদিকে সন্ধ্যা নামে নামে। তার আরো জমি চাই। আরো জোরে দৌড় আরো জোরে দৌড়! সূর্য অস্তাচলে। তখন লোকটিও ঢলে পড়ে ভূমিতে। নিষ্প্রাণ। এখন কতটুকু জমি তার? যতটুকুতে তিনি পড়ে আছেন নিষ্প্রাণ।

আমরা এই অর্থ বিত্ত, সম্পদ ক্ষমতার জন্য নিজের মান সম্মান ব্যক্তিত্বকে অনেক সময় বিলিয়ে দিচ্ছি বিকিয়ে দিচ্ছি অবলীলায়। এ প্রসঙ্গে মির্জ্জা গালিব’র আরো একটি দারুণ উপলব্ধির উচ্চারণ আছে। সেটি এ রকম

বেশি নুয়ে গেলে

পৃথিবী পিঠকে পা দানি বানিয়ে ফেলে”।

এটি ব্যক্তি জীবনে যেমন তেমনি জাতীয় জীবনের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। আমরা ব্যক্তি জীবনে যদি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করি তবে তা আমাদের সস্তা ব্যক্তিত্বহীনে পরিণত করবে। জাতীয় জীবনেও এটি সত্য। চলমান ইরান বনাম আমেরিকা ইসরাইলের যুদ্ধ এটিকে বাস্তবে প্রমাণ করেছে।

ইরান আমেরিকা ইসরাইলের অন্যায় যুদ্ধের কাছে মাথা নোয়ায়নি। নিজেদের সমস্ত শক্তি সামর্থ্য নিয়ে শক্রর মুখামুখি দাঁড়িয়ে লড়ে গেছে। তার স্বীকৃতিও বিশ্বব্যাপী ইরান পেয়েছে। ইরানীদের অকুতোভয় লড়াই করার স্পৃহা দেখে সারা বিশ্ব এখন নিশ্চিত করে বলছে ইরানের হাতে পরাশক্তি আমেরিকা তার আধিপত্যবাদের অহমিকা হারিয়েছে। Trump backs down from threat ট্রাম্প ভয় দেখানো থেকে সরে এসেছেন, অতি সম্প্রতি আমেরিকান টেলিভিশন ‘সিএনএন’ এর এক রাউন্ড টেবিল আলোচনায় রায়ান গুডম্যান ঐ নেটওর্য়াকের ডেপুটি সিকিউরিটি ডাইরেক্টর উল্লেখ করেন Trump just handed Iran a massive strategic victory after retreating from threat” যুদ্ধ থেকে পিছু হটে ট্রাম্প ইরানের হাতে এক বিশাল কৌশলগত জয় তুলে দিয়েছে।

একই আলোচনায় আমেরিকান এয়ার ফোর্সের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল সিড্রিক লেজিস্টন উল্লেখ করেছেন It is a strategic victory for Iran অর্থাৎ ইরানের জন্য এটি একটি কৌশলগত বিজয়।

পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মাথা বেশি নোয়ানো অন্যান্য দেশগুলির অবস্থা আমরা পর্যালোচনা করলে শুধু বেদনায় মন ভারীই হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএমতাজুল হক চৌধুরী : অনন্যসাধারণ মানুষের প্রতিভূ
পরবর্তী নিবন্ধপানিতে তলিয়ে গেছে ধান, দেখে জমিতেই অচেতন হয়ে মারা যান কৃষক