ভৌগোলিক অবস্থান এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিচারে চট্টগ্রামকে প্রকৃতির এক অনন্য দান হিসেবে গণ্য করা হয়। পাহাড়, নদী এবং সমুদ্রের এক অপূর্ব মিতালী এই শহরকে দিয়েছিল এক প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম বা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। কিন্তু আধুনিক নগরায়ণের নামে আমরা সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে এতটাই তছনছ করে দিয়েছি যে, সামান্য বৃষ্টিপাত এখন এই বাণিজ্যিক রাজধানীর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা এলেই চট্টগ্রামবাসীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। জোয়ারের পানি আর বৃষ্টির পানির মিলিত চাপে নগরীর অলিগলি যখন অথৈ সাগরে পরিণত হয়, তখন জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। মানুষের ঘরবাড়িতে পানি ঢোকে, আসবাবপত্র নষ্ট হয়, ব্যবসা–বাণিজ্যে ধস নামে এবং সর্বোপরি মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে ভারি ও অতিবর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা যে রূপ নিয়েছে, তাতে নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নগরপিতা বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি যে সমালোচনার জোয়ার দেখা যায়, তা মূলত সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই সমস্যার মূলে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি, তবে দেখা যাবে এর দায়ভার কেবল একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত সমাধান মিলবে না। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা একটি বহুমুখী সংকট, যার সমাধানে প্রয়োজন ওয়াসা, সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর মধ্যে ইস্পাতকঠিন সমন্বয় এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
চট্টগ্রাম মহানগরের বর্তমান প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কাঠামোতে মূলত তিনটি প্রতিষ্ঠান সমান্তরালভাবে কাজ করে–চট্টগ্রাম ওয়াসা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এর সাথে যোগ করা যায় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। কাগজে–কলমে এই সংস্থাগুলোর প্রত্যেকের কার্যপরিধি আলাদা হলেও বাস্তবে এদের কাজের ক্ষেত্রগুলো একে অপরের পরিপূরক। জলাবদ্ধতা নিরসনে যখন কয়েক হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এত বিশাল বিনিয়োগের পরও কেন নগরবাসী সুফল পাচ্ছে না? এর প্রধান কারণ হিসেবে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা বরাবরই ‘সমন্বয়হীনতা’কে চিহ্নিত করেছেন। যখন একটি সংস্থা ড্রেন বা খাল খনন করে, ঠিক তখনই হয়তো অন্য একটি সংস্থা রাস্তা কাটার কাজ শুরু করে কিংবা সুয়ারেজ লাইনের জন্য খনন কার্য চালায়। এই যে সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান–প্রদান এবং কাজের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব, তা কেবল অর্থের অপচয়ই করছে না, বরং জনদুর্ভোগকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। একটি আধুনিক শহরে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একই টেবিলে বসে কর্মপরিকল্পনা সাজানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু চট্টগ্রামে দেখা যায়, এক সংস্থা কাজ শেষ করে যাওয়ার পর অন্য সংস্থা সেই কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতির অবসান না ঘটালে কোনো মেগা প্রকল্পই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে পারবে না।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সিডিএ বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের কাজ করছে। এই প্রকল্পের আওতায় খাল খনন, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ এবং খালের মুখে স্লুইস গেট স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো শহরের অভ্যন্তরীণ ছোট নালাগুলো পরিষ্কার রাখা এবং আবর্জনা অপসারণ করা যাতে পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে। ওয়াসা আবার দায়িত্ব পালন করছে সুয়ারেজ সিস্টেম ও পানি সরবরাহ নিয়ে। এই তিন সংস্থার কাজের মধ্যে যদি বিন্দুমাত্র ফাটল থাকে, তবে বর্ষার পানি বের হওয়ার পথ পাবে না। উদাহরণস্বরূপ, যদি খালের মোহনায় স্লুইস গেট ঠিকমতো কাজ না করে কিংবা সিটি কর্পোরেশনের নালাগুলো পলি ও আবর্জনায় ভরাট থাকে, তবে সিডিএ–র খনন করা খালের কোনো উপযোগিতা থাকবে না। আবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বড় বাঁধগুলো যদি সমুদ্রের জোয়ার আটকাতে ব্যর্থ হয়, তবে শহরের ভেতরের পানি নামার পরিবর্তে উল্টো জোয়ারের পানি জনপদে ঢুকে পড়বে। অর্থাৎ, এটি একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার মতো। একটি লিংক দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত কেবল দায়সারাভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে এই চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি শক্তিশালী ‘সমন্বয় সেল’ গঠন করা, যেখানে প্রতিনিয়ত কাজের অগ্রগতি এবং প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা হবে।
জলাবদ্ধতা সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হলো নগরীর প্রাকৃতিক খালগুলোর দখল ও দূষণ। এক সময় চট্টগ্রামে ৫৬টিরও বেশি প্রাকৃতিক খাল ছিল, যা পাহাড়ের ঢল ও বৃষ্টির পানি কর্ণফুলী নদী বা সাগরে নিয়ে যেত। কিন্তু কালক্রমে অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে অনেক খাল মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে, আর যেগুলো টিকে আছে সেগুলোও সরু হয়ে নর্দমায় পরিণত হয়েছে। প্রভাবশালী মহল থেকে শুরু করে সাধারণ বস্তিবাসী সবাই খালের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এই দখলদারিত্ব উচ্ছেদে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কঠোরতার কোনো বিকল্প নেই। অনেক সময় দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশন বা সিডিএ উচ্ছেদ অভিযান চালালেও কিছুদিন পর আবার সেই জায়গা পুনর্দখল হয়ে যায়। এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে না আনলে এবং খালের প্রস্থ পূর্বের অবস্থায় না ফেরালে পানির ধারণক্ষমতা বাড়বে না। এছাড়া পাহাড় কাটার ফলে বালু এসে নালা–নর্দমা ভরাট হয়ে যাওয়া চট্টগ্রমের জন্য একটি স্বতন্ত্র আপদ। বৃষ্টির সাথে পাহাড়ের যে বালি ও মাটি ধুয়ে নিচে নেমে আসে, তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ড্রেনগুলোকে অকার্যকর করে দেয়। তাই জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে পাহাড় রক্ষা এবং পাহাড় কাটার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে কেবল সরকারি সংস্থাগুলোর দিকে আঙুল তুললে সমস্যার অর্ধেকটা বলা হবে। এই সংকটের অন্য পিঠে রয়েছে আমাদের নাগরিক দায়িত্বশীলতার চরম অভাব। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা কি আমাদের ঘর বা দোকানের ময়লা–আবর্জনা ডাস্টবিনে ফেলি? উত্তরটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক। আমরা অত্যন্ত সাবলীলভাবে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল এবং অন্যান্য পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য নর্দমায় নিক্ষেপ করি। এই পলিথিন ও প্লাস্টিক ড্রেনের পানির গতিপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। যত বড় ড্রেনই তৈরি করা হোক না কেন, যদি তা আবর্জনায় ঠাসা থাকে, তবে পানি সরবে না। চট্টগ্রামে দেখা যায়, সামান্য বৃষ্টির পর ড্রেন থেকে টন টন প্লাস্টিক বর্জ্য উদ্ধার করা হয়। নাগরিকদের এই অসচেতনতা জলাবদ্ধতাকে ত্বরান্বিত করছে। আমরা চাই আধুনিক শহর, কিন্তু সেই শহরকে পরিষ্কার রাখার ন্যূনতম দায়িত্বটুকু পালন করতে আমরা কুণ্ঠাবোধ করি। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে হলে প্রতিটি নাগরিককে সচেতন হতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নির্দিষ্ট স্থানে আবর্জনা ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলা ছাড়া এই শহরকে বাঁচানো অসম্ভব। সামাজিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বিষয়ে প্রচারণা চালাতে হবে যাতে পরবর্তী প্রজন্ম একটি পরিচ্ছন্ন শহরের গুরুত্ব বুঝতে পারে।
চট্টগ্রামের মেয়রের প্রতি যে সমালোচনা হয়, তার পেছনে জনগণের প্রত্যাশার চাপ থাকে। সিটি কর্পোরেশন যেহেতু জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান, তাই মানুষ প্রথমেই মেয়রের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু মেয়রের একার পক্ষে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলানো সম্ভব নয় যদি না সিডিএ বা ওয়াসার মতো সংস্থাগুলো তাদের কাজ সময়মতো সম্পন্ন করে। আবার সিটি কর্পোরেশনের ভেতরেও দুর্নীতির অভিযোগ বা কাজের ধীরগতি অনেক সময় ভোগান্তি বাড়ায়। বর্ষা আসার কয়েক মাস আগে থেকেই নালা পরিষ্কারের কাজ শুরু করা উচিত, কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় বর্ষা শুরু হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে নালা পরিষ্কার করা হচ্ছে, যা খুব একটা কাজে আসে না। প্রাক–বর্ষা প্রস্তুতি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এই সমস্যার সমাধানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে যে বিশেষজ্ঞ কমিটিগুলো কাজ করে, তাদের পরামর্শ কতটা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। কেবল কংক্রিটের অবকাঠামো তৈরি না করে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমাধান খুঁজতে হবে। স্পঞ্জ সিটি বা জলাধার নির্মাণের মতো আধুনিক ধারণাগুলো চট্টগ্রামে প্রয়োগ করা যায় কিনা, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কোনো সাধারণ সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট যা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং নাগরিক–এই তিন স্তরের ব্যর্থতার সংমিশ্রণ। এই সমস্যার সমাধান কোনো জাদুর কাঠির স্পর্শে হবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা। ওয়াসা, সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত ও মানসম্মতভাবে শেষ করতে হবে। একই সাথে নাগরিকদের মধ্য থেকেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। খাল দখলমুক্ত করা, পাহাড় কাটা বন্ধ করা এবং যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধ করার মাধ্যমে আমরা এই সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারি। চট্টগ্রাম আমাদের প্রাণের শহর, আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। এই শহরকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিক সদিচ্ছা একান্ত জরুরি। তবেই হয়তো ভবিষ্যতে এক পশলা বৃষ্টি চট্টগ্রামের মানুষের জন্য বিরক্তির কারণ না হয়ে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক।












