গবাদিপশুর উৎপাদন কমেছে চট্টগ্রামে

গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় কমেছে খামার । হৃষ্টপুষ্টকরণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন খামারিরা । ঈদুল আজহায় গরুর সংকট হবে না : প্রাণিসম্পদ দপ্তর

মোরশেদ তালুকদার | সোমবার , ৪ মে, ২০২৬ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম জেলায় এ বছর স্থানীয়ভাবে ৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ২৭৯টি গরু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়। যা গতবছর ছিল ৫ লক্ষ ৩৫ হাজার ৮১৩টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গরুর সংখ্যা কমেছে ৩৬ হাজার ৫৩৪টি। শুধু গরু নয়; মহিষ, ছাগল ও ভেড়াসহ অন্যান্য গবাদিপশুরও স্থানীয় উৎপাদন কমেছে চট্টগ্রামে। যা সংখ্যায় ৭৭ হাজার ৭৩১টি। একইসঙ্গে এ বছর যে পরিমাণ গবাদিশু স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে তা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ তথ্য জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের।

এদিকে খামারিরা বলছেন, গোখাদ্য ও বিভিন্ন ওষুধপত্রের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি খামারে নিয়োজিত শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। সবমিলিয়ে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণে খরচ বেড়েছে ৩০ শতাংশ। এতে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন খামারিরা। ফলে কমেছে স্থানীয় উৎপাদন।

অবশ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন কমলেও আসন্ন ঈদুল আজহায় চট্টগ্রামে গরুর সংকট হবে না বলে জানিয়েছেন খামারি এবং জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এবছর স্থানীয় উৎপাদন যেমন কমেছে তেমনি কমেছে কোরবানি পশুর চাহিদাও। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেপারিরা চট্টগ্রামের পশুরহাটে গবাদিপশু নিয়ে আসবেন। ফলে শেষ পর্যন্ত চাহিদা পূরণ হয়ে আরো উদ্ধৃত্ত থাকবে।

পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন উৎপাদন : প্রতিবছর কোরবান উপলক্ষে স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্টকৃত ও কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর। এ বছর তালিকা প্রস্তুত করা হয় গত ২১ এপ্রিল। এতে দেখা গেছে, এবছর চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলায় স্থানীয়ভাবে ৭ লক্ষ ৮৩ হাজার ১৫১টি গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্ট করা হয়েছে। যা গতবছর (২০২৫) ছিল ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ৮৮২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্থানীয় উৎপাদন কমেছে ৭৭ হাজার ৭৩১টি। এর আগে ২০২২ সালে স্থানীয় উৎপাদন ছিল ৭ লক্ষ ৯১ হাজার ৫০১টি। ওই হিসেবে এ বছরের স্থানীয় উৎপাদন এবারসহ গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এছাড়া ২০২৪ সালে ৮ লক্ষ ৫২ হাজার ৩৫৯টি, ২০২৩ সালে ৮ লক্ষ ৪২ হাজার ১৬৫টি, ২০২১ সালে ৭ লক্ষ ৫৬ হাজার ৩৩৪টি, ২০২০ সালে ৬ লক্ষ ৮৯ হাজার ২২টি ও ২০১৯ সালে স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট করা হয় ছিল ৬ লক্ষ ১০ হাজার ২১৯টি গবাদিপশু।

কমেছে গরুর সংখ্যা : জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রস্তুতকৃত তালিকা অনুযায়ী, এ বছর স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্টকৃত গরুর সংখ্যা ৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ২৭৯টি। যা গতবছর ছিল ৫ লক্ষ ৩৫ হাজার ৮১৩টি। অর্থাৎ এক বছরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গরুর সংখ্যা কমেছে ৩৬ হাজার ৫৩৪টি। এছাড়া এবছর স্থানীয়ভাবে ১ লক্ষ ৯৪ হাজার ৫১৯টি ছাগল হৃষ্ট করা হয়। যা গতবছর ছিল ২ লক্ষ ৫১ হাজার ৭৪টি। এবছর ৪৭ হাজার ৮৩৪টি মহিষ হৃষ্টপুষ্ট করা হয়, যা গতবছর ছিল ৬৪ হাজার ১৬৩ টি। পাশাপাশি গতবছর ৫৫ হাজার ৬৯৭টি ভেড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হলেও এ বছর সংখ্য কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩এ।

কমেছে চাহিদাও :

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ি, এবছর চট্টগ্রামে কোরবানি পশুর চাহিদা রয়েছে ৮ লক্ষ ১৮ হাজার ৬৭১টি গবাদিপশুর। ওই হিসেবে এবার স্থানীয় উৎপাদনের বিপরীতে ৩৫ হাজার ৫২০টি গবাদিপশুর ঘাটতি রয়েছে। এদিকে গতবছর (২০২৫) চট্টগ্রামে কোরবানি পশুর চাহিদা ছিল ৮ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৯টি। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় এবার ৭৭ হাজার ৫৯৮টি কোরবানি পশুর চাহিদা কমেছে। এর আগে ২০২৪ সালে ৮ লক্ষ ৮৫ হাজার ৭৬৫টি ও ২০২৩ সালে ৮ লক্ষ ৭৯ হাজার ৭১৩টি কোরবানি পশুর চাহিদা ছিল চট্টগ্রামে।

উৎপাদন কমার কারণ :

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মালিক মোহাম্মদ ওমর আজাদীকে বলেন, স্থানীয় উৎপাদন কমার কারণ হচ্ছে, এখানে অস্বাভাবিকভাবে গোখাদ্যের দাম বেড়েছে। বিভিন্ন খাদ্যের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। বিষয়টি নিয়ে বহুবছর ধরে আমরা আমাদের এসোসিয়েশন থেকে সরকারকে বলে আসছি।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের যে খাদ্যপণ্য চালসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে গেলে বাজার মনিটরিং করা হয়, অভিযান চলিয়ে জরিমানা করা হয়। এতে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু গোখাদ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কিছু হয় না। ফলে হঠাৎ করেই গোখাদ্যের উৎপাদকরা দাম দেড়গুণ করে ফেলে। যেমন সয়াবিনের খৈল ২৬শ টাকা থেকে ৩৩শ টাকা করে ফেলেছে, এটা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।

মালিক মোহাম্মদ ওমর বলেন, যেসব খামারির আয়ের অন্য কোনো সোর্স নেই, তারা গোখাদ্যের দাম ও অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি পেলে অনেক সময় এডজাস্ট করতে না পেরে খামারই বন্ধ করে দেন। এবার চট্টগ্রামে খামারিও কমেছে। যাদের বিকল্প আয় আছে তারা দাম বাড়লেও অপেক্ষা করেন। চট্টগ্রামে অনেকগুলো ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে।

রাউজান কদলপুরের আলমবাড়ি চৌধুরী এগ্রো’র স্বত্ত্বাধিকারী মো. হেলাল উদ্দিন রুবেল আজাদীকে বলেন, শুধু গোখাদ্য নয়, অন্যান্য খরচও বেড়েছে। ওষুধের দামও বেড়েছে। যেমন কৃমির ওষুধ বেড়েছে ৬০/৭০ টাকা। আবার লোডশেডিং হলে জেনারেটর চালাতে হয়, তখন তেলের খরচ যোগ হয়। খামারের একজন শ্রমিকের পেছনে মাসে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা গরুর উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন। রুবেল বলেন, ইরানআমেরিকা যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধিরও প্রভাব পড়েছে খামারে। এক্ষেত্রে তেলের মূল্যে বৃদ্ধির কারণে গোখাদ্যের পরিবহন খরচ বেড়েছে। প্রতি বস্তা গোখাদ্য পরিবহন খরচ বেড়েছে ৫০ পয়সা।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর আজাদীকে বলেন, গোখাদ্যের দাম বাড়তি, মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল, সবকিছু মিলিয়ে মোটাতাজাকরণ কমেছে। মূল সমস্যা হচ্ছে খাদ্যের দাম। তিনি চট্টগ্রাম জেলায় ২ থেকে ৩শ খামার কমেছে বলেও জানান।

এ কর্মকর্তা বলেন, উৎপাদন কমলেও কোরবানিতে পশু সংকট হবে না। অন্যান্য জেলায় উৎপাদন প্রচুর বেড়েছে। ওইসব এলাকা থেকে তো চট্টগ্রামে গরু আসবে। তাছাড়া এবার চট্টগ্রামে কোরবানির চাহিদাও কমেছে, ফলে সমস্যা হবে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশে কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না : প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দুটিকে বিশেষ নিরাপত্তায় আনা হলো জেটিতে