এমতাজুল হক চৌধুরী : অনন্যসাধারণ মানুষের প্রতিভূ

এ ওয়াই এম জাফর | রবিবার , ৩ মে, ২০২৬ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

একজন মানুষ বিশেষভাবে মূল্যায়িত হন তখন, যখন তাঁর মধ্যে মূল্যায়িত হবার সর্বৈব গুণাবলি বিরাজিত থাকে। যিনি তার কথায়, শ্রদ্ধাভালোবাসায় বিনয়ী, পরমৎসহিষ্ণু, বড়ছোট, উঁচুনিচু, জাতপাথ ছাড়িয়ে সকল মানুষের প্রিয়জন হন। যিনি কখনো লোক দেখানো স্বভাবে নিজেকে জাহির করার প্রয়াসে কখনো প্রলুব্ধ ছিলেন না। যিনি একান্ত সহজ সরল সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত। ঠিক তেমনি আমাদের এম্‌তু ভাইসাব, চেয়ারম্যান এম্‌্‌তু মিয়া, জনাব এমতাজুল হক চৌধুরী।

আমি যখন স্কুলে উচ্চ ক্লাশে পড়তাম, কলেজ জীবনে বাড়ি আসতাম, পৈত্রিকসূত্রে আত্মীয়হেতু তিনি গ্রামে থাকলে দেখতাম একজন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষচোখে পুরো চশমা, মুখে খোঁছা খোঁছা সাদা কালো দাঁড়ি, গায়ে ঢিলা ঢালা হাফ হাতা শার্ট, মাথা ভর্তি হালকা সাদা চুল, পরনে চেক লুঙ্গিবাড়ির অলিন্দে, কাছারী ঘরে বা পুকুরের শান বাধানো ঘাটের পশ্চিম দক্ষিণ পিলার ঘেঁষে অন্যদের সাথে পুকুরে মাছ মারা দেখতে দেখতে মোক্তার মুন্সিকে কীসব যেন নির্দেশ দিচ্ছেন। আবার কখনো তিনি রিকশায় বাড়ি যাবার পথে দেখতামদীর্ঘদেহী একজন অসম্ভব ফর্সা মানুষ চোখে কালো চশমা, মাথায় ক্যাপ, বুকে ঝুলন্ত ক্যামেরা, গরমকালে অফ হোয়াইট প্যান্টের সাথে মানানসই হালকা হাওয়াই শার্ট। শীতকালে ভারী প্যান্ট শার্ট ঈষৎ রঙিন কোট। যিনি, ছোট বেলা দেখা হতেই দাদীর খবরাখবর এবং বড় হতেই বাবার খবরাখবর নিতেন সালামের জবাবে পরম যতনে।

আমার বাবার কাছে পূর্ব ইতিহাস জানতে চেয়ে শুনেছিলাম ঠাকুরধন মল্ল, আলী আকবর, আলী আজগর, কালু গাজী, সোনাগাজীর নাম। কালুগাজীর চার পুত্র গোলাম আলী চৌধুরী, মুন্সি কান্দর আলী, রওশন আলী ও মুন্সি জাফর আলীর নাম। আর গোলাম আলীর তিন পুত্র এহসান আলী, রহিম দাদ ও করিম দাদ। এই রহিম দাদের একমাত্র পুত্র এজহারুল হক। যাঁর আট সন্তানের একজন গণি আহমদ চৌধুরী। যার ঔরসজাত পাঁচ সন্তানের তৃতীয়জন এমতাজুল হক চৌধুরী যিনি এ প্রবন্ধের আলোচিত পুরুষ।

বৃটিশ ভারতের চট্টগ্রাম অঞ্চলের অনেক বনেদী ও ধনাঢ্য ব্যক্তির মতো আবদুল গনি চৌধুরীও আকিয়াব, রেঙ্গুনে ব্যবসা করতেন এমতাজুল হক চৌধুরীও শিক্ষা সমাপনান্তে পৈত্রিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে শিল্পউদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোগী হন কিন্তু ব্যবসায় তিনি সফলতা পান ‘ঠিকাদারীতে’। তিনি একজন প্রথম শ্রেণির কন্ট্রাক্টর ছিলেন। এখানেই তাঁর নিজস্ব পরিচিতির সমীকরণ, ব্যতিক্রমী একজন। সে যুগেও সুযোগ সন্ধানী, নৈতিকতাহীন মানুষকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হতে দেখেছি। কিন্তু তিনি তার ভিন্ন অবস্থানকে ধরে রেখে জীবন পরিচালনায় রত ছিলেন বলেযে আমি আমার ছোট বেলা, কিশোর বেলা, যৌবন বেলায়ও রিকশায় বসা ক্যাপ পরা পুরো চশমার দীর্ঘদেহী সুন্দর মানুষটাকেগম্ভীর মেজাজী নাক সিটকানো ভুরু কোঁচকানো সুগন্ধি আয়াশী গাড়ির আরোহী হতে দেখিনি কখনো।

কন্ট্রাক্টরী বা ব্যবসার পাশাপাশি তিনি রাজনীতি সচেতন ও জাতীয়তায় বিশ্বাসী হয়ে অন্য সব খান্দানী প্রতিষ্ঠিত মুসলিম প্রাজ্ঞজনের মতো ‘মুসলিম লীগ’ করতেন অতি স্বচ্ছ উদারবিশ্বাসী হয়ে। তারই ধারাবাহিকতায় কালীপুর ইউনিয়ন কাউন্সিলের ষষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে ১৯৬৪১৯৭১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। যা পূর্বে ইউনিয়ন বোর্ড নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে। প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ছিলেন আমার পিতা এডভোকেট আজিজ আহমদ চৌধুরী ১৯৩৪১৯৪০ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে কারাভোগকারী যোদ্ধাকে যেন সম্মান জানিয়েছিলেন এলাকাবাসী। দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট বাবু যোগেশ চন্দ্র দত্ত ১৯৪১১৯৪৫ এবং তৃতীয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন জনাব শফিকুর রহমান সিদ্দিকী (সুপারিন্টেন্ডেন্ট সাহেব) ১৯৪৬১৯৫১ সাল পর্যন্ত। তারপরই (সম্ভবত) নাম পরিবর্তিত হয়ে কালীপুর ইউনিয়ন কাউন্সিল হয় এবং প্রেসিডেন্ট নাম পরিবর্তিত হয়ে চেয়ারম্যান হয় আর এর প্রথম চেয়ারম্যান হন জনাব সাহেব মিয়া চৌধুরী ১৯৫২১৯৫৮ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় চেয়ারম্যান এডভোকেট নূর আহমদ ১৯৫৯১৯৬৩ সাল পর্যন্ত আর তৃতীয় চেয়ারম্যানই আমাদের গর্বিত পুরুষ এমতাজুল হক চৌধুরী।

সমাজ উন্নয়ন, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, শিক্ষার উন্নয়ন ও মানব উন্নয়নের মহান ব্রত নিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজে নেমে প্রথমে তিনি নিজ গ্রাম কালীপুরে দাদা এজাহারুল হক চৌধুরীর নামে ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কালীপুর এজাহারুল হক উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে কালীপুরে প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন নাসিরা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। তাছাড়া তাঁর শিক্ষা সম্প্রসারণের মহান ব্রত নিয়ে ১৯৬৬ সালে বাঁশখালীর খ্যাতিমান পুরুষ প্রফেসর আসহাব উদ্দিন আহমদ সাহেবের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এগিয়ে যান বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজ। মেজো ভাই প্রিন্সিপাল জহির উদ্দিন আহমদ, ফয়েজ আহমদ চৌধুরী, মালেকুজ্জামান মাস্টার, এডভোকেট আবু সালেহ চৌধুরীসহ অনেকের প্রয়াসে বিভিন্নজনের সাহায্য সহায়তায় এ কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালীন নিজেও কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। গুণাগরীর বীমা ব্যক্তিত্ব মহীবুর রহমান, কালীপুরের ক্যামিকেল কর্পোরেশরন ডিরেক্টর সদরুল আলম, ডোংরার সিরাজুল মোস্তফা ভাইসহ অনেকের কাছে গিয়েছি। তৎমধ্যে চট্টগ্রামের খ্যাতিমান পুরুষ ও আর নিজাম সাহেব, আদালত খাঁন সাহেবের কথা মনে পড়ে। কলেজের স্থান নির্ধারণ, সরকার থেকে লীজ প্রাপ্তিসহ স্থানীয় সমস্ত কার্যকর ব্যবস্থা এমতাজুল হক চৌধুরীর চেয়ারম্যান থাকার সুবাদে যেমন হয়েছে ঠিক তেমনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের তৃতীয় সে কলেজের অনুমতি, অনুমোদন সমস্ত বিষয়ে সহায়তা করেছেন এমতাজুল হক চৌধুরীর ভাগিনা জনাব ফেরদৌস খাঁন যিনি তখন ডিপিআই ছিলেন। এ সুবাদে তার ছোট ভাই ইঞ্জিনিয়ারঅবদান মনে পড়ে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ