“হাম মাজারে মুহাম্মদ (স.) পে মর জায়েঙ্গে,
জিন্দেগি মে য়াহি কাম কর জায়েঙ্গে।“
অর্থ: হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উদ্দেশ্যে আমার জীবন উৎসর্গিত, সারা জীবন তাঁর ধ্যানেই আমি নিয়োজিত থাকব।
মহান আশেকে রসূল চুনতী হযরত শাহ সাহেব কেবলা দীর্ঘ প্রায় ৩৭ বছর পাহাড়ে–পর্বতে, বনে–জঙ্গলে বিচরণ করতেছিলেন। আর সার্বক্ষণিক আল্লাহর রসূল (স.)’র শানে উক্ত পংক্তিটি আওড়াতেন।
এই মহান আশেকে রসূল হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.), যিনি সর্বমহলে শাহ সাহেব কেবলা হিসেবে পরিচিত।
১৯ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী মাহফিলে সীরতুন্নবীর প্রতিষ্ঠাতা এবং তাঁর অসংখ্য অলৌকিক কীর্তি বা কারামতের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি বিখ্যাত জমিদার হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা ইউসুফ আলী (রহ.)-এর সরাসরি নাতি। হযরত ইউসুফ আলী (রহ.) তাঁর দ্বিতীয় পুত্র অর্থাৎ হযরত শাহ সাহেব কেবলার পিতাকে নিয়ে ১৯০৭ সালে হজে গমন করেছিলেন; সেখানেই হযরত ইউসুফ আলী ইন্তেকাল করেন। একই বছর হযরত শাহ সাহেব কেবলার জন্ম।
তিনি পারিবারিক পরিবেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসা এবং উপমহাদেশের বিখ্যাত কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। জমিদারের নাতি হিসেবে হযরত শাহ সাহেব কেবলা মাঝেমধ্যে এস্টেট দেখতে আরাকানে যাতায়াত করতেন।
১৯৩৬–৩৭ সালের দিকে আরাকানের (মতান্তরে মায়ানমারের) এক জামে মসজিদে অবস্থানকালে পবিত্র রমজান মাসে শবে কদরের রাতে তিনি এক গভীর আধ্যাত্মিক ভাবাবেগে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। সাধারণ মানুষ তাঁর এই অবস্থা বুঝতে না পেরে তাঁকে ‘পাগল’ ভেবে বসেন। নানান চিকিৎসাও করান। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা ছিল ভিন্ন–তিনি আল্লাহর হাবীবের আশেক হয়ে নিজের স্বাভাবিক অবস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। লোকালয় ছেড়ে পাহাড়ে–পর্বতে, বনে–জঙ্গলে একাকী বিচরণ করতে থাকেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য ছিল বেশ ভয়ের ব্যাপার।
এই দীর্ঘ কঠিন সময়ে তাঁর পুণ্যবতী স্ত্রী এক পুত্র ও এক কন্যাকে নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। সে সময় আজমগড়ী হযরত এবং আরাকানী হযরত ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন যে, শাহ সাহেব কেবলা পাগল নন; তিনি একদিন তাঁর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবেন।
বাস্তবিকই ১৯৬০–এর দশকে হযরত শাহ সাহেব কেবলা পর্যায়ক্রমে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকেন, যদিও তা শতভাগ ছিল না। তাঁর দাদার বাড়ি অর্থাৎ জমিদার বাড়িটি ‘ইউসুফ মঞ্জিল’ নামে পরিচিত, এ বাড়ীতে কাছারী ঘর ও এবাদতখানা রয়েছে। তবে হযরত শাহ সাহেব কেবলা পৈতৃক বাড়ি থেকে ৩–৪ শত মিটার দক্ষিণে একটি নতুন দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে চলে আসেন, যা সর্বমহলে ‘শাহ মঞ্জিল’ নামে পরিচিতি পায়।
হযরত শাহ সাহেব কেবলা ১৯৭২ সালে এই দ্বিতল শাহ মঞ্জিলের দক্ষিণ পাশে পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসে ১ দিনব্যাপী ‘মাহফিলে সীরতুন্নবী’–র আয়োজন করেন। এরপর প্রতি বছর মাহফিলে সীরতুন্নবী চলমান থেকে এর পরিধিও বাড়তে থাকে:
১৯৭৩ সালে: ৩ দিন; ১৯৭৪ সালে: ৫ দিন; ১৯৭৬ সালে: ১০ দিন; ১৯৭৮ সালে: ১২ দিন; ১৯৭৯ সালে: ১৫ দিন; বাড়িয়ে ১৭ দিন; আবার আরও ২ দিন বাড়িয়ে ১৯ দিনে সমাপ্ত হয়।
১৯৮০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই ১৯ দিনব্যাপী মাহফিলে সীরতুন্নবী ধারা চলমান রয়েছে। হযরত শাহ সাহেব কেবলা রবিউল আউয়াল মাসের চাঁদ ওঠার পর থেকেই এক ভাবাবেগে বেহাল হয়ে যেতেন এবং মাহফিলের আখিরী মোনাজাতের পর বেশ কিছুদিন শোকাহত মনে থাকতেন।
শাহ মঞ্জিলের পশ্চিম দিকে প্রায় ১৩ একরের এক বিশাল এরিয়া জুড়ে তিনি মাহফিলে সীরতুন্নবীর ময়দান প্রতিষ্ঠা করেন। এই সীরত ময়দানের পশ্চিম পাশে নির্মিত হয়েছে ‘মসজিদে বায়তুল্লাহ’ এবং এর দক্ষিণ পাশেই হযরত শাহ সাহেব কেবলার মাজার। ময়দানের উত্তর পাশে মাহফিলে আসা হাজার হাজার আশেক ও মেহমানের জন্য মেহমানখানা, রান্নাঘর ও খাবারের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
হযরত শাহ সাহেব কেবলা অত্যন্ত মানবদরদী ছিলেন। শিশুদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। মাহফিলে শিশুদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা থাকায় অসচ্ছল ও গরীব পরিবারের হাজার হাজার শিশু সেখানে খাবার খেত। তিনি যেমন আত্মীয়দের হকের প্রতি সচেতন ছিলেন, তেমনি তাঁর অন্যতম বড় গুণ ছিল গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ।
তিনি এলাকার শিক্ষাদীক্ষার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন। চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসা, চুনতী মহিলা ডিগ্রি কলেজ, চুনতী মহিলা ফাজিল মাদ্রাসা, চুনতী হাই স্কুল ও প্রাইমারী স্কুলসহ প্রতিটি সাধারণ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তিনি বিভিন্নভাবে অবদান রেখে গেছেন।
এছাড়াও তিনি জীবদ্দশায় রজব মাসে মাহফিলে মেরাজুন্নবীসহ শবে বরাত, শবে কদর, আশুরা দিবস ও ফাতেহায়ে ইয়াজদহম–এর আয়োজন করতেন।
চুনতীর মাটিতে যেমন বহু বাঘা বাঘা শিক্ষাবিদ জন্মেছেন, তেমনি চুনতী আল্লাহর ওলি–দরবেশগণেরও পুণ্যভূমি। আজমগড়ী হযরতের তিনজন খলিফা চুনতী পাহাড়ে কেন্দ্রীয় কবরস্থানে পাশাপাশি শায়িত আছেন। যথা– শাহ মাওলানা ফজলুল হক (ইন্তেকাল: ১৯৪৪), শাহ মাওলানা নজির আহমদ (ইন্তেকাল: ১৯৪৪) এবং শাহ মাওলানা হাকিম মুনির আহমদ (ইন্তেকাল: ১৯৮১)। এছাড়াও চুনতীতে শায়িত আছেন বালাকোটের গাজী হযরত মাওলানা আবদুল হাকিম (রহ.), তাঁর ছোট ভাই নাসির উদ্দিন ডেপুটি এবং শুকুর আলী মুন্সেফ। তবে ১৯৭০–এর দশক থেকে মাহফিলে সীরতুন্নবীসহ হযরত শাহ সাহেব কেবলার অনন্য কর্মতৎপরতা চুনতী গ্রামকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করায়।
হযরত শাহ সাহেব কেবলা জীবনে মোট ৬ বার হজব্রত পালন করেন। যথাক্রমে ১ম বার ১৯৭০, ২য় বার ১৯৭২, ৩য় বার ১৯৭৪, ৪র্থ বার ১৯৭৬, ৫ম বার ১৯৭৮ এবং ৬ষ্ঠ বার ১৯৭৯ সালে। তিনি একাধিকবার ভারত সফরও করেছেন। ইন্তেকালের কিছু দিন আগে শেষবারের মতো ভারতে গিয়ে তিনি কলকাতায় পৌঁছান এবং বান্ডেল হযরত সৈয়দ আবদুল বারী (রহ.) আল হাসানী ওয়াল হোসাইনীর যেয়ারত করেন। এরপর বিমানে কলকাতা থেকে বানারস হয়ে আজমগড় যান। তথা হতে গোন্ডায় আজমগড়ী হযরতের মাজারে রাত্রিযাপন করেন। পরদিন দিল্লি হয়ে আজমীর যেয়ারতে যান।
তিনি অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। পরিণত বয়সেও তিনি ৫০–৬০ বছর আগের ছাত্রজীবনে পড়া আরবি–ফার্সি কবিতা এবং তাফসীর, হাদীস ও ফিকাহর জটিল বিষয়গুলো মুখস্থ বলতে পারতেন। দেশ–বিদেশের প্রখ্যাত আলেমগণ যখনই তাঁর সান্নিধ্যে আসতেন, তাঁর গভীর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন।
দুনিয়ার কোনো অর্থ–সম্পদের প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। ভক্তদের দেওয়া সমস্ত অর্থ তিনি গরীব ও দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। ইন্তেকালের সময় নিজের সম্বল বলতে কবরদকও ছিল না।
এই মহান আশেকে রসূল ১৯৮৩ সালের ২৯ নভেম্বর (২৩ সফর), মাহফিলে সীরতুন্নবী শুরু হওয়ার মাত্র ১৬ দিন আগে চুনতীস্থ নিজ বাসভবন ‘শাহ মঞ্জিলে’ ইন্তেকাল করেন। সীরত ময়দানে জানাজার পর মসজিদে বায়তুল্লাহর দক্ষিণ পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর ইন্তেকালের পর থেকে প্রতি বছর ২৩ সফর মসজিদে বায়তুল্লাহ কেন্দ্রীক ইছালে সওয়াব মাহফিল আয়োজন হয়ে আসছে।
১৯৬০–এর দশকে ছাত্রজীবন থেকেই আমার হযরত শাহ সাহেব কেবলাকে দেখার সৌভাগ্য হয়ে আসছিল। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল থেকে তাঁর খুব কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে ৩৭২ পৃষ্ঠার এই মহান আশেকে রসূলের প্রথম জীবনীগ্রন্থ রচনা করার সৌভাগ্য হয়, যা এ পর্যন্ত ৩ বার পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।
চুনতী মাহফিলে সীরতুন্নবীতে দেশ–বিদেশের বহু খ্যাতিমান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অন্যতম। তিনি একাধিকবার এই মাহফিলে এসে মঞ্চে হযরত শাহ সাহেব কেবলার পাশে বসেছেন, মাহফিলে রাখেন বক্তব্য। হযরত শাহ সাহেব কেবলার ইন্তেকালের ৪৩ বছর পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এই ১৯ দিনব্যাপী মাহফিলে সীরতুন্নবী অত্যন্ত সুন্দর ও সুচারুরূপে চলমান রয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার নবীপ্রেমিক এই মাহফিলে শ্রম ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন, যা সার্বকুল্যে প্রায় কয়েক কোটি টাকা হবে।
মহান আল্লাহ পাক এই মাহফিলে সীরতুন্নবীকে কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখুন এবং হযরত শাহ সাহেব কেবলাকে জান্নাতে আলা মাকাম দান করুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।












