আরাফার ময়দানে লাখ লাখ মানুষের অবস্থান, আখিরাতে হাশরের ময়দানের জড়ো হওয়ার নমুনা বলে দেয়। সূর্যের প্রচণ্ড খরতাপের মধ্যে আশা ও ভয়ের এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হয় এ ময়দানে। এক কথায় হজের প্রতিটি আমল থেকেই আখিরাতের কথা ভেসে ওঠে হাজিদের মনে। হজের সূচনায়ই হজযাত্রী নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার শপথ নেন। লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়ালমুলক লাশারিকা লাক। মহান আল্লাহর বিধানানুসারে যে চারটি মাস পবিত্র ও সম্মানিত তার একটি হলো জিলহজ মাস। এ মাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সময় হলো জিলহজ মাসের প্রথম দশক। হজ্জ একটি বার্ষিক বিশ্ব–মুসলিম মহাসম্মেলন। এই বিশ্ব মুসলিম সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অতি সহজেই একই সময় হাজীগণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা পৃথিবীতে। তা ছাড়া আরাফার বক্তৃতা হতে পারে মুসলিম জাতির জন্য পথ প্রাপ্তির সহজ উৎস। এভাবে এক বিরাট কল্যাণ প্রাপ্তির রাজপথ খুলে দিতে পারে পবিত্র হজ্জ সম্মেলন। হজে রয়েছে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক নানাবিদ শিক্ষা। সে শিক্ষাগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো :
আল্লাহর নির্দেশ পালন : আল্লাহতাআলা ইরশাদ করেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাবাগৃহে যাতায়াতের জন্য (দৈহিক ও আর্থিকভাবে) সক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর হজ করা ফরজ। (সুরা : আলে ইমরান : আয়াত : ৯৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, অনিবার্য প্রয়োজন কিংবা অত্যাচারী শাসক অথবা কঠিন রোগ যদি (হজে সামর্থ্যবান) কোনো ব্যক্তিকে হজ পালনে বিরত না রাখে তবে সে যদি হজ পালন না করে মারা যায় সে যেন ইহুদি ও নাসারার মতোই মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি হজব্রত পালন করল সে আল্লাহর নির্দেশ পালন করে নিজেকে ধন্য ও জান্নাতি মানবে পরিণত করল।
পবিত্র স্থানগুলোর দর্শন : পবিত্র মক্কা ও মদিনায় রয়েছে অগণিত পবিত্র স্থান। যেমন আল্লাহ তাআলার ঘর, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইব্রাহিম, সাফা–মারওয়া, আরাফার মাঠ, মিনা, মুজদালিফা, মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী, প্রিয় নবী (সা.) এর রওজা মোবারক, জান্নাতুল বাকি, জান্নাতুল মুয়াল্লা, জমজম কূপ ইত্যাদি। এসব স্থান দেখার ফলে ইমান বৃদ্ধি পায়।
আর্থিক সফলতা লাভ : কেউ সারা জীবন পরিশ্রম করে অল্প অল্প সঞ্চয় করে এবং এখানে একই সময়ে ব্যয় করে ফেলে, কিন্তু সারা বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও এরূপ ঘটনা দৃষ্টিগোচর হয় না যে কোনো ব্যক্তি হজ বা ওমরাহর জন্য ব্যয় করার কারণে নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত হয়ে গেছে। মহান আল্লাহ তাআলা হজ ও ওমরাহর সফরে এই বৈশিষ্ট্য নিহিত রেখেছেন যে হজ করার পর কোনো ব্যক্তি দরিদ্রতা ও দীনতার সম্মুখীন হয় না। বরং হজ ও ওমরাহ পালনে ব্যয় করলে দরিদ্রতা ও অভাবগ্রস্ততা দূর হয়ে যায়।
পাপাচার থেকে বাঁচার সুযোগ : হজ এমন একটি ইবাদত যা হজব্রত পালনকারীকে সর্বপ্রকার পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করে এবং তাতে অশ্লীল ও গুনাহর কাজ থেকে বেঁচে থাকে, সে হজ থেকে এমতাবস্থায় ফিরে আসে যেন আজই মায়ের গর্ভ থেকে বের হয়েছে, অর্থাৎ নবজাত শিশু যেমন নিষ্পাপ থাকে, হজ পালনকারীও তদ্রূপ হয়ে যায়।
আল্লাহকে স্মরণ করার মুখ্য সময় : হজের সময় আল্লাহতাআলাকে স্মরণ করার, তাঁর ইবাদত করার, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার এবং তাঁর কাছে ধরনা দেওয়ার উত্তম সময়। মহান আল্লাহ হজরত ইব্রাহিম (আ.) কে নির্দেশ দেন, ‘মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও, যেন তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু জবাই করার সময়। (সুরা : হজ, আয়াত : ২৮)
ত্যাগের প্রশিক্ষণ : আল্লাহর রাহে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ইসমাইল (আ.) ও হাজেরা (আ.) এর ত্যাগ–তিতিক্ষা, শ্রম, কোরবানি, আত্মসমর্পণ ও অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সুমহান ঐতিহ্য আল্লাহপ্রেমিক মানবের হৃদয়কে অনুপ্রাণিত করে। হজ ও কোরবানি এ ত্যাগের শিক্ষা দেয়।
বিশ্বভ্রাতৃত্বে শিক্ষা : মহানবী (সা.)বলেছেন, সব মুসলমান ভাই ভাই। তার জ্বলন্ত নিদর্শন হজব্রত পালন। সব ধরনের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আরাফার মাঠে সব একত্রিত হয়। যেন সবাই একই মায়ের সন্তান। একই ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করে একই স্রষ্টার কাছে দোয়া করে। হজ বিশ্ব মুসলমানদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জোরদার করে। হজ শেষ করে নিজ নিজ দেশে গিয়ে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করে।
আল্লাহর নিয়ামত লাভের সুযোগ : হজব্রত পালনকারীদের ওপর আল্লাহর নিয়ামত বর্ষিত হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, যখন হাজিরা আরাফাতে অবস্থান করে দোয়া ও কান্নাকাটি করতে থাকে তখন আল্লাহতাআলা দুনিয়ার আসমানে আসেন এবং ফেরেশতাদের বলেন, আমার বান্দাদের দেখো ওদের চুল এলোমেলো হয়ে আছে পরিধেয় বস্ত্র ধুলাবালিতে মলিন। দেখো ওরা এ অবস্থায়ই আমার কাছে চলে এসেছে। আর আল্লাহতাআলার রহমতে আরাফার দিন অধিক সংখ্যক পাপীকে ক্ষমা করে দেওয়ার ফলে শয়তান খুবই ব্যথিত হয়।
মাগফিরাত ও তাওবা করার সুবর্ণ সুযোগ: আল্লাহ তাআলার ঘরের জিয়ারত ও আরাফা, মিনা, মুজদালিফা ইত্যাদি পবিত্র স্থান জিয়ারতের মাধ্যমে হজব্রত পালনকারী আল্লাহর কাছে মাগফিরাত ও তাওবা করার সুযোগ লাভ করে। আল্লাহর ঘরকেন্দ্রিক সব স্থান ও আরাফা, মিনা, মুজদালিফা ইত্যাদি সব স্থানই দোয়া কবুল হওয়ার জায়গা। আর আল্লাহ তাআলা এসব স্থানে তাদের দোয়া কবুল করেন।
সামরিক প্রশিক্ষণ : হজের কার্যক্রম গভীরভাবে চিন্তা করলে মনে হবে যেন একদল চৌকস সেনাবাহিনীর সামরিক মহড়া। মিনায় তাঁবুজীবন, আরাফায় বিশাল প্রান্তরে অবস্থান, মুজদালিফায় রাত্রিযাপন, জামারায় কংকর নিক্ষেপ, মিনায় পশু কোরবানি, আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ, সাফা–মারওয়ায় সায়ি ইত্যাদি কাজ যেন একদল প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর সামরিক মহড়া। যা কাফির, নাস্তিক–মুরতাদ, মুশরিক ও আল্লাহর শত্রুদের মনে ভয়ের সঞ্চার করে।
ইমান নবায়ন করার সুযোগ : হজ মুমিনদের ইমান নবায়ন করার ক্ষেত্র। হজ আগত মুমিনদের অপূর্ব এক ইমানি চেতনায় উজ্জীবিত করে তোলে। হজব্রত পালনকারী দুনিয়ার সব কিছু থেকে বিমুখ হয়ে একমাত্র আল্লাহমুখী হয়ে যায়। ফলে মুমিন পার্থিব লাভের চেয়ে পারলৌকিক লাভকেই প্রাধান্য দেয় এবং পারলৌকিক সুখশান্তির জন্য সদা কাজ করে। আর এতে তার ইমান তাজা হয়।
পাপের প্রতি ঘৃণা : হজব্রত পালনের ফলে হাজিদের মধ্যে পাপের প্রতি ঘৃণা জন্মায়। কারণ সে হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করে পাপমুক্ত হয়। আর জামরায় কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে নিজের মধ্যকার শয়তানের প্রতি ধিক্কার জানায়। সব শেষে আল্লাহর ঘরের বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে পাপ থেকে মুক্ত থাকার অঙ্গীকার করে আল্লাহর ঘর থেকে বিদায় নেয়। সুতরাং হজব্রত পালনকারী পাপের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে।
তাকবিরের বাক্য : ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে মহানবী (সা.) বলেন অতএব তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি করে তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবির (আল্লাহু আকবার) এবং তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) পড়বে। জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর একবার তাকবির বলা ওয়াজিব। তাকবিরের বাক্য নিম্নরূপ: আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান। সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য। লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। এখানে নেই ধনী–গরিব, মনিব গোলামের কোনো প্রভেদ। নেই শাসকের প্রভুত্বসুলভ অহংকার। নেই শাসিতের হীনম্মন্যতা। ভাষা–বর্ণ ছাপিয়ে সর্বত্র ভেসে ওঠে সর্বজনীন ইসলামী ভ্রাতৃত্বের মনোরম এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। হজের প্রতিটি আমল থেকেই আখিরাতের কথা ভেসে ওঠে হাজিদের মনে। আল্লাহতাআলা আমাদের পবিত্র ঘরের তাওয়াফ ও নবীর রওজার জিয়ারত নসিব করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।












