আমি গ্রামের মেয়ে। গ্রামেই কেটেছে আমার শৈশব এবং কৈশোর। তখনকার দিনে গ্রামের বর্ষবরণের রূপ এখনকার মতো এত রঙিন এমন ছিল না। বর্ষবরণ উপলক্ষে শহরের মতো এমন নিয়ম করে আমাদের জন্য নতুন কাপড়চোপড় কেনার প্রথাও ছিলো না গ্রামে। তখন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এখনকার মতো পান্তা ইলিশ খাওয়ারও ধুম পড়তো না। লাল পেড়ে সাদা শাড়ির চলও ছিল না। কিন্তু, সেই সময়েও পহেলা বৈশাখে উৎসবের আনন্দ ছিল, ছিল জমজমাট বৈশাখীমেলার আয়োজন। এখন এই মধ্য বয়সে এসেও আমি চোখ বুজলেই নয়নমণিতে স্মৃতির ঢেউয়ে তোলপাড় তোলে সেই ছেলেবলার পহেলা বৈশাখ। মনে পড়ে, বৈশাখীমেলায় যাওয়ার উৎসাহ আর উৎকণ্ঠায় চৈত্র সংক্রান্তির রাতটা কীভাবে নির্ঘুম কাটাতাম আমরা সব ভাইবোনেরা মিলে!
আমাদের ছেলেবেলায় পহেলা বৈশাখের সকালটা সোনাঝরা রোদ্দুরের আলোয় আর মায়ের হাতের মজাদার রান্নার সুবাসে খুব আনন্দময় ছিল। আমাদের মা আগের রাতেই বলে রাখতেন, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে আমরা যেন সব কাজ ঠিকঠাক ও সময়মতো করি। নিয়মনীতি ঠিক রেখে সারাটা দিন পার করতে পারলেই নাকি আমাদের আগামী বছরটাও খুব নিয়মানুবর্তীতার মধ্যে কাটবে। মা আরো বলতেন, সেদিন ভালোমন্দ খেলেও সারাবছর আমরা ভালোমন্দ খাওয়ার সুযোগ পাব। আমরাও তখন মায়ের কথার অবাধ্য হতাম না। উনি যেভাবে যা করতে বলতেন আমার তা–ই করতাম। বছরের প্রতিটি দিনকে মঙ্গলময় করার প্রত্যাশায়।
দুপুরের ভালোমন্দ রান্না হতো। মজা করে সবাই মিলে একসাথে খেতাম। খাওয়াদাওয়ার পরপরই সব ভাইবোনদের বাহিনী মিলে বৈশাখী মেলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যেতাম। আমাদের গ্রাম থেকে চার পাঁচটি গ্রাম পার হয়ে কালী নদীর পাড়ে বিশাল একটি গাছের নিচে বসতো সেই কাঙ্ক্ষিত বৈশাখী মেলা। এজন্য আমাদের এলাকার লোকজন সেই মেলাকে বলতো ‘গাছতলার মেলা’। মেলার সময়কাল ছিল মাত্র একদিন। তাই তো প্রায় দৌড়ে দৌড়েই আমরা মেলায় পৌঁছে যেতাম। দেরি হয়ে গেলে মেলার পুরো মজাটাই মাটি হয়ে যেত। কারণ সেদিনের সন্ধ্যার পরপরই মেলার আয়োজন শেষ হয়ে যেত।
মেলায় অনেক রকমের জিনিস সাজিয়ে নিয়ে বসতো ফেরিওয়ালার দল। চুড়ি, মালা, ফিতা, ক্লিপ, আলতা আরো কত কি ! কিন্তু আমাকে তখন কোনকিছুই তেমন আকর্ষণ করতো না। কারণ আমি গাছবাদূরে মেয়ে ছিলাম। আমার মেলায় যাওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য থাকতো ‘কাটারি’ নামের এক জাতীয় ছোটো বটি দা, যা খুব সহজেই পকেটে লুকিয়ে রাখা যেত। যেটা দিয়ে পথে চলতে চলতে আমি যার তার আম গাছে উঠে কাঁচা আম চুরি করতাম আর সেই কাটারি দিয়ে কেটে কেটে গাছে বসেই মজা করে খেতাম। তাই মেলায় ঢুকেই আমি আর আমার সমবয়সী সঙ্গি চাচাত ভাই কাইয়ুম ও বাদলকে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেই কাটারির দোকানের সন্ধানে মেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত হেঁটে বেড়াতাম। আমার আর কাইয়ুমের জমানো টাকায় কাটারি কিনে তারপর অন্য জিনিস দেখতাম। বাদলটা জীবনেও টাকা দিত না। ছোটবেলায় বাদল সে–ই রকমের চালাক ও কিপ্টা ছিল।
এদিকে তেমন কিছু কেনাকাটা করার আগেই আকাশ কালো হয়ে আসতো। তুমুল গর্জনে বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হয়ে যেত। তার সাথে শুরু হতো দমকা ঝড়ো হাওয়া। আমরা আতঙ্কিত হয়ে একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে বলতাম, এই রে….এখনই বুঝি কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়ে গেল! নদীতীরের ধুলো উড়ে এসে আমাদের চোখ ঝাপসা হয়ে যেত। যার যা কেনা হয়েছে তা নিয়েই চাচাতো ভাইদের হাত ধরে তখন আবারও দৌড়াতাম বাড়ি ফেরার তাড়ায়। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগ মুহূর্তেই ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে, জামার কোঁচর ভরে আম কুড়িয়ে, কাকভেজা হয়ে আমরা সকলেই বাড়ি ফিরে আসতাম।
বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই চোখে পড়তো আমাদের অপেক্ষায় মা আর চাচীরা তখন বাংলাঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দোয়া দরুদ পড়ছেন। আমাদের ফিরতে দেখে দৌড়ে এগিয়ে এসে কান মলে দিয়ে বকাঝকা দিতে শুরু করতেন। তখনই দাদি এসে আমাদের ওই দজ্জাল মা, চাচীদের হাত থেকে উদ্ধার করতেন। দাদি আমাদেরকে ঘরে নিয়ে এসে আদর করে গা মুছিয়ে কাপড় বদলে দিয়ে গরম দুধ খেতে দিতেন। আমি কিছুতেই দুধ খেতে চাইতাম না। দুধ আমার আজন্মই অপছন্দের এক খাবার। ঠিক স্বাদের জন্য নয়। আসলে গরুর দুধ দেয়া সেই বিশেষ অঙ্গটিকে আমার ভীষণ ঘেন্না লাগতো। তবু আম্মা আমাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য লাঠি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। নিরুপায় হয়ে নাক টিপে ধরে চোখ বুজে আমি একটানে দুধ শেষ করতাম। এরমধ্যেই কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে যেত। গ্রামের কাঁচাঘর আর বড়ো বড়ো গাছ সেই ঝড়ে বিকট শব্দে ভেঙে পড়তো। ঝড় বৃষ্টি আর তীব্র বাতাসে বৈশাখেও তখন যেন পৌষের মতো শীতের আমেজ পেতাম! হারিকেনের আলোয় কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম তা বুঝতেই পারতাম না।
ঘুমের মধ্যেও স্বপ্নঘোরে তখনও আমি যেন বৈশাখীমেলাতেই ঘুরে বেড়াতাম। ধাঁরালো সেই কাটারি কিছুতেই যেন খুঁজে পাচ্ছি না! ওদিকে মেলার আয়োজন শেষ হয়ে যাচ্ছে। আকাশ ভেঙে তীব্র বাতাসের সাথে যেন শিলাবৃষ্টি হচ্ছে! আর আমি শুধু মেলার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে ঘুরে কাটারি খুঁজেই চলেছি। গভীর রাতে ঝড়ের তাণ্ডবেই ঘুম ভেঙে যেত। জেগে উঠে আতঙ্কিত হয়ে কান পেতে শুনতাম ঝড় বাতাস আর বৃষ্টির সাথে পাশের হিন্দু বাড়িগুলো থেকে ভেসে আসা শাখের ধ্বনি। এভাবেই কেটে যেত আমাদের ছেলেবেলার পহেলা বৈশাখ।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক














