দুর্নীতি শব্দটি বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি মানুষের কাছে পরিচিত শব্দ। সামাজিক জীবন ব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষকে কোনো না কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। তিনি অতি ধনী হলে এমনকি তিনি অতি দরিদ্র হলেও তাকে দুর্নীতির মুখোমুখী হতে হয়। কিন্তু মানুষ মনে করে– ‘কাজটি তাকে করতে হবে। না হয় তিনি বা ব্যক্তি অনিশ্চিয়তার মুখোমুখী হবেন বা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন বা সমাজে অসম্মানিত হবেন অথবা লাভবান হবেন না।” এ অবস্থায় তিনি দুর্নীতিকে মেনে নিয়ে নিজের স্বপক্ষে কাজটি করিয়ে নেন।
দুর্নীতির অর্থ হল, যা নীতি সিদ্ধ নয়। অর্থাৎ যে কোন ব্যক্তির সাংবিধানিক অধিকার অনুসারে যে বিষয়টি তার প্রাপ্য ছিল সেটি যখন পায় না তখন ব্যক্তি ভিন্ন পথ দিয়ে এগিয়ে যায়। এই ভিন্ন পথটি হচ্ছে দুর্নীতির পথ। একজন ব্যক্তি সারাজীবন সৎপথে চলেছেন। তাকে যখন ঘুষ বা দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে কোন কাজ করতে হয় তখন তিনি বিমর্ষ হয়ে যান। সমাজের প্রতি তার চলে আসে ঘৃণা ও ধিক্কার। এ বিষয়ে আমার এক বন্ধুর বাস্তব জীবনের কথা মনে পড়ে গেল। ভদ্রলোক বিগত শতাব্দীর নব্বই এর দশকে একটি বেসরকারি কলেজে যোগদান করে টিচার হিসেবে। বেসরকারি কলেজে যখন এমপিও (গড়হঃযষু চধুসবহঃ ঙৎফবৎ) শুরু হয় স্বাভাবিক নিয়মে তার নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রায় ছয়মাস পর জানতে পারে যে, তার নাম এমপিওভুক্ত হয়নি। কারণও অজানা। ভদ্রলোক যথানিয়মে অধ্যক্ষ মহোদয়ের সহায়তায় ঢাকার বড় অফিসে যোগাযোগ করলেন। সশরীরে উপস্থিত হয়ে সব কাগজপত্র আবার জমা দিলেন। কিন্তু বিধি বাম। প্রায় দুই বছর যাবৎ কোনো বেতন পাননি। দুঃখ, কষ্ট, দারিদ্র্য তাকে এমনভাবে পেয়ে বসলো যে, সদ্য বিবাহ করা ব্যক্তি স্ত্রীর নিকট নিজের আত্ম সম্মান তো দূরের কথা আগত সন্তানের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে একদিন আমার কাছে উপস্থিত। বন্ধু আমার কাছে কিছুতেই আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়নি। বরং এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় জানতে চায়। আমি ঘুষ দিয়ে উদ্ধার পাওয়ার পক্ষে না। তাই বন্ধুকে বললাম, তুমি ঢাকায় গিয়ে ঐ বড় অফিসের ডিলিং কর্মকর্তার সাথে কথা বল। কী অসুবিধা? কোন্ কোন্ কাগজপত্র জমা দেয়া হয়নি। এরপর বন্ধু আমার উপদেশ শুনে ঠিক ঠিক সশরীরে ঢাকায় গিয়ে ‘কিছু একটা প্রক্রিয়া’ অবলম্বন করে অবশেষে মুক্তি পায়। তাকে একবার জিজ্ঞাস করেছিলাম ‘কিছু একটা প্রক্রিয়া কী? ইহাই দুর্নীতি। বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে, সমাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে এ দুর্নীতি ঢুকে গেছে। এ দুর্নীতি মোকাবেলা করার জন্য সরকার বিভিন্ন প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে এবং এখনও করছে। ভূমি অফিসের দুর্নীতি সম্পর্কে দীর্ঘ দিন থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। মন্ত্রী মহোদয়রা অতীতে অনেক কথা বলেছে। কোনো কোনো সময় মন্ত্রী মহোদয় ভূমি অফিসে সশরীরে উপস্থিত হয়েছে, অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা করেছে। খতিয়ান সৃজনের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে। তারপরও জনগণ রেহায় পেয়েছে? না। রেহায় পায়নি। এখনও পাচ্ছে না। ভূমি অফিসের দেয়ালে লিখা আছে কোন কাজের দায়িত্বে কোন অফিসার। কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে কত ফি বা টাকা লাগবে। সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু যিনি এ কাজটি করার জন্য যাবেন তার কাছে সব কাগজপত্র থাকলেও বলা হয় এটা নেই, ওটা নেই। পরের সপ্তাহে আসেন। এদেশের অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠী এমনিতেই সরকারি অফিসকে ভয় পায়। অতএব তিনি হতাশা হয়ে নির্বাক হয়ে যান। বাধ্য হয়ে খুঁজতে থাকেন মিডিয়া বা দালাল চক্রকে। হ্যাঁ, তিনি দালাল চক্রের মধ্যে পড়ে যাবেন। তবে তাকে পরিশোধ করতে হয় পনের থেকে ষোল গুণ বেশি ফি বা টাকা। কাজ ঠিকই হয়েছে। তবে সরকারি নিয়মে প্রদেয় অর্থের চেয়ে পনের বা ষোলগুণ বেশি পরিমাণ অর্থ দিয়ে। এটাই দুর্নীতি।
বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আছে। শহরে অধিকতর নাগরিক সুবিধা থাকার কারণে উচ্চবিত্তরা শহরে নিজস্ব একটি আবাসস্থল নির্মাণ করতে চায়। আবার ব্যবসায়ীরা বিশাল বিশাল আবাসস্থল নির্মাণ করে অবশ্যই ব্যবসা করতে চায়। এতে অর্থণীতি চঞ্চল হয়ে উঠে। আর এই চঞ্চলতা থেকে বিশাল জনগোষ্ঠীর আয় প্রবাহ এক খাত থেকে আর এক খাতে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ আবাসস্থল নির্মাণ করার জন্য প্রয়োজন হয় লোহা, ইট, বালি, সিমেন্ট এবং পর্যাপ্ত শ্রমিক। এসব খাতে আয় প্রবাহ স্থানান্তরিত হয়। এজন্য সরকারও চায় এরূপ ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারতা। কিন্তু ইমারত নির্মাণের পূর্বে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ একটি আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্ত হতে হয়। এই শুরু হলো বিড়ম্বনা। এরূপ বিড়ম্বনা থেকে রেহায় পাওয়ার জন্য দুর্নীতি শব্দটিকে পরিহার করা যায় না। পৃথিবীর প্রায় দেশে এরূপ কিছু না কিছু দুর্নীতি রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দুর্নীতিকে কিভাবে মোকাবেলা করা যায়? দুর্নীতি বিরোধী লেখক মার্ক পায়ম্যান ও পল এম.হেইউড এর লিখিত গ্রন্থ ‘সেকশন বেজড অ্যাকশন এগেইনস্ট করাপশন’– এ বলেছেন, দুর্নীতি মোকাবেলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো খাতভিত্তিক এগিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ একটি দেশের সবখাতকে একত্রে বিবেচনা করে দুর্নীতি না খুঁজে খাতভিত্তিক দুর্নীতি খুঁজে বের করা। যেমন– শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, অবকাঠামো, পুলিশ ইত্যাদি খাত ভিত্তিক দুর্নীতি চিহ্নিত করা। একই সাথে অগ্রাধিকার নির্দিষ্ট করে বাস্তবসম্মত: সমাধান খুঁজে বের করা। লেখকদ্বয় এ পদ্ধতিকে নাম দিয়েছেন ‘সেরা’ (ঝবৎধ) পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে চারটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপে খাত নির্বাচন করতে হবে। অর্থাৎ সেক্টর (ঝবপঃড়ৎ) নির্বাচন করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ এক্সপোজার (ঊীঢ়ড়ংঁৎব) বা ঝুঁকি নিরূপন করতে হবে। তৃতীয় ধাপে প্রতিক্রিয়া বা প্রতিকার পরিকল্পনা করতে হবে। অর্থাৎ রেসপন্স (জবংঢ়ড়হংব) করতে হবে যে কিভাবে প্রতিকার করা যায়। চতুর্থ ধাপে বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থাৎ অ্যাকশন (অপঃরড়হ) পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই পদ্ধতির নাম দেয়া হয়েছে ‘সেরা’ (ঝবৎধ)।
প্রকৃতপক্ষে ‘সেরা’ হলো খাত ভিত্তিক দুর্নীতি মোকাবেলার কৌশল। দুর্নীতিকে একটি বিমূর্ত সার্বিক সমস্যা হিসেবে না দেখে নির্দিষ্ট খাতের নির্দিষ্ট ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধান করার পদ্ধতি হলো (ঝবৎধ)। যেমন প্রথম ধাপে দুর্নীতির নির্দিষ্ট খাত নির্বাচন করা হয়। উদ্দেশ্য হলো– দুর্নীতির বিষয়টি স্পষ্ট করা। বাংলাদেশে দুর্নীতি আছে। এই কথাটি যে কোনো কেউ সহজভাবে বলতে পারে, কিন্তু কোথায় দুর্নীতি আছে, কোন জায়গায় দুর্নীতি আছে তা স্পষ্ট করে বলতে হবে। যেমন– স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি আছে– এ কথাটি যে কেউ বলতে পারে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের কোন জায়গায় দুর্নীতি হচ্ছে বা আছে তা নির্দিষ্ট করে তেমন কেউ বলে না। যদি বলি স্বাস্থ্য খাতে ঔষধ ক্রয়ে ঝুঁকি আছে তবে তা প্রতিকারের জন্য এগিয়ে যাওয়া সহজ। কাজেই দুর্নীতির খাত নির্বাচন করে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এতে দায়বদ্ধতা স্পষ্ট হয়, তথ্য সংগ্রহ করা সহজ হয় এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। দ্বিতীয় ধাপে ঝুঁকি নিরূপন করতে হবে। অর্থাৎ দুর্নীতি কোন প্রক্রিয়ায় ঘটছে, কোথায় ক্ষমতা ব্যবহার করে কর্ম প্রক্রিয়াকে ধীর গতি করা হচ্ছে, কোন ধাপে স্বচ্ছতা কম এবং বিশেষ করে কারা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছে– এসবের উত্তর নিরূপন করতে হবে। এই ধাপে তথ্য, পর্যালোচনা বৈঠক, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ইত্যাদি করা হয়। আমাদের দেশে সাধারণত দুর্নীতি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু দুর্নীতির প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা নিয়ে বিশ্লেষণ করি না।
খাত ভিত্তিক দুর্নীতি মোকাবেলায় কৌশল হিসেবে তৃতীয় ধাপটি হয় প্রতিকার পরিকল্পনা বা রেসপন্স। ঝুঁকি চিহ্নিত হওয়ার পর সেই ঝুঁকি কমাতে বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরি করতে হবে। যেমন– স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া, ই–প্রকিউরমেন্ট চালূ করা, ডিজিটাল নজরদারী করা ইত্যাদি। এখানে মনে রাখতে হবে দুর্নীতি সম্পূর্ণ নির্মূল করা নয় বরং দুর্নীতি কমানো হবে মৌলিক উদ্দেশ্য। কারণ একদিনে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। খাতভিত্তিক দুর্নীতি মোকাবেলায় চতুর্থ ধাপে বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের মাধ্যমে অ্যাকশনে যেতে হবে। এখানে প্রয়োজন নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। সময়সীমা, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল মূল্যায়ন। বাংলাদেশে সংস্কারের বড় দুর্বলতা হলো– নীতিপত্র থাকে, বাস্তবায়ন হয় না। কিন্তু দুর্নীতি মোকবেলার চতুর্থ ধাপে বলা হয় যে, এখানে প্রয়োজন নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল মূল্যায়ন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভূমি অফিসের নামজারির আবেদন যদি ত্রিশ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, তাহলে একটি অনলাইন ড্যাশবোর্ডে কি পরিমাণ আবেদন সময়মত নিষ্পত্তি হয়েছে তা দেয়া যেতে পারে। এতে জবাবদিহিতা তৈরি হবে। বাংলাদেশে দুর্নীতি কোনো বিমূর্ত সূচক নয়, বরং বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। সরকারি হাসপাতালের বেড পেতে অতিরিক্ত কত টাকা দিতে হয়, ভূমি অফিসে নামজারি আটকে থাকে, ঠিকাদারি কাজে অস্বচ্ছতা থাকে, থানায় অভিযোগ নিতে গড়িমসি হয়– এই সবই দুর্নীতির মূর্ত প্রতীক। বিভিন্ন খাতে বিশাল জনগোষ্ঠীর নানাবিধ খারাপ বা জনঅসন্তোষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দুর্নীতি ছাড়া খুব কম সংখ্যক লোকই সেবা পেয়েছে বলে মনে হয়। দুর্নীতি যে জায়গায় ঘটে, সেটি হচ্ছে নির্দিষ্ট খাতের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতরে, যা কিনা বাইরের কেউ যেমন দেখে না তেমনি কেউ সাক্ষীও থাকে না। ফলে বাইরের কোনো ব্যক্তির পক্ষে তা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। তবুও উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে দুর্নীতি অনেকাংশে হ্রাস করা যেতে পারে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।













