১২ দিনের ব্যবধানে মারা গেল যমজ দুই ভাই

হামের উপসর্গ

মীরসরাই প্রতিনিধি | শুক্রবার , ৫ জুন, ২০২৬ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ

মীরসরাইয়ে দুই যমজ শিশু সন্তানকে বাঁচাতে পারলেন না এক দরিদ্র পিতা। শহরের পর শহরের হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে গ্রামের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হলো দুই যমজ ভাই। দুই পুত্র শিশুকেই হারিয়ে পাগল প্রায় বাবামা। হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ দিনের ব্যবধানে তাঁর এক বছর বয়সী যমজ দুই পুত্র সন্তানেরই মৃত্যু হলো অবশেষে। সন্তানদের চিকিৎসার প্রায় সব টাকাই তিনি ঋণ করে খরচ করেছেন। শোকে কখনো নির্বাক কখনো বুক চাপড়ে কাঁদছেন বাবামাসহ স্বজনরাও।

দুই সন্তানের পিতা হারুনুর রশিদ (৩৫) মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খৈয়াছড়া তাকিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। স্ত্রী ইসরাত জাহান (২৮)। এই দম্পতির ঘর আলো করে যমজ দুই সন্তানের জন্ম হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল। একজনের নাম রেখেছিলেন আবদুল্লাহ আল ফাহিম, আরেকজনের আবদুল্লাহ আল নোমান। এ দম্পতির ৬ বছর বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

স্থানীয় বড়তাকিয়া বাজারে ছোট একটা মুদিদোকান রয়েছে হারুণের। যা একমাত্র আয়ের উৎস। ছেলেদের চিকিৎসার জন্য গত তিন মাস দোকানও খুলতে পারেননি তিনি। বরং ধারদেনা করে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় করেছেন চিকিৎসায়।

যমজ সন্তানের মধ্যে গত ২২ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে আবদুল্লাহ আল নোমানের মৃত্যু হয়। এরপর গত মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আবদুল্লাহ আল ফাহিমের। গত বুধবার রাত ১১টায় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। দুই মানিকজোড় চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে পাশাপাশি এখন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে হারুনুর রশিদের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, আগত দুজন স্বাস্থ্যকর্মী শিশু দুটির মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করছেন। হারুনুর রশিদ জানান, জন্মের পর থেকেই দুই ছেলে ছিল বেশ চঞ্চল ও প্রাণবন্ত। চলতি বছরের ৮ মার্চ ফাহিমের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৮ মার্চ তার হাম শনাক্ত হয়।

তখন ফাহিম কিছুটা সুস্থ হলে ২৫ মার্চ তাকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এর কয়েক দিনের মধ্যে আবার তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। পরে তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে নোমানেরও হামের উপসর্গ দেখা দেয়। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর তারও হাম শনাক্ত হয়। এরপর ২২ মে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নোমানের মৃত্যু হয়।

এদিকে হামের পর সৃষ্ট নানা জটিলতায় ফাহিমের অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। নোমান মারা যাওয়ার পরদিন ফাহিমকে ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের সংকট থাকায় তিন দিন পর নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় ফাহিমকে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিজের দুই সন্তানের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ধারদেনা করে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করেছি। হাসপাতালে না খেয়ে থেকেছি আমরা। টাকা খরচ হলেও যদি ছেলেদের ফিরে পেতাম, কোনো আফসোস থাকত না। এখন আমাকে দেনার মধ্যে ফেলে দুই বুকের ধন চলে গেছে।’ প্রতিবেশী গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘বাচ্চা দুটি খুবই সুন্দর আর হাসিখুশি ছিল। এলাকার সবাই তাদের খুব আদর করত। একই পরিবারের দুই শিশুর এমন মৃত্যু আমাদের সবাইকে কাঁদিয়েছে। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’

বাবা হারুন কাঁদতে কাঁদতে আরো বলেন, ‘স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এনজিও কারও কাছে হাত পাততে বাকি রাখিনি। সব মিলিয়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করেছি। ছেলেদের বাঁচানোর জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছি, তবু বুকের দুই ধনকে বাঁচাতে পারলাম না।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধবন্ধ ও অলাভজনক কারখানায় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রোড শো করবে সরকার
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৭৭২টি পশুর চামড়া গেল কোথায়