খাল পুনর্নির্মাণ কাজের সুবিধার্থে নগরের হিজরা খালে দেয়া বাঁধগুলো আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে অপসারণ করে খালটি সচল করা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এসময় তিনি শুষ্ক মৌসুমে আবারও খালটির সংস্কার কাজ করা হবে বলে জানান। তিনি দাবি করেন, চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে না, চট্টগ্রাম আগের মতই সুন্দর আছে।
তিনি গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় নগরের প্রবর্তক মোড়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। গত সোম ও মঙ্গলবার জলাবদ্ধতা হয়েছে নগরে। বিষয়টি গতকাল সংসদেও আলোচনা হয়। এরপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গতকাল সন্ধ্যায় নগরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চট্টগ্রাম আসেন মীর শাহে আলম। রাত প্রায় ৮টার দিকে প্রবর্তক মোড়ে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এসময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, খাল নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করার সময় যখন আপনি কনস্ট্রাকশন করবেন, তখন স্টিল স্ট্রাকচারের মাধ্যমে একটি রিটেইনিং ওয়াল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করতে হয়। যাতে উল্টো দিক থেকে মাটি বা কাদা পানি এসে কনস্ট্রাকশন ওয়ার্ককে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। ঠিক এই খালটিরও (হিজরা খাল) এইরকম মাঝখান দিয়ে একটি ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর মনে করেছিল, ১৫ মের মধ্যে তারা কাজটি সম্পন্ন করে রিটেইনিং ওয়ালটি উইথড্র করে খালটি সচল করবে। হঠাৎ এই সময়ের মধ্যেই মহান আল্লাহর সৃষ্টি বর্ষাকালের আগে অতি বৃষ্টি হয়ে যাবে, এটা না আমরা জানতাম না, ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের লোকজন জানতো।
এসময় তিনি বলেন, এখন যেহেতু ঘটনা ঘটে গেছে দুয়েকদিন হয়তো এলাকার মানুষ একটু কষ্ট পেয়েছে। এখন পানি নিষ্কাশন হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের শামসসহ (ব্রিগেডিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম) তাদের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। স্টিল স্ট্রাকচারের রিটেইনিং ওয়াল যেটি দেওয়া আছে সেটা আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে তারা উইথড্র করে খালটি সচল করে দিবে। বর্ষা মৌসুম পার হওয়ার পর, শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার আগে তারা আবার তাদের পুরনো প্রক্রিয়ায় ফিরে গিয়ে খালটি সংস্কার বা পুর্ননির্মাণের কাজটি তারা করবে।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, আমি মিডিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, আপনারা যেভাবে নিউজটি করেছেন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে বলছে– চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে, আমি সন্ধ্যার পর থেকে চট্টগ্রাম এসে ঘুরে দেখলাম– চট্টগ্রাম শহর পানির ওপর ভাসছে না। চট্টগ্রাম শহর সুন্দর আছে, যেরকম ছিল সেরকমই আছে। হঠাৎ করে অতি বৃষ্টির কারণে কিছুটা পানি জমাট বাধলেও সঠিক সময়ে পানি নিষ্কাশন হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আবারো রিপিট করছি চট্টগ্রাম নগরী পানির ওপর ভাসছে না। চট্টগ্রাম নগরী শুষ্ক মৌসুমে যেরকম থাকে সেরকমই আছে। প্রবর্তক মোড়ের এখানে খাল পুর্ননির্মাণের কারণে একটু জলাবদ্ধতা হয়েছিল। এখন নিষ্কাশন হয়েছে। আমি নিজে পানির মধ্যে দিয়ে হেঁটে এসেছি। যেটুকু পানি আছে আজকে এবং আগামীকাল সকালের মধ্যে এটাও নিষ্কাশন হয়ে যাবে। ড্রেনটি যেটি ব্যারিকেড তৈরি হয়ে আছে, ইঞ্জিনিয়ারিং বোর্ডের লোকজন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে এটি অপসারণ করে নিয়ে যাবে।
মীর শাহে আলম বলেন, চট্টগ্রাম ৬০ কিলোমিটার আয়তনের একটি সিটি কর্পোরেশন। প্রবর্তক মোড়ের এই জায়গাটা আমরা পানির মধ্যে যতটুকু হেঁটে দেখলাম, এটা ৬০ ফুটও হবে না। সর্বোচ্চ ৩০ ফুট জায়গা হবে। আমি নিজে পায়ে হেঁটে এর মধ্যে দিয়ে আসছি, এক গোছা পানি হবে।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের অনেকগুলো খালের মধ্যে ৩৬ টি খাল সংস্কার, পুর্ননির্মাণ ও পানির প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানপাওয়ারের ঘাটতি থাকায় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের মাধ্যমে এই কাজটি বাস্তবায়ন করে। ২০১৬ সালের এই প্রকল্পটি (জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত সিডিএর মেগা প্রকল্প) ২০১৯ সালে সমাপ্ত না হওয়ায় ২০২২ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ২০২২ সালে সমাপ্ত না হওয়ায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়, ২৪ সালেও সমাপ্ত না হয় এটি ২৬ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে এবং এবং সময়ে সময়ে টাকার পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে, আমি ওইদিকে আর যাচ্ছি না।
মীর শাহে আলম বলেন, আমার কাছে যেটুকু রিপোর্ট রয়েছে, এই ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০ টি খালের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। পাঁচটি খালের কাজ এমন পর্যায়ে আছে সেটি খুব একটা পানিকে বিভ্রম ঘটাবে না। আমরা যে হিজরা খালের কাছে দাঁড়িয়ে আছি, এটি ৩৬টি খালের মধ্যে যে ছয়টি খালের কাজ বাকি আছে তার মধ্যে একটি। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আমার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী দুইজন আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন সরজমিনে এসে দেখবার, জন্য আমি এসে দেখলাম।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আরেকটি কথা আমি চট্টগ্রাম নগরবাসীর উদ্দেশ্যে বলতে চাই। একটি সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট কাজ করে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, যেটি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সিটি কর্পোরেশন যেটি আমাদের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ওয়াসা কাজ করে যেটি আমাদের অধীনে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু খাল রয়েছে। এখন মানুষ সাধারণ মানুষ চিনে একটা ব্যক্তিকে, মেয়র। এখন জলাবদ্ধতা হলে মেয়র, ওয়াসার কোনো প্রবলেম হলে মেয়র, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমস্যা এটার জন্যও দায়ী মেয়র।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আসলে এই যে ঘটনা যেটুকু ঘটেছে, সামান্য একটু কষ্ট যেটুকু মানুষ পেয়েছে এটার জন্য কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কিন্তু আমি তাদেরকেও দায়ী করতে চায় না। তারা মনে করেছিল, ১৫ মে–এর মধ্যে অপসরণ করলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যেহেতু হয়নি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ছোট্ট একটি ঘটনার জন্যে, উনার অনেক বড় মহানুভবতা এবং জনগণের প্রতি দরদ থেকে উনি মহান সংসদে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এরপরে আমি একজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আমার আর বলার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।
তিনি বলেন, আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এটুকু বলতে চাই আমি এখনই সিটি কর্পোরেশনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে মিটিং করব। আগামী দিনগুলোতে এবং বর্ষা মৌসুমে যাতে জলাবদ্ধতা না হয়, চট্টগ্রাম নগরবাসী যাতে স্বস্তিতে বসবাস করতে পারে এ ব্যাপারে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিব। এসময় সিটি গর্ভমেন্ট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মীর শাহে আলম বলেন, সিটি গর্ভমেন্ট–এর দাবি নতুন নয়। এটা প্রায় ২০–৩০ বছরের দাবি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে ৭০ দিন হল। এটা নিয়ে আমরা গবেষণা করব, প্রয়োজনে টেকনিক্যাল ও বিশেষজ্ঞ কমিটি করব। সবমিলিয়ে আমরা দেখব। সিটি গর্ভমেন্ট–এ যদি জনগণের মঙ্গল হয় তাহলে অবশ্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্রদক্ষেপ নেবেন।
তিনি বলেন, মেয়র কিন্তু আপনাদের জন্য দিনরাত কাজ করছেন, ভবিষ্যতেও করবেন। বিএনপি গণমানুষের রাজনৈতিক দল। বিএনপি অবশ্যই চাইবে মানুষের যেন ভোগান্তি ও কষ্ট না হয়।














