আওয়ামী লীগ আমলের আলোচিত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে বলেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ ই–মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানিয়েছে। দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে ধরতে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। সে কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই রেড নোটিশের ভিত্তিতেই বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বর্তমানে সেখানে আটক আছেন। আবুধাবির এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) জানিয়েছে, ইউএই ফেডারেল ল অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে। খবর বিডিনিউজের।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীরের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ২৬(২) ও ২৭ ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩–এর ১১ ধারায় মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম রয়েছে। বেনজীরকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া তুলে ধরে তিনি বলেন, এনসিবি ঢাকা ইন্টারপোল চ্যানেলের মাধ্যমে রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গ্রেপ্তারের পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত–সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করবে। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হবে। এনসিবি আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক অতি দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে।
এ ঘটনাকে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির সময় সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানাতে দেখা যায়। বিবৃতিতে সালাহউদ্দিন বলেন, এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর। তার আগে ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান।
আওয়ামী লীগ আমলের শেষ দিকে ২০২৪ সালের মার্চে ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ এবং ৩ এপ্রিল ‘বনের জমিতে বেনজীরের রিসোর্ট’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক কালের কণ্ঠ। সেখানে সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠে আসে। এরপর আলোচনা শুরু হয় তাকে নিয়ে।
সেই প্রেক্ষাপটে ওই বছর ২২ এপ্রিল বেনজীরের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয় হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ। একই দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন জানায়, বিষয়টি নিয়ে তারা অনুসন্ধান শুরু করেছে। পরে দুদকের আবেদনে বেনজীর, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেয় ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। তাদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে তাদের নামে থাকা শেয়ারও অবরুদ্ধ করার আদেশ আসে। এর মধ্যেই খবর আসে, বেনজীর তার স্ত্রী–কন্যাদের নিয়ে আগেই দেশত্যাগ করেছেন। পরে বেনজীর নিজেও বোট ক্লাবের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের জন্য দেওয়া চিঠিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশে থাকার কথা বলেন।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরো অনেকের মতো বেনজীরের বিরুদ্ধে তদন্ত গতি পায়। তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে এক ডজনের বেশি দুর্নীতির মামলা করে দুদক। এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুনে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়েও তদন্ত শুরু হয়। এত সব অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে ধরতে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়।
এরপর মে মাসে ১১ কোটির বেশি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেয় ঢাকার একটি আদালত। সেই মামলা বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।











