নিজ ঘরে মা-মেয়ে খুন

আনোয়ারায় ঘটনা, শিশু আহত মৃত্যুর আগে মা বললেন মুনির কথা, রেকর্ড স্থানীয়দের পুলিশের ধারণা, পাওনা টাকার, জেরে হত্যাকাণ্ড

আনোয়ারা প্রতিনিধি | সোমবার , ১৫ জুন, ২০২৬ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

আনোয়ারায় নিজ ঘরে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন মা ও মেয়ে। ঘটনার সময় আহত হয়েছেন ৫ বছরের শিশু এক। সে ওই মায়ের সন্তান। গত শনিবার রাত ১১টার দিকে উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি বড়ুয়াপাড়ায় নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন সুজন বড়ুয়ার স্ত্রী এনি বড়ুয়া (৩৬) ও মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। প্রিয়ন্তী মাহাতা পাঠনিকোটা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। আহত অর্ক বড়ুয়া এনি বড়ুয়ার ছেলে। ৯৯৯এ ফোন পেয়ে পুলিশ রাতে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে। পুলিশের ধারণা, পাওনা টাকার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। গতকাল দুপুর ২টায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতের স্বজনদের সাথে কথা বলেন। এ সময় নিহত প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার বাড়ির উঠানে বিদ্যালয়ের সহপাঠীরা হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেয়। পুলিশ সুপার শিক্ষার্থীদের সান্ত্বনা দিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার ও শাস্তির আওতায় আনার আশ্বাস দেন।

সরেজমিনে নিহতের পরিবার, স্থানীয় লোকজন এবং পুলিশের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিহত এনি বড়ুয়ার স্বামী সুজন বড়ুয়া চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি করেন। পরিবারে স্ত্রী ছাড়াও সুজনের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বড় মেয়ে প্রিয়া বড়ুয়া বিবাহিত, থাকেন শ্বশুরবাড়ি। বাড়িতে থাকেন স্ত্রী এনি বড়ুয়া, মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া ও পাঁচ বছরের শিশুপুত্র অর্ক বড়ুয়া। প্রিয়ন্তী মাহাতা পাঠনিকোটা উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণীতে পড়ে। শনিবার রাতে খাওয়া শেষ করে দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে এনি বড়ুয়া ঘুমাতে যান। রাত ১১টার দিকে এক ব্যক্তি (স্বামীর চাচাতো ভাই সম্পর্ক) রান্নাঘর দিয়ে প্রবেশ করে প্রথমে মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়াকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। মেয়েকে বাঁচাতে গেলে ওই ব্যক্তি এনি বড়ুয়ার শরীরের একাধিক স্থানে ছুরিকাঘাত করে। এ সময় তাদের আত্মচিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে ঘাতক পালিয়ে যায়। প্রতিবেশীরা এসে দেখেন, এনি বড়ুয়া রক্তাক্ত অবস্থায় ঘরের দরজায় পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। মেয়ে প্রিয়ন্তীর রক্তাক্ত দেহ রান্নাঘরে পড়ে আছে। তখন স্থানীয়রা ৯৯৯এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। এর আগে লোকজন এনি বড়ুয়ার মৃত্যুর আগমুহূর্তের একটি ভিডিওচিত্র ধারণ করেন, সেখানে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করা এনি বড়ুয়া ঘাতক হিসেবে প্রতিবেশী তেজপ্রিয়র নাম বলেন। তেজপ্রিয় সম্পর্কে সুজন বড়ুয়ার চাচাতো ভাই। সিএনজি টেক্সি কিনতে তিনি সুজন বড়ুয়ার কাছ থেকে দেড় লক্ষাধিক টাকা ধার নিয়েছিলেন। উক্ত টাকার জন্য এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ৫ বছরের শিশু অর্ক বড়ুয়া মাথায় আঘাত পায়। এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে আনোয়ারা হাসপাতালে নিয়ে যায়।

খবর পেয়ে স্বামী সুজন বড়ুয়া বাড়িতে ছুটে আসেন। ততক্ষণে স্ত্রী ও মেয়ে চিরতরে বিদায় নিয়েছে। নিহত প্রিয়ন্তীকে এক নজর দেখতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীরাও বাড়িতে ভিড় করেন। কিন্তু দেখার সুযোগ হয়নি। তখনো মৃতদেহের ময়নাতদন্ত শেষ হয়নি। এ সময় নিহতদের স্বজন ও সহপাঠীদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ গতকাল সন্ধ্যায় বাড়িতে আনা যায়। রাতেই স্বজনেরা চোখের জলে মামেয়ের শেষকৃত্য শেষ করেন।

ঘটনার শিকার শিশু অর্ক : এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী পাঁচ বছরের শিশু অর্ক। তার চোখের সামনে ঘাতক একের পর এক ছুরিকাঘাত করে মা ও বোনকে হত্যা করেছে। ঘটনার পর থেকে কাঁদতে কাঁদতে সে এখন অনেকটা বোবা। ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিল। মোবাইল ফোনে মা ও বোনের ছবি দেখছিল।

ঘটনার বিষয়ে প্রতিবেশী সুরভী বড়ুয়া (৪০) বলেন, রাতে নিহতদের চিৎকার শুনে আমরা ঘর থেকে বের হয়ে দেখি, ঘরের দরজায় এনি বড়ুয়া এবং তার ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার নিথর দেহ ঘরের ভেতর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল। ঘটনা দেখে বাড়ির লোকজন পুলিশে খবর দেয়। এ সময় নিহত এনি বড়ুয়া ঘটনার বিষয়ে একজনের নাম বলে। তার কথা মোবাইলে ধারণ করা হয়।

নিহত এনি বড়ুয়ার স্বামী সুজন বড়ুয়া বলেন, আমি শহরে ছিলাম। রাতে বড় ভাইয়ের ফোন পেয়ে বাড়িতে ছুটে আসি। ততক্ষণে আমার স্ত্রীকন্যা দুজনেই শেষ। আমি তাদের সঙ্গে শেষ কথাটাও বলতে পারিনি। তিনি জানান, প্রতিবেশী তেজপ্রিয় সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই। বিপদের দিনে সিএনজি টেঙি কেনার জন্য দেড় লক্ষ টাকার বেশি ধার দিয়েছিলেন। সেই তেজপ্রিয় তার স্ত্রীকন্যাকে এভাবে খুন করবে, এটা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী মৃত্যুর আগে জানিয়ে গেছে এ হত্যাকাণ্ড তেজপ্রিয় ঘটিয়েছে। বাড়ির সব লোক সাক্ষী রয়েছে। আমি হত্যাকারীর গ্রেপ্তার ও ফাঁসি চাই।

মাহাতা পাঠনিকোটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস ছবুর বলেন, এই ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। প্রিয়ন্তী বড়ুয়া আমার বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী। ভদ্র স্বভাবের মেয়ে, সহজে সহপাঠীদের সাথে মিশে যেত। গত বৃহস্পতিবারও সে বিদ্যালয়ে এসেছিল। সকালে বিদ্যালয়ে এসে জানতে পারি প্রিয়ন্তীসহ তার মাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা ঘাতকের বিচার চাই।

উম্মে হাবিবাসহ প্রিয়ন্তীর একাধিক সহপাঠী কাঁদতে কাঁদতে বলল, বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ে প্রিয়ন্তীর সাথে আমরা খেলাধুলা করেছি। অনেক মজা করেছি। প্রিয়ন্তী নেই, এটা ভাবতেও পারি না। মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে এ রকম নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে?

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, শনিবার রাতে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মামেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করে। এই ঘটনায় হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ঘাতককে ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, পাওনা টাকার জেরে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে।

ঘটনাস্থল পরির্শনকালে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম সাংবাদিকদের জানান, নিহতদের ঘাতক এদের পরিচিত। সুজনের পরিবার সম্পর্কে ঘাতক সবকিছু অবগত ছিল। শনিবার রাত ১১টার দিকে ঘাতক ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায়। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা ঘাতককে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পারব। প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।

এ সময় এসপি নিহতের স্বামী, এলাকাবাসী, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আহত শিশু অর্কের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি ঘাতকের গ্রেপ্তারে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরিটেইনিং ওয়ালসহ ধসে গেল সড়কটির ১শ ফুট