হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পে বাঁশবাগান

আজ বিশ্ব হাতি দিবস

প্রান্ত রনি, রাঙামাটি | বুধবার , ১২ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ

পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী হাতি। নানা সংকটের মধ্যেও পার্বত্য চট্টগ্রামে টিকে আছে এশিয়ান বুনো হাতি। আজ বুধবার বিশ্ব হাতি দিবস। এদিকে হাতির করিডোরে স্থাপনা নির্মাণ, সড়ক তৈরি, আবাসস্থল ও উপযোগী খাদ্যের সংকটে ঝুঁকিতে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের হাতি। সামপ্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বিচরণ করা হাতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বাঁশবাগান সৃজন এবং হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে হাতিমানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে কাজ করছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বন বিভাগ। এছাড়া হাতির গোসলের জন্য জলাধার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, বুনো হাতির সুরক্ষায় বড় সংকট হলো হাতির করিডোরে বসতি স্থাপন ও সংরক্ষিত বনের মধ্যে খণ্ডতা (সড়ক তৈরি)। বনের মধ্যে বসতি বা স্থাপনা নির্মাণের কারণে হাতির পাল চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়। এতে বিভিন্ন সময়ে মানুষ হাতির মুখোমুখি হয়ে হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে সংরক্ষিত বনের মধ্য দিয়ে সড়ক তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে যানবাহনের সঙ্গে হাতির সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটির হাতি অধ্যুষিত তিনটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচ হেক্টর জমিতে বাঁশবাগান তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের (ইআরটি) সদস্যদের সম্মানি, ইউনিফর্ম ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া হাতির গোসলের জন্য পানির জলাধার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে বন বিভাগের।

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫২৬ অর্থবছর পর্যন্ত দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন কাপ্তাই উপজেলায় বুনো হাতির আক্রমণে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ওই এলাকায় কোনো হাতি মারা যায়নি। ক্ষতিপূরণ বিধিমালা অনুযায়ী, নিহত চারজনের পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে মোট ১২ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বন বিভাগ। একই সময়ে ১০ জনের ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে এবং অনেকে আহত হয়েছেন। আহতদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ লাখ ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯২০ অর্থবছর থেকে ২০২৪২৫ অর্থবছর পর্যন্ত উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন রাঙামাটির লংগদু ও বরকল উপজেলায় বুনো হাতির আক্রমণে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বরকলে দুটি হাতিশাবক এবং ২০২৬ সালে লংগদুতে একটি মা হাতির মৃত্যু হয়েছে। উত্তর বন বিভাগ নিহত নয়জনের পরিবারকে ১৯ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত লংগদু ও বরকল উপজেলায় বুনো হাতির কারণে ২০৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের অনেকে আহত হয়েছেন। কারও কারও ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এসএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বন বিভাগ হাতিমানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। আগে স্থানীয় লোকজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সহায়তা করতেন। বর্তমানে দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় তিনটি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে। তারা বুনো হাতির দেখভাল করেন। হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ইআরটি সদস্যদের প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে সম্মানি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় তাদের ইউনিফর্ম ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হবে। বুনো হাতির খাদ্যের জন্য পাঁচ হেক্টর জমিতে বাঁশবাগান করা হয়েছে।

এসএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আগে হাতির আক্রমণে নিহত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কম ছিল। এখন তা ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। হাতির আক্রমণে গুরুতর আহতদের ১ লাখ টাকা এবং বসতঘর ও ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে উপজেলা কমিটি ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দেয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ডিএফও রফিকুজ্জামান শাহ বলেন, হাতি তার নির্দিষ্ট করিডোর দিয়ে চলাফেরা করে। এ কারণে স্থানীয় মানুষের জানমালের কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প ও অন্যান্য বরাদ্দ থেকে হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ বাবদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, হাতিকে উত্ত্যক্ত করা যাবে না। হাতির চলাচলের পথে বাধা দেওয়া ও খাদ্যাভ্যাস নষ্ট করা যাবে না। বন্য হাতির সুরক্ষায় রাঙামাটির লংগদু ও বরকল উপজেলার হাতি অধ্যুষিত এলাকায় তিনটি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি) গঠন করা হয়েছে। তারা বন্য হাতির দেখভাল করেন। স্থানীয় জনসাধারণকে সচেতন করতে প্রচারণামূলক বিভিন্ন কর্মসূচিও চলমান রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবৃষ্টির পানির স্রোতে ঝুঁকিপূর্ণ খাদ
পরবর্তী নিবন্ধপ্রথম দিনে বেশি এসেছে চাপিলা ও কাঁচকি, ঘাটে ফিরেছে ব্যস্ততা