৫৬ দিনের মাথায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সদ্য সাবেক উপাচার্যকে কেন অপসারণ করা হলো–এই প্রশ্ন সামনে রেখে এবার অভিনব কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। প্ল্যাকার্ডে ‘৫৬’ সংখ্যাটি লিখে তারা বের করেছেন ‘প্রশ্নযাত্রা’ নামে বিক্ষোভ মিছিল। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে চুয়েটে গতকাল সপ্তম দিনের মতো শাটডাউন ও ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। একই দাবিতে এদিন একজোট হয়ে কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা–কর্মচারীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, এদিন বেলা ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ‘প্রশ্নযাত্রা’ শিরোনামে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্বাধীনতা চত্বর ঘুরে শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়। এরপর সেখানে সমাবেশ ও ব্যঙ্গাত্মক পথনাটক প্রদর্শিত হয়, যেখানে নতুন উপাচার্যের অনলাইনে যোগদানের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়। এর আগে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনের সামনে শিক্ষক, কর্মকর্তা–কর্মচারী সমিতির উদ্যোগে অবস্থান কর্মসূচি ও কর্মবিরতি পালিত হয়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম তার মাত্র ৫৬ দিনের কার্যকালে আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন অফিস স্থাপন, রিসার্চ হাব ও ইন্ডাস্ট্রি–একাডেমিয়া সংযোগসহ বহুমুখী প্রগতিশীল পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু এত অল্প সময়ের মধ্যে হঠাৎ তাকে কেন অপসারণ করা হলো, সেই প্রশ্নটিই তারা প্রতিটি প্ল্যাকার্ডে প্রশ্নবোধক চিহ্নসহ তুলে ধরেছেন।
পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিবুর রহমান বলেন, আমরা আজকের কর্মসূচিতে একটাই প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করেছি। প্রতিটি প্ল্যাকার্ডে ৫৬–এর পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা জানতে চেয়েছি, ৫৬ দিনে কেন অধ্যাপক সায়েমকে অপসারণ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থী নাফিসা রিদিতা বলেন, আমরা একটা দাবি নিয়ে আন্দোলন করছি। আমরা সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল চাই। এ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।
গতকাল বিকাল ৪টায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হিশাম, মৌমিতা দত্ত প্রিয়া ও রাতুল হাসান। বর্তমান পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানে তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
লিখিত বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। বর্তমান সরকার চুয়েটের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ ও সম্মিলিত মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে বলে প্রত্যাশা করছি। চুয়েট পরিবারের উদ্বেগ, দেশ–বিদেশের অ্যালামনাইদের সংহতি, আন্তর্জাতিক একাডেমিক মহলের সমর্থন ও অধ্যাপক সায়েম স্যারের গৃহীত শিক্ষা ও গবেষণামুখী উদ্যোগগুলো বিবেচনায় নিয়ে চলমান পরিস্থিতি পুনর্বিবেচনা করা হবে–এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
শিক্ষক সমিতির পক্ষে সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ মাসরুর আহম্মদ বলেন, আমাদের দাবি একটাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা ধারণ করা। এখানে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত চাওয়া–পাওয়া নেই। একটা অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় আমরা মানসিকভাবে চাপে রয়েছি, শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে যাচ্ছে। সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছি না। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, বর্তমান সরকারের মিশন ও ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের এ চলমান সমস্যার সমাধান করুন। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ক্ষতি রক্ষা করুন।
কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রিয়তোষ চক্রবর্তী বলেন, আমাদের দাবি একটাই, ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক সায়েম স্যারকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বাতিল করতে হবে। সম্মানিত শিক্ষকদের দাবির সঙ্গে আমরা একাত্মতা প্রকাশ করছি। যতক্ষণ পর্যন্ত সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল না করা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের কর্মবিরতি চালিয়ে যাব।
এদিকে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের কাজের প্রশংসা করে এবং তার পুনর্বহাল চেয়ে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও নরওয়ের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন অধ্যাপক লিখিত সমর্থন জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন উটাহ ইউনিভার্সিটির মো. আবদুস সালাম সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে অধ্যাপক সায়েমকে রাজনীতি–নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষক হিসেবে উল্লেখ করে তার পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত থেকে ইমেইলের মাধ্যমে যোগদান করলে শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। ধারাবাহিক কর্মসূচি কারণে গতকালও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ক্লাস ও পরীক্ষা হয়নি।











