আজ আমি যাঁর সম্পর্কে এ লিখাটি লিখছি, তিনি আমার শ্রদ্ধেয় পিতা মরহুম কাজী হাকিম দাদ চৌধুরী। ক্ষণজন্মা অথচ একনিষ্ঠ, স্বাধীনচেতা, সৎ ও তেজস্বী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্ম হাটহাজারীতে ১৯২৪ সালে। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমনের অনেক পূর্ব থেকেই এতদঞ্চলের মানুষগুলো তৎকালীন রাজা, বাদশা প্রদত্ত পেশাভিত্তিক উপাধি দিয়ে নিজেরা পরিচিতি লাভ করত। সেই ধারাবাহিকতা এবং উত্তরাধিকার এখনো এদেশের মানুষগুলো বয়ে চলছে। যে সমস্ত দেশগুলোতে মুসলমানদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল সে সকল দেশের শাসনকার্যের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জনগণের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অঞ্চলভিত্তিক বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, বিশেষ করে মোগল আমলে যারা সরাসরি বিচারকার্যের সাথে জড়িত ছিলেন তাদেরকে কাজী হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। কাজী হিসেবে যারা নিয়োগ লাভ করতেন, ন্যায় বিচারের জন্য তাঁদের সমাজের প্রত্যেক শ্রেণি–পেশার মানুষ সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন। সেই সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান কাজী হাকিম দাদ চৌধুরী লেখাপড়া শেষ করে শুরু করেন ব্যবসা। হালাল উপার্জনের ভাবনা থেকে তিনি বিশিষ্ট জ্ঞানী পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তিনি মাত্র ২৮বছর বয়সে ১৯৫২ সালে মিল্কভিটা ও ডেইরি ফার্মের একজন উদ্যোক্তা হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৫৪ সালে প্লান্টার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের কার্যনির্বাহী পরিচালক, ১৯৭৫ থেকে গ্লাডস্টোন ওয়াইলি অ্যান্ড কোম্পানির পরিচালক ও ১৯৯৫ সাল থেকে এর চেয়ারম্যান, ১৯৭৫–১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশীয় চা সংসদের ৬ দফা চেয়ারম্যান, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং খুলশীর ১৯৮৫–৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট ও চার্টার্ড সদস্য হিসাবে অগণিত সেবা ও চিকিৎসা কার্যμম পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৮২ সালে কাটিরহাট মহিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের সেμেটারি, ১৯৯৫ সাল থেকে কাটিরহাট মহিলা কলেজের উপদেষ্টা, তিনি স্বাধীনতার পরবর্তীকালে কাটিরহাট মফিদুল ইসলাম সিনিয়র মাদ্রাসার দুইবার সভাপতি ছিলেন। যাঁরা উনাকে চিনেন তাঁরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, এতগুলো গুরুত্বপর্ণ পদে আসীন থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একান্তই নিরহংকার ও সজ্জন ব্যক্তি। পদবি ও অর্থ তাঁর কাছে মুখ্য বিষয় ছিল না। অত্যন্ত প্রাঞ্জল, হাস্যোৎফুল্ল ছিলেন তিনি। ছিলেন সপ্রতিভ। অতিথিপরায়ণতা ছিল তাঁর চরিত্রের এক মহান বৈশিষ্ট্য। কারণ নিজেকে সবার মাঝে বিলিয়ে দেবার প্রজ্ঞায় তিনি ছিলেন অকৃপণ। তিনি ভালোবাসতেন তাঁর চারপাশের মানুষকে। তিনি ছিলেন রাজনীতি সচেতন একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সমাজের সর্বস্তরের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের সাথে তাঁর ছিল নিবিড় সম্পর্ক। তিনি চট্টগ্রাম ক্লাব লিমিটেড–এর একজন সিনিয়র সদস্যও ছিলেন। এছাড়াও তিনি কী গ্রাম, কী শহর, যেখানে অবস্থান করেছেন সেখানেই সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দাতব্য চিকিৎসালয়সহ বহু প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে সমাজসেবায় মনোনিবেশ করেছেন। তিনি ছিলেন সময়সচেতন কর্মপাগল মানুষ। তাই ঠিক সময়ে যথার্থ কাজটি করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কাজের প্রতি ছিল তাঁর একাগ্রতা। তিনি নিজের কাজকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা পবিত্র দায়িত্ব মনে করতেন। তিনি বলতেন, মানুষের জন্ম শুধু আয় করে খাওয়া ও পরিবার নিয়ে বসবাস করার জন্য নয়– একজন মানুষের এ সমাজকে অনেক কিছু দেয়ার আছে। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের বিশ্লেষণে আমরা উপলব্ধি করেছি তিনি যেন আসলেন, দেখলেন, জয় করলেন।
বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময় জীবনের চলার পথে গড়ে তুলেছেন মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক। বিভিন্ন পেশার মানুষকে নির্মল সঙ্গদান, দুস্থ ও মানবতার কল্যাণে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজের প্রতিটি মানুষের বিষয়কে আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে এর সমাধানে এগিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর মহান ব্রত। তিনি ছিলেন নিবিষ্ট ধার্মিক এবং সুফিবাদ ও মাইজভাণ্ডারী ত্বরীকা লালন করতেন। ২০০১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রায় ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। আমি আল্লাহর দরবারে তাঁর সৎকর্মের প্রতিদান কামনা করছি।
লেখক: মরহুমের জ্যেষ্ঠপুত্র ও সাবেক সভাপতি,
চট্টগ্রাম কর আইনজীবী সমিতি।











