চট্টগ্রাম নগরীতে বইপ্রেমীদের জন্য এক আনন্দঘন আয়োজন হিসেবে শেষ হলো হয়েছে ‘স্বাধীনতা বইমেলা ২০২৬’। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠে আয়োজিত স্বাধীনতা বইমেলা পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের মিলনমেলায় জমে উঠেছিল। মেলা উদ্বোধন করেন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। উদ্বোধনী দিন থেকে মেলায় ছিল দর্শনার্থীদের উপস্থিতি, যা শেষ দিন পর্যন্ত আরও বাড়ে। বইমেলাকে ঘিরে নগরজুড়ে তৈরি হয় এক ধরনের সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাস–বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে নতুন করে জাগিয়ে তোলার এক প্রাণবন্ত প্রয়াস ছিল যেন এই বইমেলা।
মেলার আয়োজন ও পরিসর : প্রায় ৪০ হাজার বর্গফুটের বিশাল জায়গায় সাজানো হয়েছিল মেলার অবকাঠামো। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার ১২৯টির বেশি স্টল এখানে অংশগ্রহণ করেছে। প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা ছিল। ছুটির দিনে সকাল ১০টা থেকে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল মেলার দরজা।
প্রতিটি স্টলে নতুন বইয়ের সম্ভার, লেখকদের উপস্থিতি এবং পাঠকদের ভিড়–সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ বিরাজ করেছে। শিশু–কিশোর সাহিত্য থেকে শুরু করে গবেষণামূলক গ্রন্থ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ–সব ধরনের বইয়ের সমাহার ঘটেছে এই মেলায়।
বই ও সংস্কৃতির সম্মিলন : বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা। সন্ধ্যা নামলেই মঞ্চে শুরু হয় কবিতা আবৃত্তি, গান, নাট্যাংশ ও সাহিত্য আলোচনা। তরুণ লেখক থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকরা এখানে অংশ নেন, যা মেলাকে শুধু বই কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং একে রূপ দিয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক উৎসবে।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তরুণ পাঠকরা বই হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, প্রিয় লেখকের সঙ্গে কথা বলছেন, স্বাক্ষর নিচ্ছেন–এ এক অন্যরকম আনন্দের অভিজ্ঞতা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বই : ‘স্বাধীনতা বইমেলা’ নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর মূল দর্শন। এই মেলার অন্যতম লক্ষ্য হলো নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পৌঁছে দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের বিশেষ সংগ্রহ এখানে রাখা হয়েছে, যাতে পাঠকরা দেশের ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে বইয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এই প্রয়াস সত্যিই প্রশংসনীয়। এতে শুধু জ্ঞানার্জন নয়, দেশপ্রেম ও মূল্যবোধের বিকাশও ঘটছে।
পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার প্রয়াস : বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির প্রভাবের কারণে বই পড়ার অভ্যাস কিছুটা কমে যাচ্ছে–এমন ধারণা অনেকের। তবে এই বইমেলা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এখনো অটুট রয়েছে। বিশেষ করে অভিভাবকদের সঙ্গে শিশুদের উপস্থিতি ছিল আশাব্যঞ্জক। ছোটবেলা থেকে বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হলে তা ভবিষ্যতে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ : ঢাকা ও চট্টগ্রামের শতাধিক প্রকাশনা সংস্থা এই মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। নতুন বই প্রকাশ, বিশেষ ছাড় এবং পাঠকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ–সব মিলিয়ে প্রকাশকদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। অনেক প্রকাশনা সংস্থা মেলাকে কেন্দ্র করে নতুন বই প্রকাশ করেছে, যা পাঠকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। লেখক–পাঠক সরাসরি যোগাযোগের সুযোগও এই মেলার একটি বড় অর্জন।
নগর জীবনে মেলার প্রভাব : চট্টগ্রামের ব্যস্ত নগর জীবনে এই বইমেলা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। কর্মব্যস্ত দিনের শেষে মানুষ বইয়ের জগতে ডুবে যাওয়ার সুযোগ পান। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের নিয়ে মেলায় ঘুরে বেড়ানো অনেকেরই দৈনন্দিন আনন্দের অংশ হয়ে উঠেছিল। এই ধরনের আয়োজন শুধু বিনোদন দেয় না, বরং মানুষের মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বইমেলা তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
স্বাধীনতা বইমেলা নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন। এটি বইপ্রেমীদের জন্য যেমন এক উৎসব, তেমনি নতুন প্রজন্মের জন্য একটি শিক্ষণীয় প্ল্যাটফর্ম। বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে। বইয়ের সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কই পারে একটি সচেতন, জ্ঞানসমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে। সেই পথচলায় এই বইমেলা নিঃসন্দেহে একটি উজ্জ্বল ভূমিকা রাখবে।














