দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কার্যক্রম থেকেও তাদের বিরত থাকার নির্দেশ দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের একক প্রার্থী বাছাইয়ের বার্তা দেন। পাশাপাশি দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থেকে কাজ করতে বলেছেন নেতাকর্মীদের। এছাড়া নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকারও পরামর্শ দেন।
গতকাল রোববার রাত ৯টার দিকে নগরের হোটেল রেডিসন ব্লুতে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সাংগঠনিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় উপস্থিত একাধিক নেতাকর্মী আজাদীকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী সভায় চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের প্রায় ৭০০ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। দলের চেয়ারম্যান হওয়ার পর এ প্রথম চট্টগ্রামের এত সংখ্যক নেতাকর্মীর সঙ্গে সভা করলেন তারেক রহমান।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যা থেকে রেডিসন ব্লুর সামনে শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ সড়কে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে জমায়েত হতে থাকেন নেতাকর্মীরা। তারা বিভিন্ন স্লোগানে মুখর করে তোলেন পুরো এলাকা। বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষকে দেখা গেছে সেখানে। তারা এসেছেন তারেক রহমানকে এক নজর দেখতে। রাত ৮টার দিকে মানুষের ভিড় এড়িয়ে ধীরে ধীরে তারেক রহমানকে বহনকারী ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সম্বলিত লাল–সবুজ রঙের বুলেট প্রুফ বাস এসে পৌঁছায় রেডিসনের সামনে। এ সময় সেখানে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
সভায় উপস্থিত একাধিক নেতাকর্মী আজাদীকে জানিয়েছেন, গত ১৭ বছর ধরে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে থেকে যে আন্দোলন–সংগ্রাম করেছেন তার ফলেই দেশে গণতন্ত্র এসেছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিএনপি আন্দোলন করেছে। কিন্তু এখন অনেকে অনেক কথা বলে। কেউ সংস্কারের কথা বলেন, আন্দোলনের কথা বলেন। তবে একটি কথা খোলাখুলি বলে দিতে চাই, আমার নেতাকর্মীরা ১৭ বছর আন্দোলন ধরে না রাখত তাহলে দেশের মানুষ দেখতে পেত না এই দেশ কত বড় একটি ফ্যাসিবাদীদের দখলে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত নেতাকর্মীদের ‘বিএনপি পরিবারের সদস্য’ অবহিত করে বলেন, এ পরিবারের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, একটি পরিবার ভালো কি খারাপ তা নির্ভর করবে পরিবারের মানুষগুলোর আচার–আচরণ ও ব্যবহারের উপরের। পরিবারের মা–বাবা, ছেলে–মেয়ে যারা আছেন তারা একে অপরের সাথে কেমন আচরণ করছে তার উপর। এখন এই পরিবারের (বিএনপি) মানুষগুলো ভালো কি খারাপ, আচার–ব্যবহার কেমন তা সাধারণ মানুষ কাদের দেখে বোঝে? এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা বলেন, ‘আমাদেরকে দেখে’। তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঠিক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেহেতু আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, সেহেতু আমাদেরকে গণতান্ত্রিক প্র্যাকটিসগুলো আনতে হবে। তার প্রেক্ষিতে যে নির্বাচনগুলো অর্থাৎ লোকাল নির্বাচন বলতে আমরা যা বুঝি, সেই নির্বাচনগুলো কিন্তু আমাদের ফেস করতে হবে। এখন সেই নির্বাচনগুলো যদি আমাদের ফেস করতে হয়, তাহলে আমাদেরকে কিন্তু ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, কোনো একটা ওয়ার্র্ডে মেম্বারের জন্য হোক, একটা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের জন্য হোক, অনেকেই আছেন, তাই না? ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে হোক, পৌরসভা চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে হোক, স্থানীয় আমাদের দলীয় পদপ্রার্থী আছেন। আপনারা যারা এখানে আছেন আপনাদের একেকটা পদ আছে। মানে আপনারা একেকজন লিডার। নেতার কিছু দায়িত্ব আছে। কী? নেতার দায়িত্ব হচ্ছে দলকে পরিচালনা করা। আজকে আমি এখানে আপনাদের নির্দেশ দিতে চাই, নিজেদের মধ্যে আলাপ–আলোচনা করতে হবে কীভাবে আপনারা আগামী লোকাল নির্বাচন ফেস করবেন। আমাদের দুই–একজন প্রার্থী থাকতেই পারে, বড় দলে একাধিক প্রার্থী থাকতেই পারে। সেখান থেকে আমাদেরকে যোগ্য ব্যক্তিটাকে চিহ্নিত করে দিতে হবে।
তিনি বলেন, আপনারা একজনকে হয়তো বলতে পারেন, তুমিও দল থেকে দাঁড়াও। আরেকজনকে আপনারা দলের একটা সাংগঠনিক পদে নিয়ে আসতে পারেন। এভাবে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে প্রত্যেককে আপনাদের সুযোগ করে দিতে হবে।
সাংগঠনিক সভায় কী বার্তা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে সভায় উপস্থিত বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার আজাদীকে বলেন, সরকার গঠনের পর থেকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড চালুসহ সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে তা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া আগামীতে বিরোধী দল যদি সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন। দলের কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন।
সাংগঠনিক সভায় কী বার্তা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘জনগণকে আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি সেটা পূরণ করতে হবে। এই ওয়াদা যদি আমাদেরকে পূরণ করতে হয়, তাহলে আমাদেরকে সুশৃঙ্খল থাকতে হবে। জনগণের কাছে আমাদেরকে যেতে হবে। আমরা যে কাজগুলো করেছি, জনগণের কাছে সেটা তুলে ধরতে হবে। আপনারা (দলীয় নেতাকর্মী) যদি সুশৃঙ্খল থাকেন, ঐক্যবদ্ধ থাকেন, তাহলে আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আমাদের পথটা অনেক সহজ হবে’।
নাজিমুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গেও বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সেই নির্বাচনে বিএনপির অনেকগুলো যোগ্য প্রার্থী আছে। কিন্তু দল একজনকে মনোনয়ন দেবে। সেক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রেখে দল যাকে সিদ্ধান্ত দিবে তাকেই মেনে নিতে হবে সবাইকে’।
সভায় উপস্থিত দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফৌজুল কবির ফজলু আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন। দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন তা তৃণমূলে পৌঁছে দেব।
সভা সূত্রে জানা গেছে, সোয়া ৮টার দিকে সভাকক্ষে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় নেতাকর্মীরা তাকে শুভেচ্ছা জানান। সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য রাখেন। সভামঞ্চে ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার, লায়ন আসলাম চৌধুরী ও এস এম ফজলুল হক, সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সরওয়ার জামাল নিজাম এমপি, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবের রহমান শামীম, সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও হারুন অর রশিদ, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া ও সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন। সভাপতিত্ব করেন নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এমপি। সঞ্চালনা করেন নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান।












