সাগরে কমছে লাক্ষাসহ সুস্বাদু অনেক মাছ

দূষণ ও অতি শিকারকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা

কক্সবাজার প্রতিনিধি | সোমবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গোপসাগরে গত এক দশকে ইলিশ বাড়লেও সংখ্যায়, আকারে ও বৈচিত্র্যে কমছে অন্য জাতের মাছ। ইতোমধ্যে লাক্ষ্যা, মাইট্টা, তাইল্যা, কালোচান্দা, মাথা ঘুইজ্জা ও বাংলা মাছসহ সুস্বাদু অনেক জাতের মাছ একেবারেই কমে গেছে। এমনকি, গত কয়েক বছরে সাগরে এসব মাছ জ্যামিতিক হারে কমছে বলে মনে করছেন জেলেরা। আশঙ্কাজনক হারে মাছ কমে যাওয়ার ঘটনায় দূষণ ও ওভার ফিশিং বা অতি শিকারকেই দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা।
কক্সবাজার শহরের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ফিশারিঘাটে ২৭ বছরের বেশি সময় ধরে মৎস্য ব্যবসা পরিচালনা করা জুলফিকার আলী জানান, সাম্প্রতিককালে বঙ্গোপসাগরে লাক্ষ্যা, মাথাঘুইজ্জা বা রিটা, জাতিমাইট্টা বা টোনা ফিশ, ঘোড়া চান্দা বা ব্ল্যাক পমফ্রেট, সাগর পাঙ্গাস বা বাংলা মাছ এবং তাইল্যা ও কয়েক জাতের পোয়া মাছ কম ধরা পড়ছে। যেগুলো ধরা পড়ছে সেগুলো আকারে তত বড় নয়। এছাড়া ঘোড়া মাছসহ কয়েক জাতের মাছ দেখা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, আগে সাগরে ২০/২২ কেজি ওজনের লাক্ষ্যা, ১২-১৫ কেজি ওজনের মাথা ঘুইজ্জা, ৮-১০ কেজি ওজনের মাইট্টা, ৭-৮ কেজি ওজনের সাগর পাঙ্গাস ও ৫-৬ কেজি ওজনের তাইল্যা মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক বছরে এসব মাছ একদিকে সংখ্যায় কমেছে, অন্যদিকে কমেছে আকারে।
মৎস্য ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী জানান, ফিশারিঘাটে আগে যেখানে ১৫ থেকে ১৮ কেজি ওজনের দৈনিক ২শ পিসের বেশি লাক্ষা মাছ পাওয়া যেত, সেখানে এখন পাওয়া যায় মাত্র ৭/৮টি; তাও আকারে সর্বোচ্চ ৭/৮ কেজি ওজনের। কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানান, কক্সবাজারে বঙ্গোপসাগরে লাক্ষা, ঘুইজ্জা, তাইল্যা ও রূপচান্দা টাইপের বেশ কিছু মাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে; যার ফলে আগে যেখানে এসব মাছ ধরার জন্য কয়েকশ বড়শি বোট ছিল, সেখানে এখন আছে মাত্র ২০/২৫টি। চার দশক আগের জরিপ অনুযায়ী, আমাদের সামুদ্রিক এলাকায় বা বঙ্গোপসাগরে ছিল ৪৭০ প্রজাতির মাছ। এর মধ্যে ৩৬ প্রজাতির সামুদ্রিক চিংড়ি, ৩ প্রজাতির লবস্টার, ২৫ প্রজাতির কাছিম ও ১১ প্রজাতির কাঁকড়াও রয়েছে। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে ইলিশ, রূপচান্দা, টেকচান্দা, ফলি চান্দা, ঘোড়া চান্দা, চান মাছ, কামিলা, চামিলা, নাইল্লা, অলুয়া, ফাইস্যা, তেইল্যা ফাইস্যা, চইক্কা ফাইস্যা, পাতা মাছ, কোরাল, নাককোরাল, দাড়কোরাল, লাক্ষ্যা, সুরমা, রকেট মাইট্টা, বোম মাইট্টা, জাতি মাইট্টা, ঠুইট্টা, ঘুইজ্জা, মাথা ঘুইজ্জা, কেলা ঘুইজ্জা, কাওয়ালি ঘুইজ্জা, নাথু ঘুইজ্জা, পিয়া ঘুইজ্জা, ছাতা ঘুইজ্জা, মোচ ঘুইজ্জা, হাগুরা ঘুইজ্জা, পোপা, কালা পোয়া, সোনালি পোয়া, বাঁশ পোয়া, তিল্পিপ পোয়া, রম্বু পোয়া, লইজ্জা পোয়া, ঠেঁড়ি পোয়া, রাঙ্গাচঁইসহ (রাঙ্গাচোখা) কয়েক প্রজাতির সুস্বাদু মাছই বেশি পাওয়া যায়। বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত মাছের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই ইলিশ।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিন অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাংলাদেশ জলসীমায় ৩৪৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪৯৮ প্রজাতির ঝিনুক, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া, ২২০ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল ও ৬১ প্রজাতির সি-গ্রাস চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রফেসর, বিশিষ্ট সমুদ্র বিজ্ঞানী ড. সাইদুর রহমান চৌধুরীর মতে, লাক্ষ্যা, মাইট্টা, তাইল্যা, রূপচান্দা ও পোয়া টাইপের বিশেষ করে দামী এবং বড় আকৃতির মাছ এখন খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ও মূল্যবান এসব মাছ মারাত্মকভাবে আহরিত হয়ে প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বাজার পর্যবেক্ষণ থেকেই আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই, ধারাবাহিকভাবে বছরের পর বছর ধরে বেশ কিছু মাছের ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি। এটা নির্দেশ করে, সমুদ্রে তাদের পরিমাণ কমে গেছে বলেই বাজারে তাদের জোগান কমে গেছে। চিংড়ি মাছের বহু প্রজাতিও হুমকির মুখে।
বাংলাদেশে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে সনাতনী পদ্ধতিতে কাঠের তৈরি ট্রলার, মাঝারি ট্রলার এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার ব্যবহৃত হয়। জেলেদের অভিযোগ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো সোনার সিস্টেম ব্যবহার করে পুরো মাছের ঝাঁক বংশসহ ধরে ফেলছে। এটাই সাম্প্রতিককালে সাগরে মাছ কমার প্রধান কারণ। তবে সাগরে মাছ কমার প্রধান কারণ হিসাবে দূষণ বেড়ে যাওয়াকেও দায়ী করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার বলেন, সাম্প্রতিককালে সাগরে ওভার ফিশিং ও প্লাস্টিক দূষণ বেড়ে যাওয়ার কারণে মাছের বংশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে কোন প্রভাবগুলো সাগরের প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতি ডেকে আনছে, তা চিহ্নিত করে একটি টেকসই সমুদ্র ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে আমাদের বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধব্রিটিশ রানির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা শেখ হাসিনার
পরবর্তী নিবন্ধকক্সবাজার জেলা পরিষদ নির্বাচনে সকল প্রার্থী বৈধ ঘোষিত