সময়ের দাবি ‘বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম’

আলমগীর নূর | বুধবার , ৫ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হয় বহু দশক ধরে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মর্যাদা এখনো পুরোপুরি প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত কার্যকারিতায় রূপ পায়নি। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, বৃহত্তম আমদানিরপ্তানি প্রবেশদ্বার, শিল্পায়নের অন্যতম কেন্দ্র, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ভবিষ্যৎ ব্লু ইকোনমির প্রবেশমুখ হিসেবে চট্টগ্রামের গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

২০২৬২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকার চট্টগ্রামকে কার্যকর বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনও বারবার চট্টগ্রামকে সিটি গভর্নমেন্টে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, একাধিক সংস্থার বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমের কারণে নগর ব্যবস্থাপনায় কাঙিক্ষত সমন্বয় হচ্ছে না। বাস্তবতাও তাই বলে। চট্টগ্রাম এখন আর শুধু ১৫৫ বর্গকিলোমিটারের একটি নগর নয়। চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল, বেটার্মিনাল, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, রেল ও মহাসড়কসব মিলিয়ে এটি একটি বৃহত্তর মেট্রোপলিটন অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ পানি, সড়ক, ড্রেনেজ, ট্রাফিক, ভূমি উন্নয়ন, পরিবেশ, বন্দর ও নগর পরিকল্পনা এখনও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সমন্বয়হীনতা, যানজট, জলাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের সমস্যা থেকে নগরবাসী মুক্তি পাচ্ছে না।

এই বাস্তবতায় প্রয়োজন সিটি কর্পোরেশন বিলুপ্ত করা নয়, বরং সিটি কর্পোরেশনের ওপর একটি সমন্বিত ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ বা ‘গ্রেটার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন গভর্ন্যান্স’ কাঠামো গড়ে তোলা। যেখানে সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকবে।

চট্টগ্রামের প্রতি বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও উন্নয়ন অঙ্গীকারের কথাও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে চট্টগ্রামকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো সম্প্রসারণে নীতিগত অগ্রাধিকার প্রদান করে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের বাজেটেও চট্টগ্রামকে কার্যকর বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান ইঞ্জিন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না। পাহাড় কাটা, খাল দখল, জলাধার ভরাট এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় চট্টগ্রামকে একটি জলবায়ু সহনশীল মহানগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এখন সময় এসেছে স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরই নয়; এটি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার। তাই বাণিজ্যিক রাজধানীর মর্যাদা শুধু নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রশাসন, পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, আধুনিক অবকাঠামো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর মহানগর শাসনব্যবস্থা।

সিটি গভর্নমেন্ট ও পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ কোনো বিলাসিতা নয়; বরং চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের কার্যকর বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তরের পূর্বশর্ত। এখন সময় সাহসী সিদ্ধান্তেরকারণ ভবিষ্যতের চট্টগ্রাম শুধু একটি শহর নয়, এটি হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী মেট্রোপলিটন অর্থনৈতিক অঞ্চল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবৃষ্টিতে ভিজবো বলে
পরবর্তী নিবন্ধজুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী অর্জন