চট্টগ্রামে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য এক গাড়ি গ্যারেজ ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ওই ব্যবসায়ীকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। সিএমপির পাঁচলাইশ থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থানাধীন মহামায়া লেকের বন বিভাগের একটি পরিত্যক্ত কটেজ থেকে অপহৃত ব্যবসায়ী মো. হেলাল উদ্দিনকে (৩৬) উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অপহরণকারী চক্রের মূলহোতা হিসেবে ব্যবসায়িক পার্টনার মো. আবুল হাশেম (৫২) এবং তার জামাতা আকরামসহ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে অপহৃত হেলাল উদ্দিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আটজন হলেন মো. আবুল হাশেম (৫২), শান্ত মিয়া (৩২), মো. আকরাম (৩৪), মো. মঈন উদ্দিন রায়হান (২৯), আমজাদ হোসেন (৩৫), মাহবুব রহমান (২৬), মানিক হোসেন (৩০) ও মো. ফারুক (৩৪)। তাদের মধ্যে আবুল হাশেম মামলার এজাহারনামীয় আসামি। অন্যরা তদন্তে জড়িত হিসেবে শনাক্ত হন।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হেলাল উদ্দিন পাঁচলাইশ মডেল থানাধীন শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের পাশে একটি গাড়ির গ্যারেজ পরিচালনা করেন। গ্রেপ্তার আবুল হাশেম তার পূর্বপরিচিত এবং ব্যবসায়িক পার্টনার। ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে আবুল হাশেম বিভিন্ন সময়ে হেলালের ব্যবসায় মোট ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। এর মধ্যে হেলাল বিভিন্ন তারিখে তাকে ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। ফলে আবুল হাশেমের পাওনা থাকে ৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
এই টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আবুল হাশেম বেশ কিছুদিন ধরে হেলালকে বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে একটি সাদা মাইক্রোবাস নিয়ে আবুল হাশেমসহ অজ্ঞাতপরিচয় ৭–৮ জন শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের সামনে যায়। তারা হেলালকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তাকে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। ঘটনার খবর পেয়ে হেলালের স্ত্রী মোছাম্মাৎ জেসমিন আক্তার (৩৫) হাটহাজারীর ফতেয়াবাদের বাড়ি থেকে চট্টগ্রাম শহরে এসে সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে স্বামীকে খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে জেসমিনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে হেলালের মোবাইল নম্বর থেকে ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তার স্বামীকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
পুলিশ জানায়, মুক্তিপণের টাকা না দিলে হেলালকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর একই নম্বর থেকে আবার ফোন করে বলা হয়, হেলালকে বাঁচাতে হলে তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ টাকা পাঠাতে হবে। এই টাকা পাঠালে পরবর্তীতে পুরো ৫০ লাখ টাকা দিতে পরিবার রাজি আছে বলে তারা ধরে নেবে–এমন কথাও বলা হয়।
এরপর হেলালের স্ত্রী পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন। তার অভিযোগের ভিত্তিতে ৮ সেপ্টেম্বর পাঁচলাইশ মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা রেকর্ড করা হয়।
মামলার পরপরই অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধারে মাঠে নামে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। পাঁচলাইশ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে এসআই মো. হুমায়ুন কবীর সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে অভিযান শুরু করেন।
পুলিশ জানায়, গোপন খবরের ভিত্তিতে ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নগরীর আকবরশাহ থানাধীন উত্তর কাট্টলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রথমে শান্ত মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচলাইশ থানাধীন মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে মামলার এজাহারনামীয় আসামি আবুল হাশেমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আবুল হাশেমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আকবরশাহ থানাধীন লতিফপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তার জামাতা আকরামকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে অপহৃত হেলাল উদ্দিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের দাবি, শান্ত মিয়া ও আকরামকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা জানায়, হেলালকে মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানাধীন মহামায়া লেক এলাকায় রাখা হয়েছে। এরপর পাঁচলাইশ থানা পুলিশের একটি দল মীরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের সহায়তায় মহামায়া লেকের ভেতরে অভিযান চালায়। সেখানে বন বিভাগের একটি পরিত্যক্ত কটেজে অভিযান চালিয়ে হেলাল উদ্দিনকে উদ্ধার করা হয়। একই সময় কটেজে থাকা মঈন উদ্দিন রায়হান, আমজাদ হোসেন, মাহবুব রহমান, মানিক হোসেন ও মো. ফারুককে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, আবুল হাশেম ও হেলাল উদ্দিন দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক পার্টনার। ব্যবসায়িক লেনদেনের টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। হেলালের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য আবুল হাশেম ও তার জামাতা আকরাম পরিকল্পনা করে তাকে অপহরণের সিদ্ধান্ত নেন।
পুলিশ আরও জানায়, হেলালকে অপহরণের জন্য তারা শান্ত মিয়াকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ করেন। পরে শান্ত মিয়ার মাধ্যমে অন্যদের ভাড়া করে হেলালকে অপহরণ করা হয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্রেপ্তারকৃত আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অপহরণের পুরো পরিকল্পনা, ব্যবহৃত মাইক্রোবাস, অন্যান্য সহযোগী এবং মুক্তিপণ দাবির সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে আরও তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। পুলিশ বলছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।










