ডাক্তার সাহেবরা সব গেলেন কই?
সৌদিআরবে যে শুনি এতো এতো বাংলাদেশী ডাক্তাররা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কারোই সাথে তো দেখা হয়নি! আছি তো ফেব্রুয়ারি থেকেই এখানে। সেলস টিমের সাথে রিয়াদে, দাম্মামে ফিল্ডে কাজ করতে গিয়ে প্রচুর মিশরি ডাক্তার পেয়েছি। সিরিয়ান, জর্ডানি ডাক্তারের সাথেও পরিচয় হয়েছে। এমনকি দুই পাকিস্তানি ডাক্তারের সাথেও হয়েছে মোলাকাত।
আর হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশী জানার পরেও সেলস টিমের কেউ তো বলেনি, তার লিস্টের কোন বাংলাদেশী ডাক্তারের কথা। এপর্যন্ত ডাক্তারদের জন্য নানান প্রপোজাল যে এসেছে টেবিলে, সেলস বা মার্কেটিং থেকে, তাতেও কোন বাংলাদেশী ডাক্তারের নাম তো পড়েনি চোখে!
মনে পড়ল, ছোটবেলার বন্ধু মুকুলের মামাও এসেছিলেন সৌদিতে। চট্টগ্রাম মেডিক্যালের ছাত্র অবস্থাতেই আসতেন যখন বোনের বাসায়, সস্মভ্রমে দেখতাম তাঁকে। ৭৯ কি ৮০ সালে, ইন্টার্নশিপ শেষ করেই দিয়েছিলেন উনি পাড়ি এই মরুতে।
মুকুলের কাছ থেকে পেতাম তখন সৌদি ডাকটিকিটের যোগান। তারপর ৮১ সালের দিকে এক বিকেলে গলায় ইয়সিকা ক্যামেরা ঝুলিয়ে, হাতে টু ইন ওয়ান, গাড়ী বোঝাই ঢাউস দুই তিনটা সুটকেস নিয়ে সৌদি থেকে বেড়াতে এসেছিলেন আমাদের পাড়ায়। সেবারই ওনার সুটকেসের পেট ফুঁড়ে বেরুনো শ্যাম্পু নামের চুল পরিচর্যার এক আচানক বস্তুর সাথে পরিচয় ঘটেছিল আমার। আর সৌদিতে ডাক্তারি করে বছর দুয়েকের মধ্যেই উনি যখন ঢাকার লালমাটিয়ায় ও আগারগাওয়ে প্লট কিনে ফেললেন, পাড়ার মুরুব্বীমহলে তখন ধন্য ধন্য উঠেছিল শোর! পরবর্তীতে লালমাটিয়া মহিলা কলেজের সামনের তাঁর সেই প্লটে যে ছাপড়াঘর বানিয়েছিলেন উনি, থেকেছি আমিও তাতে বারকয়েক, মুকুলের সাথে।
আছেন কী উনি এখনো সৌদিতে? আরে ওনার খবর যে নিবো তার তো উপায় নাই। মুকুলের সাথেইতো দেখা নাই কতোদিন। এবার দেশে গেলে খুঁজে বের করতে হবে ওকে। ওহ হো ভাল কথা! ফেব্রুয়ারিতে আমার প্রথম বিড়ম্বনাবহুল ট্রিপে সাউদিয়ার ফ্লাইটে একজন দেশী ডাক্তার সাহেবের দেখা পেয়েছিলাম তো। ফ্লাইটে একটি বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়লে উনি চিকিৎসা দিয়েছিলেন। সেসময় ওনাকে ধন্যবাদ জানাতে জানাতে, জমাতে চেষ্টা করেছিলাম কথা।
কিন্তু ফেইড জিন্স ও পলো সার্টাবৃত কেলো কাকতাড়ুয়া চেহারার এ অধমকে, সুট টাই পরা উনি মোটেও গ্রাহ্য করেননি। বিব্রত হয়ে তাই আর জিজ্ঞেস করিনি বিস্তারিত তাঁর ঠিকানা সাকিন। তবে, রতনে রতন চিনে বলে যে কথা আছে বাংলায়, সেটির সার্থকতা প্রমাণ করেছেন নিউরোলজির প্রফেসর সৌদি ডাঃ সাইদ বোহলেগা। ওনার অফিসে সেদিনের দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে, আমি বাংলাদেশের শুনেই বলেছিলেন
“হ্যাভ ইউ মেট প্রফেসর ডাঃ কবিরাজ অফ বাংলাদেশ ইন রিয়াদ?”
ওনার কথায়, ডাক্তার ও কবিরাজের ঐ মেলবন্ধনে ভেবেছিলাম, মজা করছেন নাকি উনি? সাথে সাথেই মনে হয়েছিল, ওটা হয়তো ঐ ডাক্তার সাহেবের পদবী। অতএব দিয়েছিলাম উত্তর, না বোধক।
জানিয়েছিলেন ড. বোহলেগা তখন, নিউরোফিজিওলজির এই প্রফেসর সৌদিতে অত্যন্ত সম্মানীয়। সৌদির বেশীরভাগ তরুণ নিউরলজিস্টই তাঁর ছাত্র। শুনে, অধমের কইতর বুকের ছাতি অকস্মাৎ হয়ে উঠেছিল ৫৪ / ৫৬ ইঞ্চি!
আলোচনায় ঐ পর্যায়ে পাশে বসা চৌকশ ফিল্ডম্যানেজার আল গা”রও হয়ে পড়েছিল বিব্রত। সেও যে চিনে না তাঁকে।সেই থেকে কাঁচুমাঁচু হয়ে থাকা গা’র অবশেষে লাঞ্চের সময় দুঃখ প্রকাশ করে আশ্বাস দিয়েছিল অচিরেই ওনার সাথে দেখা করে আসবে। হাসতে হাসতে বলেছিলাম, উনি সম্ভবত শিক্ষকতাই করেন। তাই হয়তো রোগীটোগি দেখেন না। ওনাকে না চেনাটা তাই সেলসের কারো পক্ষে কোন অপরাধ না। তবে হ্যাঁ অচিরেই গা’র ওনার সাথে পরিচিত হয়ে আমার জন্য এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসলে, যারপর নাই প্রীত হবো।
ঈদের ছুটি কাটিয়ে ফিরে, করছি পার রিয়াদের প্রথম শুক্রবার। আজো আমিনের সাথেই গিয়েছিলাম জুম্মায় রুটিনমাফিক। সেসময় আমিন বারবার ধন্যবাদ জানিয়েছে, তার দেয়া ডলার ও স্বর্ণালংকার ফেনির শেফালি বেগমের হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য। বলেছে আমাকে পেয়ে সুবিধা হয়েছে তার। আগামিতেও সাহায্য পাঠাবে সে, তার কায়রো থাকাকালিন সময়ের বাড়ির কেয়ারটেকার কাম বাবুর্চি, মৃত বাসেত আলীর স্ত্রীর জন্য, আমার হাতেই।
নাহ, মোটেও বলিনি, শেফালি বেগমের দেবর ভাসুর আমার কাছ থেকে ঐ ডলার হাতানোর জন্য নানান ফন্দি ফিকির করে যে যন্ত্রণা দিয়েছিল, তা। কী দরকার ঘরের কথা পরকে বলার? যতোই কানাডিয়ান পাসপোর্টধারী হউক না কেন, আমিন তো জাতে পাকিস্তানি।
বরং ফেনির বাসেত আলীর স্ত্রী প্রতি প্রদর্শিত মহানুভবতার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছি, সে যেন শেফালি বেগমকে একটা ব্যাংক আকাউন্ট করে নিতে বলে। যে কোন সময়ই সরাসরি পাঠাতে পারবে সে সাহায্য তাতে।
শুনে জিজ্ঞেস করেছিল আমিন, বাসেত আলীর গ্রামে কোন ব্যাংক আছে কী? সবচেয়ে কাছের ব্যাংকটাই বা কতদূরে?
বলেছিলাম, শোন এখনকার বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ নাই। সড়কপথে ঢাকা থেকে আমাদের মানচিত্রের যে কোন কোনাতেই যেতে চাও, দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে পারবে। এছাড়া বাসেতের মতো অসংখ্যজনতো শ্যামল বাংলার গ্রাম ছেড়ে পুড়ছে এই মরুতেও। প্রতিদিনই তো তাঁরা মরুরোদে বাস্প হয়ে যাওয়া ঘামে কামানো রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে গ্রামে গ্রামে। আশ্বস্ত হয়েছে তাতে আমিন বলেই মনে হয়েছে! দেশে ও সিংগাপুরেও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ অধমই যেহেতু ভ্যাক্সিন ব্যবসা দেখাশোনা করতাম, সে যুক্তিতে এখানকার সে দায়িত্বও দিয়েছেন তুলে বস, ঘাড়ে। বরাবরের মতোই না করিনি। শুধু চেয়েছিলাম বাড়তি লোকবল। বিনা ওজর আপত্তিতেই মেনে নিয়েছেন তা, ফিল রাশ। তো ঐ দায়িত্ব ঘাড়ে উঠতে না উঠতেই পেয়েছিলাম টের, সময় নাই হাতে। হজের প্রস্তুতি হিসেবে, সৌদি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ও এ সময় শুধু যে নড়ে চড়ে বসে, তাই নয়! যে সব বিষয় স্বাস্থ্যবিষয়ক ব্যুরোক্রেসি থাকে বছরভর কুম্ভকর্ণনিদ্রায়, সে সব নিয়ে এসময়ই শুরু হয় তাদের হুটোপুটি হুড়াহুড়ি। ঐ মেনিনজাইটিস ভ্যাক্সিন নিয়ে পড়েছি আমি সেই চক্করে। তদপুরি এ বিষয়ে সৌদি অফিসের কারোই নাই অভিজ্ঞতাও।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।









