মোবাইল ফোন সংক্রান্ত বিরোধেই কি হত্যাকাণ্ড

কলেজছাত্র সাজিদ হত্যা

হাবীবুর রহমান | রবিবার , ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

নগরীর ডিসি রোডের মৌসুমী আবাসিক এলাকায় কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে মারধর করে লিফটের গর্তে ফেলে দিয়ে খুনের আগে ‘চোর চোর’ বলে ধাওয়া করেছিল খুনীরা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দৈনিক আজাদীকে এ তথ্য জানিয়েছেন। সূত্রটি জানায়, খুনীদের ধাওয়ায় সাজিদ ঘটনাস্থল তথা নির্মাণাধীন আমিন এন্ড হাসান ম্যানসনের ৮ তলার উপর উঠে পড়েছিলেন।

আদালতের একটি সূত্র জানিয়েছে, আশফাক খুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার ১ নম্বর আসামি আইমন গত ১৫ এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর পুলিশ যখন তাকে হাজতখানার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তিনি জানিয়েছেন– ‘সম্প্রতি তার ভাগিনার একটি মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়েছিল। খোঁজ খবর নেওয়ার একপর্যায়ে সাজিদকে উক্ত মোবাইল ফোন ছিনতাইকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

সাজিদ হত্যা মামলার তদন্তের সাথে সম্পৃক্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, সাজিদকে ‘চোর চোর’ বলে ধাওয়া দেওয়ার ব্যাপারটি সঠিক। তবে সাজিদ প্রকৃতই ছিনতাই কাজে জড়িত ছিলেন কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার দিন সাজিদ কাপ্তাই থেকে ফিরেছিলেন জানিয়ে সূত্র জানায়, কাপ্তাইয়ে চাচার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে ফিরে বন্ধু ফারদিনকে ফোন করে মৌসুমী আবাসিক মোড়ে দেখা করার জন্য বলেন। দেখা হওয়ার পর তারা দু’জন বৌ বাজার যাওয়ার রাস্তার মুখের একটি টং দোকানে বসে কথাবার্তা বলছিলেন। একটা কোক কিনে দু’জনে মিলে খাচ্ছিলেন। তখন ফারদিনের কাছে একটি ফোন আসে। ফোনকলটি ছিল মামলার ৬ নম্বর আসামি মিসকাতুল কায়েসের। মিসকাতুল কায়েস ফারদিনকে কোথায় আছিস, সাথে কে আছে তা জানতে চাইলে ফারদিন জানায়, সাজিদ আর সে বৌ বাজার যাওয়ার রাস্তার মুখের একটি টং দোকানে বসে আছে। এরপর মিসকাতুল তাদেরকে সেখানে থাকতে বলেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, খুনীরা যখন সাজিদকে টং দোকানে ধরেন, তখনও মিসকাতুল সেখানে হাজির ছিলেন না। ধারণা করা হচ্ছেমিসকাতুল কিংবা অন্য কেউ খুনীদের কাছে সাজিদকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্র জানায়, টং দোকান থেকে সাজিদকে তুলে নিয়ে একটি অটোরিকশায় উঠানো হয়। কিন্তু সাজিদ সেখান থেকে নেমে দৌড় দেন। তখন তাকে পেছন থেকে ‘চোর চোর’ বলে ধাওয়া দেন ঘটনায় জড়িতরা।

মিসকাতুল কায়েস সিটি কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র। আশফাক ছিলেন বিএফ শাহীন কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র। আশফাকের এক বছরের সিনিয়র মিসকাতুল। এলাকায় মিসকাতুলের সাথে কয়েকবার শোডাউনে গিয়েছিলেন সাজিদ। আশফাকফারদিনরা মূলত মিসকাতুলের সাথে চলাফেরা করতেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিসকাতুলের সাথে সাজিদের কোনো বিরোধ আছে কি না বা মিসকাতুলের সাথে আইমনদের যোগসূত্র কী, ঠিক কী কারণে টং দোকানে বসে থাকা সাজিদকে ধরা হলতার বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত কোনো বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাজিদ খুনের ঘটনায় জড়িতরা প্রায় সবাই অন্ধকার জগতের লোক। চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবনএসবই তাদের পেশা ও নেশা। মামলার ৫ নম্বর আসামি এনায়েতুল্লাহ’র বিরুদ্ধে চকবাজার ও কোতোয়ালী থানায় দস্যুতা, মারধর, হত্যাচেষ্টা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটনানোসহ নানা অপরাধের ৬টি মামলা রয়েছে। তার সুনির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। মূলত ছিনতাই কাজই করে থাকেন। নেশা করেন নিয়মিত। বিয়ে করেছেন দুটি। তার দুই বৌ সম্পর্কে আপন দুই বোন। বড়জনের ঘরে তিনটি ও ছোটজনের ঘরে একটি সন্তান রয়েছে। চন্দনপুরার গুলএজার বেগম স্কুল এলাকায় এনায়েতল্লাহ’র বাড়ি। তবে তার বউদের বাড়ি হচ্ছে মৌসুমী আবাসিক এলাকায়। সাজিদ খুনের মামলার ১ নম্বর আসামি আইমন তার শালা।

পুলিশ সূত্র জানায়, সাজিদ খুনের মামলায় এনায়েতুল্লাহ, মিসকাতুল কায়েস ও ঘটনাস্থল তথা নির্মাণাধীন আমিন এন্ড হাসান ম্যানসনের দারোয়ান এনামুলক হককে ঘটনা পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। এরমধ্যে এনায়েতুল্লাহকে গ্রেপ্তার করার সময় ভালোই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। একজন কনস্টেবলকে কামড় পর্যন্ত দিয়ে বসেন তিনি। বলছিলেন– ‘আওয়ামী লীগের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন বিএনপির সময়ও তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। বিএনপি করে তাহলে লাভটা কী হল?’

তার দুই স্ত্রী বিষয়ে সূত্র জানায়, এই দুই বোনও নানা ঝামেলা করার চেষ্টা করেছেন। থানা ভেঙে ফেলবেএমন হুমকি দিয়েছেন। কীসের পুলিশবলে থানায় চিল্লাপাল্লাও করেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, এনায়েতুল্লাহ নিজেকে বিএনপির লোক পরিচয় দিলেও তার জন্য থানায় কেউ একটি ফোনও দেননি।

প্রধান আসামি আইমন বিষয়ে বলা হয়, ঘটনার পর থেকে তাকে ধরতে তিন রাউন্ড ধাওয়া করা হয়। টিকতে না পেরে একপর্যায়ে গত ১৫ এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। তিনিও পেশায় মাদক, ছিনতাই কাজে জড়িত। তার বিরুদ্ধে বাকলিয়া থানার একটি মামলায় আদালতের ওয়ারেন্ট রয়েছে। অনিক নামের মামলার অপর এক আসামি সম্পর্কে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ সদস্য বলেন, তিনি ডিসি রোডের মৌসুমী আবাসিক ও এঙেস রোড এলাকার বড় মাদক ব্যবসায়ী।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, সাজিদ খুনের মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার মিসকাতুল কায়েস, এনায়েতুল্লাহ ও এনামুল হক এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করা আইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছেন। তবে উক্ত বিষয়ে এখনো শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। আগামীকাল (আজ) শুনানি হতে পারে। এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কমকর্তা ও চকবাজার থানার এসআই মো. মেহেদি হাসান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং মামলার পলাতক আসামিদের শনাক্তকরণের জন্য গ্রেপ্তার ও আদালতে আত্মসমর্পণ করা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এ জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আশা করছি, রিমান্ডে সবকিছু বের হয়ে আসবে।

প্রসঙ্গত, গত ১২ এপ্রিল বিকালে নগরীর ডিসি রোডের মৌসুমী আবাসিক এলাকার নির্মাণাধীন আমিন এন্ড হাসান ম্যানসনের ৮ তলা থেকে লিফটের খালি জায়গা দিয়ে ফেলে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে খুন করা হয়। তার বাড়ি কঙবাজারের চকরিয়া উপজেলায়। এ ঘটনায় তার বাবা আবুল হাসেম সিকদার বাদী হয়ে আইমন, মিসকাতুল কায়েস, এনায়েতুল্লাহ, এনামুল হকসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেনঅনিক, রানা ও ইলিয়াস।

মামলার এজহারে বলা হয়, ডিসি রোডের শিশু কবরস্থান এলাকার একটি ব্যাচেলর বাসায় থাকতেন আশফাক। বন্ধু ফারদিনের সাথে টং দোকানে বসে কথা বলার সময় আসামিরা ছোরা দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে আশফাককে অজ্ঞাত স্থানে যায়। নিজেকে রক্ষার জন্য সেখান থেকে কৌশলে সে কোনোরকমে দৌড়ে নির্মাণাধীন আমিন এন্ড হাসান ম্যানসনের ৮ তলার উপর উঠেন এবং ভবনের গেইট লক করে দেন। এরমধ্যে আসামিরা ভবনটির সামনে জড়ো হয়ে চোর ঢুকছে বলে দারোয়ান এনামুল হককে জানান। এতে এনামুল হক গেইট খুলে দিলে আসামিরা ভবনটিতে প্রবেশ করে আশফাককে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন। একপর্যায়ে আশফাককে ৮ তলার উপর পেয়ে মারধর করে লিফটের জন্য নির্ধারিত জায়গা দিয়ে নিচে ফেলা দেওয়া হয়। এ খবরটি স্থানীয়দের কাছ থেকে পেয়ে পুলিশ আশফাককে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএনসিটি পরিচালনায় সরকার রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে : নৌ মন্ত্রী
পরবর্তী নিবন্ধরোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান রাখাইনেই নিহিত : পররাষ্ট্রমন্ত্রী