আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগে যখন কোনো অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছিল না, কোনো ব্রেন স্ক্যানার ছিল না, এমনকি ‘নিউরোসায়েন্স‘ শব্দটারও জন্ম হয়নি তখন একজন মানুষ বসে মানুষের মনের এমন এক নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, যা আজকের আধুনিক বিজ্ঞানকেও হার মানায়। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ। আজকের দিনে বিশ্বের নামী–দামী নিউরোসায়েন্টিস্টরা বিলিয়ন ডলারের এফএমআরআই মেশিন দিয়ে রিয়েল–টাইমে আমাদের নিউরনের কার্যকলাপ দেখছেন। দশকের পর দশক গবেষণা করেও তারা আজ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি, আর তা হলো: ‘আমাদের অভিজ্ঞতার অনুভূতি আসলে কেমন এবং কেন তা তৈরি হয়?’ কিন্তু যখন আমরা বুদ্ধের তৃতীয় এবং সবচেয়ে উন্নত শিক্ষা ‘অভিধর্ম‘ খুলে দেখি, তখন সেখানে একটি সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে ৮৯ প্রকারের চেতনা, ৫২টি মানসিক উপাদান এবং একটি জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া যা ঠিক ১৭টি ধাপে উন্মোচিত হয়, তার নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে।
আজ আমরা এই বৌদ্ধ অভিধর্ম এবং আধুনিক নিউরোসায়েন্সকে পাশাপাশি রেখে দেখব তারা কি আসলেই একই সত্যের কথা বলছে? অভিধর্ম কী? বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ মূলত তিনটি সংগ্রহে বিভক্ত, যাকে বলা হয় ত্রিপিটক : বিনয় পিটক: ভিক্ষুদের জন্য নিয়ম– শৃঙ্খলা। সূত্র পিটক: বুদ্ধের সাধারণ কথোপকথন, গল্প এবং উপদেশ। অভিধর্ম পিটক: এটি কোনো গল্প বা উপদেশ নয়; এটি হলো পরম বাস্তবতার একটি কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক বিশ্লেষণ। অভিধর্ম রূপক বা দর্শন দিয়ে নয়, বরং সরাসরি প্রশ্ন করে: মন আসলে কী দিয়ে তৈরি? এটি কত দ্রুত চলে? এবং দুঃখের মূল কারণ কী? অভিধর্ম অনুযায়ী পরম বাস্তবতা বা ‘পরমার্থ ধম’ ৪টি : চিত্ত : খাঁটি সচেতনতা বা চেতনা। অভিধর্ম ৮৯ প্রকারের চিত্ত সনাক্ত করে, যা সেকেন্ডের এক ভগ্নাংশের মধ্যে উৎপন্ন হয় এবং মিলিয়ে যায়। চৈতসিক: মানসিক উপাদান। এটি চেতনার রঙ নির্ধারণ করে। যেমন: লোভ, ক্ষোভ, একাগ্রতা, প্রজ্ঞা, করুণা সবই চৈতসিক (মোট ৫২টি)। রূপ : ভৌত বা উপাদানগত বাস্তবতা। আমাদের শরীর, মস্তিষ্ক এবং চারপাশের পদার্থ, যা ২৮টি উপাদানে বিভক্ত । নির্বাণ: যা চিরন্তন, যার কোনো উৎপত্তি বা অবসান নেই। এটিই পরম লক্ষ্য ।
প্রথম তুলনা: মন বনাম মস্তিষ্ক –আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলে, আমাদের মন হলো মস্তিষ্কের নিউরনের কাজের ফল। একে কম্পিউটারের সাথে তুলনা করা যায় মস্তিষ্ক হলো হার্ডওয়্যার আর মন হলো তার সফটওয়্যার। কিন্তু নিউরোসায়েন্সের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো: তারা দেখতে পারে ভয়ের সময় মস্তিষ্কের কোন অংশ সক্রিয় হচ্ছে, কিন্তু কেন আমাদের ভেতরে সেই ভয়ের ‘অনুভূতি’ বা এক্সপেরিয়েন্স তৈরি হচ্ছে, তা তারা ব্যাখ্যা করতে পারে না ।
এখানেই অভিধর্ম একটি চমৎকার পার্থক্য দেখিয়েছে। এটি বাস্তবতাকে দুটি ভাগে ভাগ করে নাম (ঘধসধ –মানসিক) এবং রূপ (জঁঢ়ধ –শারীরিক) । মস্তিষ্ক, নিউরন এগুলো হলো ‘রূপ‘। আর চেতনা বা অনুভূতি হলো ‘নাম‘। অভিধর্ম বলে, মস্তিষ্ক থেকে চেতনার জন্ম হয় না; বরং মস্তিষ্ক এবং চেতনা একে অপরের ওপর নির্ভর করে একসাথে উৎপন্ন হয়, যাকে বলা হয় ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৫ সালের একটি সামপ্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্ককে চেতনার একক উৎপাদক না বলে একে ‘মস্তিষ্ক–শরীর–পরিবেশের একটি গভীরভাবে নির্ভরশীল ব্যবস্থা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন যা বুদ্ধ ২৫০০ বছর আগেই বলে গেছেন। মনের ১৭টি ধাপ : অভিধর্ম অনুযায়ী, প্রতিবার যখন আমরা কিছু দেখি বা শুনি, আমাদের মনে ঠিক ১৭টি চিন্তাক্ষণ বা ধাপ পার হয়। একটি নিউরন ফায়ার হতে যে সময় নেয়, তার চেয়েও কম সময়ে এই ১৭টি ধাপ ঘটে যায় ।
ধাপগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
ধাপ ১ – ৩ (ভবঙ্গ) : এটি হলো অবচেতন মনের শান্ত প্রবাহ। যখন কোনো উদ্দীপনা আসে, তখন এই প্রবাহে কম্পন তৈরি হয় এবং তা বাধাগ্রস্ত হয় । ধাপ ৪ (আবর্তন): মন ইন্দ্রিয় দ্বারের দিকে ঘোরে। মনোযোগ শুরু হয় । ধাপ ৫ (দর্শন): খাঁটি চোখের দেখা। এখানে কোনো ভালো বা মন্দের বিচার থাকে না । ধাপ ৬ (সমপ্রতীচ্ছন): মন সেই দৃশ্যটিকে গ্রহণ করে । ধাপ ৭ (সন্তীরণ): মন বিষয়টিকে পরীক্ষা করে। ধাপ ৮ (ব্যাবস্থাপন): মন শ্রেণীবিভাগ করে ‘এটি একটি মুখ’, ‘এটি একটি বিপদ’, বা ‘এটি সুন্দর’। ধাপ ৯ –১৫ (জবন): এই ৭টি ক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ইচ্ছা বা ‘কর্ম‘ তৈরি হয়। এই দ্রুততম সময়ে মন লোভ, ক্ষোভ, করুণা বা প্রজ্ঞা দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়। ধাপ ১৬ – ১৭ (তদালম্বন): অভিজ্ঞতাটি মনের স্মৃতিতে নিবন্ধিত হয় এবং মন আবার ‘ভবঙ্গ‘ বা শান্ত প্রবাহে ফিরে যায়। নিউরোসায়েন্সেও ঠিক একইভাবে উদ্দীপনা সনাক্তকরণ, থ্যালামাসে সিগন্যাল পাঠানো, প্রাইমারি কর্টেক্সে প্রসেসিং এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে প্রতিক্রিয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু অভিধর্মের মতো ‘জবন‘ ক্ষণে কীভাবে কর্ম বা ইচ্ছা তৈরি হয়, তা বিজ্ঞান আজও নিখুঁতভাবে দেখাতে পারেনি ।
বিজ্ঞান আবেগকে ডোপামিন, সেরোটোনিন, কর্টিসল বা অক্সিটোসিনের মতো নিউরোকেমিক্যালের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে । অন্যদিকে অভিধর্ম ৫২টি চৈতসিক বা মানসিক উপাদানের কথা বলে, যা আমাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ক্ষতিকারক মানসিক উপাদান : এগুলো মনে দুঃখ বা কষ্টের সৃষ্টি করে :
লোভ : কোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি ডোপামিন চালিত আচরণ। দ্বেষ বা ক্ষোভ : রাগ বা ঘৃণা। বিজ্ঞানের ভাষায় কর্টিসল এবং অ্যামিগডালা সক্রিয় হওয়া। মোহ : অজ্ঞতা বা সত্যকে পরিষ্কারভাবে না দেখা। এটিই সব দুঃখের মূল। কল্যাণকর মানসিক উপাদান: এগুলো মনের সুস্থতা ও সুখের জন্ম দেয় : সতী: মননশীলতা বা সচেতনতা। হিরি ও ওত্তাপ্পা: নৈতিক লজ্জা এবং অপকর্মের ফলাফলের প্রতি সুস্থ ভয়। বুদ্ধ একে ‘পৃথিবীর রক্ষক’ বলেছেন। অলোভ ও অদ্বেষ: উদারতা এবং মৈত্রী। করুণা ও মুদিত: দয়া এবং অপরের সুখে সুখী হওয়া।
প্রজ্ঞা: বাস্তবতাকে তার আসল রূপে দেখার ক্ষমতা। অভিধর্ম আমাদের এই মানচিত্রটি দেয় যাতে আমরা নিজের মনকে প্রশ্ন করতে পারি ‘এই মুহূর্তে আমার মনে কোন উপাদানটি কাজ করছে? লোভ নাকি মৈত্রী?’ এবং সেই অনুযায়ী আমরা আমাদের মনকে পরিবর্তন করতে পারি। ধ্যান এবং মস্তিষ্কের পরিবর্তন।
অভিধর্মে ধ্যানকে কেবল মানসিক প্রশান্তি বলা হয়নি, একে বলা হয়েছে মনের স্থায়ী পরিবর্তন। এর মাধ্যমে সাধারণ মন থেকে ক্রমশ ‘ধ্যান চিত্ত‘ এবং শেষ পর্যন্ত ‘লোকোত্তর চিত্ত‘ জাগ্রত হয়, যা মনের সমস্ত নেতিবাচকতাকে চিরতরে উপড়ে ফেলে এবং দুঃখের স্থায়ী অবসান ঘটায় (নির্বাণ)। নিউরোসায়েন্স আপনাকে চাপমুক্ত করতে পারে, কিন্তু স্থায়ীভাবে দুঃখ থেকে মুক্তি বা নির্বাণের পথ কেবল অভিধর্মই দেখাতে পারে ।
আধুনিক বিজ্ঞান এবং বৌদ্ধ ধর্ম উভয়েই একটি বিপ্লবী সত্যে একমত হয়েছে: আমাদের ‘আমি‘ বা ‘স্থায়ী আত্মা‘ বলে কিছু নেই। যাকে আমরা ‘আমি’ বলি, তা আসলে প্রতি মুহূর্তে দ্রুত পরিবর্তনশীল কিছু মানসিক ও শারীরিক ঘটনার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া মাত্র। বুদ্ধ একে বলেছেন ‘অনাত্ন‘, আর নিউরোসায়েন্স একে বলে ‘নির্মিত সত্তা’। নিউরোসায়েন্স মনকে বাইরে থেকে যন্ত্রের মাধ্যমে দেখে, আর অভিধর্ম মনকে দেখে ভেতর থেকে নিজের চেতনাকে প্রশিক্ষিত করে। আপনার মন কোনো রহস্য নয় যে একে এভাবেই ছেড়ে দিতে হবে। এটি একটি, জানা সম্ভব, মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব এবং প্রশিক্ষণযোগ্য বাস্তব সত্তা।
তথ্য সূত্র: অনলাইন ও জার্নাল।
লেখক: মহাসচিব:, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ বাংলাদেশী বুড্ডিস্টস, ইউএসএ।












