দীপ্ত শপথ ও বাঁধভাঙা এক উচ্ছ্বাসের নাম তারুণ্য যা অদম্য সাহস আর অজেয় শক্তির এক প্রদীপ্ত শিখা। তারুণ্য মানেই নতুনত্ব, সংস্কারের সূচনা। বাংলাদেশ সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই জাতির স্বার্থে তরুণ প্রজন্মের দৃঢ় প্রত্যয়, সাহস, নেতৃত্ব, পরিশ্রম ও ত্যাগ–তিতিক্ষার বদৌলতে অপূর্ব সাফল্যের অনেক গৌরবময় সাক্ষ্য আমরা প্রত্যক্ষ করি। তারুণ্যের চেতনায় যুগে যুগে নানা সংকট থেকে এ দেশের উত্তরণ ঘটেছে, এমনকি বর্তমানেও তরুণ সমাজ জাতির কল্যাণে নানা ক্ষেত্রে দুঃসাহসী ভূমিকা রাখছে। তারুণ্য সৌন্দর্য, সজীবতা ও উদ্দীপনার প্রতীক। মূলত কৈশোরোত্তর জীবনীশক্তিই তারুণ্যের প্রকৃত রূপ। জীবনের ধারাবাহিক পথ পরিক্রমায় কৈশোর পরবর্তী জীবনকালেই তারুণ্যের যাত্রা। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুসারে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সকে ’তরুণ’ নির্ধারিত করা হলেও বিভিন্ন সংস্থা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সকেও ‘তরুণ’ বিবেচনা করা হয়। সৌভাগ্যের বিষয় হল, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তরুণ। দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী তরুণ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের এরূপ বিশাল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর সুবিধা থাকবে আরো প্রায় বিশ বছর। প্রদীপ্ত তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথার্থভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সিংহভাগ এ স্বর্ণালী সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার আবশ্যকতা বলাবাহুল্য।
আজকে যে টেকসই বা আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথা বলা হচ্ছে, তরুণদের বাদ রেখে এ স্বপ্ন দেখার সুযোগ নেই। আধুনিক বাংলাদেশ মানেই শিক্ষিত ও সুদক্ষতাসম্পন্ন জাতি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে সামনে রেখে আধুনিক বাংলাদেশ এর টেকসই ভিত্তি বিনির্মাণে বিশেষজ্ঞরা আধুনিক নাগরিক, আধুনিক অর্থনীতি, আধুনিক সরকার ও আধুনিক সমাজ বিনির্মাণের প্রতি লক্ষ্য রাখছেন। এই চারটি ভিত্তির আলোকে বাংলাদেশকে আধুনিক বাংলাদেশে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যয়ী ভূমিকা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক বাংলাদেশের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন তরুণ জনগোষ্ঠী। কারণ, তারাই হবে এ দেশের কর্মক্ষম দক্ষ নাগরিক। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান ছাড়া সুদক্ষ আধুনিক মানের মানবসম্পদ গঠনের চিন্তা একেবারে অবান্তর। উদ্ভাবনী ধারণা, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা মনোভাবের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে চালিকাশক্তি হিসেবে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। আধুনিক বাংলাদেশের লক্ষ্য পূরণে প্রযুক্তির ব্যবহার অনিবার্য। বর্তমান বিশ্বে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জোয়ার বইছে। বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদান ও চতুর্থ বিপ্লবে নিজ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তরুণদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, স্পিকার ও ইন্টারনেট এখন মানুষের নিত্য জীবনের সঙ্গী। দ্রুততম গতির বাধাহীন তথ্যপ্রযুক্তির স্থানান্তর, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার এবং যন্ত্রের মাধ্যমে নির্ভুলভাবে স্বয়ংক্রিয় কর্ম সম্পাদন সত্যিকার অর্থে আধুনিক জনজীবনে এক বিস্ময়কর সংযোজন। তাছাড়া আইওটি, রোবটিক্স, ব্লকচেইন ইত্যাদির ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তরুণ জনগোষ্ঠী সমাজ পরিবর্তনের প্রধান বাহক। মূলত তরুণরাই প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথ সুগম করবে। নাগরিক হিসেবে নিজেকে যথার্থভাবে প্রস্তুত করে সামাজিক সচেতনতা তৈরি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে দেশের পরিবর্তনে কার্যকর নেতৃত্ব দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নতিতে প্রতিশ্রুতিশীল হতে হবে। নতুন নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করে উৎপাদন, ব্যবসা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা অসম্ভব কিছু নয়।
কর্মোদ্যমে তারুণ্য এক জলন্ত বারুদ। তারুণ্যের কর্মক্ষমতা পরিপূর্ণরূপে কাজে লাগানো সম্ভব হলে অনেক বড় সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে। সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয়— কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোনটাতেই তাদের অংশগ্রহণ নেই। অথচ তরুণ প্রজন্মই আধুনিক বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়নের মূল ভিত্তি। দেশের কল্যাণ ও অগ্রগতির স্বার্থে এ কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্টীকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় যুগোপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় মানব সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। কিন্তু এ অগ্রগতির পথেও রয়েছে বহুমুখী বাধা। ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সৃষ্ট বেকারত্ব, শিক্ষার গুণগত মানের অভাব এবং মানসিক অবসাদজনিত বাধাসমূহ একদিকে যেমন তারুণ্যের অগ্রগতি ব্যাহত করে অপরদিকে তরুণদের মাঝে হতাশা সৃষ্টি করে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেয়। বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম হলেও মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব এবং কারিগরি শিক্ষার অভাবে একটি বড় অংশ প্রতিযোগতায় টিকে থাকতে না পেরে বেকার বা নিষ্ক্রিয় থাকছে, যা তাদের সম্ভাবনাকে ব্যাহত করছে। এ সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করে উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে তুলনামূলক পিছিয়ে পড়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে একদিকে নতুন কোন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, আবার কর্মক্ষম ও দক্ষ অনেকে প্রত্যাশিত চাকরি না পেয়ে কর্মহীন থাকছে। এ পরিস্থিতি সত্যিকার অর্থে বেদনাদায়ক যা মোকাবেলা করতে তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। মানব সম্পদ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বর্তমান বৈশ্বিক চিত্র ও শ্রমবাজার সামনে রেখে কর্মক্ষম তারুণ্যের সময়কে কাজে লাগাতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তরুণ প্রজন্ম আধুনিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে দেশের উন্নতিতে অবদান রাখছে। তাই উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সমকক্ষ হতে আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের যুগোপযোগী জ্ঞান অর্জন জরুরি। বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি এখন তাদের কাজগুলো অফিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নানাভাবে মার্কেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এতে কৃষকের সময়, অর্থ ও পরিশ্রম কম লাগছে এবং শিল্প ও ব্যবসা–বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ হচ্ছে।
তরুণ প্রজন্ম নিঃসন্দেহে ভোরের সূর্যোদয়, তারা যেন আগামীর উন্নত বাংলাদেশের নুতন বার্তা দিচ্ছে। অত্যধিক প্রযুক্তির আসক্তির কারণে কিছুদিন আগেও বলা হতো এই প্রজন্ম দিয়ে কিছু হবে না। আজ এ ধারণা ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। তরুণেরা প্রতি পদক্ষেপে দেখিয়ে দিচ্ছে তারা সম্ভাবনার স্তম্ভ, তাঁরা কত সাহসী, কত শক্তিশালী; তারা দেশের জন্য জীবনও দিতে প্রস্তুত। আমরা এমন দেশ চাই যে দেশটি হবে উন্নয়নের মডেল, যে দেশের মানচিত্র বিশ্বের দরবারে উন্নত মর্যাদায় উজ্জ্বল থাকবে। এটা সেই দেশ, যে দেশে কোনো কিছুর ঘাটতি নেই। আমরা আশান্তির দেশ চাই না, রক্তপাত চাই না। আমরা চাই শান্তি ও সম্প্রীতির শাসন, আমরা জনগণ বান্ধব শাসক চাই। সংস্কৃতি ও সভ্যতার উন্নয়নের কারিগর তরুণ জনগোষ্ঠীই এ চেতনার ধারক ও বাহক । দেশকে সেবা, ভালোবাসা, মমতা ও দায়িত্বশীলতা দিয়ে আগলে রাখতে হবে। যে জীবন জাতির কোন কল্যাণে আসে না, সে জীবন বৃথা। দেশমাতৃকার উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তরুণদের অপরিমেয় শক্তির অধিকারী হতে হবে। তারুণ্য হলো সফলতার স্বপ্ন, বিজয়ের বার্তা। জীবনকে প্রকৃত অর্থে গড়ে তোলে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রস্তুতি নেয়ার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক; উপমহাব্যবস্থাপক, রূপালী ব্যাংক পিএলসি।











