আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি আর নেই। ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। দীর্ঘদিন অসুস্থতায় ভোগার পর শুক্রবার রাতে আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরের একটি মেডিকেল ক্লিনিকে হোর্হে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আর্জেন্টিনা অধিনায়কের পরিবারের বরাতে শনিবার এই খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। মেসির শৈশবের ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজও সামাজিক মাধ্যমে এই খবর জানিয়ে শোক প্রকাশ করেছে। পরিবার জানিয়েছে, হোর্হে তার জীবনের শেষ দিনগুলো রোসারিওর একটি মেডিকেল সেন্টার ও বাড়িতে আসা–যাওয়ার মধ্যে কাটিয়েছেন। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী এবং সন্তান রদ্রিগো, মাতিয়াস ও মারিয়া সোল। আরেক সন্তান লিওনেল মেসি বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর বাবার সঙ্গে সময় কাটাতে রোসারিওতে যান। এরপর তিনি ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন, ফেরার পর এরই মধ্যে দুটি ম্যাচ খেলেছেন রেকর্ড আটবারের ব্যালন দ’র জয়ী। সাবেক ক্লাব বার্সেলোনায় মেসির শুরুর দিনগুলো থেকে শুরু করে ক্যারিয়ারজুড়ে তার পাশে ঘনিষ্ঠভাবে ছিলেন হোর্হে। বেশ কয়েক বছর ছেলের এজেন্ট হিসেবেও কাজ করেন তিনি। বাবা ছিলেন মেসির জীবনের সবচেয়ে বড় ‘রোল মডেল’। রোজারিওর এক সাধারণ বালক থেকে আজকের এই মহাতারকা হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা যার, তিনি হোর্হে মেসি। লিওনেল মেসির কাছে তিনি শুধু একজন জন্মদাতাই নন, ব্যক্তিজীবন ও ফুটবল ক্যারিয়ার দুই জায়গাতেই তিনি ছিলেন তার সবচেয়ে বড় ‘রোল মডেল’ বা আদর্শ। ১৯৫৮ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম নেওয়া হোর্হে একসময় কারখানায় কাজ করতেন। চার সন্তানের বড় সংসার চালাতে তাঁকে করতে হয়েছে হাড়ভাঙা খাটুনি। বাবার এই জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন ছোট্ট লিওনেল। ছেলের ফুটবল প্রতিভা আর উন্নত ভবিষ্যতের খোঁজে একপর্যায়ে নিজের শেকড় ছেড়ে স্পেনের বার্সেলোনায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। এমনকি ছেলের স্বপ্নের কথা ভেবে পরিবারের অন্যদের থেকে কিছুদিন আলাদাও থাকতে হয়েছিল তাঁকে। বাবার এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ মেসিকে শিখিয়েছে কীভাবে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি যেমন সবসময় পরিবারের পাশে ছিলেন, তেমনি হোর্হে মেসি ছিলেন লিওনেলের মানসিক ও পেশাগত শক্তির সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। শৈশব থেকে শুরু করে বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে বাবাকেই অনুসরণ করেছেন মেসি। মজার ব্যাপার হোর্হে ছিলেন স্থানীয় ক্লাব ‘নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ’–এর বড় ভক্ত। বাবার হাত ধরেই এই ক্লাবে মেসির ফুটবলের হাতেখড়ি। আজও মেসি নিজেকে এই ক্লাবেরই সমর্থক মনে করেন। পাদপ্রদীপের আলোর আড়ালে থাকা এক আদর্শ ছেলের এত বড় সাফল্য, বিশ্বজোড়া তারকাখ্যাতি তবুও হোর্হে মেসি সবসময় নিজেকে ক্যামেরার আড়ালে রাখতেই পছন্দ করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সাধারণ ও নিভৃতচারী। ব্যালন ডি’অর জয়ের মতো বড় বড় অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান কিংবা শিরোপা উদযাপনের সময়ও তিনি স্বেচ্ছায় গণমাধ্যমের আলোর বাইরে থেকেছেন। বাবার এই বিনয় আর মাটির কাছাকাছি থাকার স্বভাবই মেসিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। মেসির কাছে তাই হোর্হে মেসি শুধু একজন বাবাই নন, তিনি এমন এক আদর্শ, যাঁর দেখানো পথ ধরেই বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় পৌঁছেছেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে নিজের প্রথম গোল করার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মেসি। উদযাপনের এক পর্যায়ে তার চোখে দেখা যায় জল। জার্সিতে চোখ মুছতেও দেখা যায় তাকে। প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে খেলা মেসি ওই ম্যাচের পর বলেছিলেন, ফুটবলের বাইরের বিষয় থেকেই তার চোখে জল এসেছিল। এর কয়েক দিন পর পরিবারের পক্ষ থেকে হোর্হের অসুস্থতার খবর জানানো হয়। এবার চলেই গেলেন তিনি। বাবার নিঃস্বার্থ ত্যাগের কথা স্মরণ করে ২০০৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার বাবা সব সময় আমার পাশে ছিলেন। আমরা অনেক কঠিন সময় পার করেছি। অনেক সময় আমি ঘরে নিজেকে বন্দি করে কাঁদতাম। কখনো বাবাও আমার অলক্ষ্যে কাঁদতেন। আমরা একে অপরের সামনে এমন ভাব করতাম যেন সবকিছু ঠিক আছে, কিন্তু আসলে আমরা কেউই ভালো ছিলাম না। বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি কী চাও? আমরা কি স্পেনে থাকব নাকি দেশে ফিরে যাব? আমি বলেছিলাম, আমি এখানেই থাকতে চাই, আর তিনিও আমার সঙ্গে থেকে গিয়েছিলেন।’ হোর্হে মেসির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘আমাদের অধিনায়ক ও প্রতীক লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুতে আমরা গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করছি।’ কনমেবল আর্জেন্টাইন ফুটবলার লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসির প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করছে। ‘গভীর শোকের এই মুহূর্তে আমরা লিওনেল, তার পরিবার, বন্ধু–স্বজন এবং প্রিয়জনদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানাচ্ছি। শান্তিতে ঘুমান।’












