বারান্দার মেঝেতে স্ট্রোক রোগীর চিকিৎসা

চমকে হাসপাতালের নিউরোলজি ওয়াডে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী চট্রগ্রামে নেই বিশেষায়িত হাসপাতাল আজ বিশ্ব স্ট্রোক দিবস

জাহেদুল কবির | বৃহস্পতিবার , ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:১২ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিউরোলজি ওয়ার্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বারান্দার মেঝেতে দিতে হচ্ছে স্ট্রোক রোগীর চিকিৎসা। এসব রোগীরা হাসপাতালের জরুরি মেডিকেল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না। ওয়ার্ডের মূল ফটকের বাইরে ভর্তি দেয়ার কারণে রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এছাড়া গভীর রাতে রোগী ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অনেকবার। বিশেষ করে অনেকের মোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। অপরদিকে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে মুমূর্ষু রোগীদের সেবা দিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বেগ পেতে হয়।

নিউরোলজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এক সময় নিউরোলজি ওয়ার্ডে অফিস চলাকালীন সময় ছাড়া রোগী ভর্তি নেয়া হতো না। গত ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর থেকে নিউরোলজি ওয়ার্ডে ২৪ ঘণ্টার ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে ওয়ার্ডে বেশিরভাগ রোগী আসতো মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে রেফার হয়ে। স্ট্রোক রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসাটা শুরু হতো মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে। বর্তমানে হাসপাতালের ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ১৫০–১৭০ জন রোগী ভর্তি থাকছে। ওয়ার্ডে অনুমোদিত বেড রয়েছে ৮৫টি। এরমধ্যে বেড বসানো হয়েছে ৯০টি। বাকি রোগীদের বারান্দার মেঝেতে ভর্তি দিতে হয়।

নিউরোলজিস্টরা জানান, দুই ধরনের স্ট্রোক রয়েছে। একটি হলো ইসকেমিক স্ট্রোক। এর ফলে মস্তিস্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেধে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া আরেকটি হলো হেমোরেজিক স্ট্রোক। এই স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি বছর বাড়ছে স্ট্রোক রোগীর সংখ্যা। চমেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা সীমিত সম্পদের মাঝেও স্ট্রোক রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে চট্টগ্রামে স্ট্রোকের চিকিৎসায় কোনো বিশেষায়িত হাসপাতাল না থাকার হতাশাও ঝরেছে চিকিৎসকদের কণ্ঠে। তারা জানান, রাজধানীতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে স্ট্রোকের ভালো মানের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। সে তুলনায় চট্টগ্রামে স্ট্রোক আক্রান্ত রোগীদের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালই একমাত্র ভরসা।

চিকিৎসকদের মতে, বয়স বাড়ার সাথে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। নারীদের তুলনায় পুরুষেরা স্ট্রোক বেশি আক্রান্ত হন। আফ্রিকান ও এশিয়ানদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। এছাড়া পুরনো হার্টের রোগীদের স্ট্রোকে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে বংশগত কারণেও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। স্ট্রোক থেকে রক্ষা পেতে হলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ধুমপান বর্জন, কেলেস্টেরলমুক্ত খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, হার্টের অসুখের চিকিৎসাসহ দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করতে হবে। মূলত স্ট্রোকের উপসর্গ ও লক্ষণের ওপর নির্ভর করে রোগী কোন ধরনের স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছে। মস্তিস্কের বড় রক্তনালি আক্রান্ত হয়ে বৃহত্তর অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগী দীর্ঘদিন অজ্ঞান থাকতে পারেন। এছাড়া বিভিন্ন অংশে প্যারালাইসিস হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্ট্রোক হলে শরীরের যে কোনো একদিকে হাত–পা ও মুখমণ্ডল প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের ভেতর স্ট্রোকটা যদি বামদিকে হয়, তা হলে ডানদিকের হাত–পা এবং ডানদিকে স্ট্রোক হলে বাঁমদিকের হাত–পা প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। মূলত মস্তিষ্কের যে যে অংশ শরীরের যে যে অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, সেই সেই অংশ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে শরীরের ওই স্থানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। রোগের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো রোগী থেকে রোগী ভিন্নতর হতে পারে।

চমেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই এক বছরে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬ হাজার ২২৯ জন। তবে স্ট্রোক ছাড়াও স্নায়ুসহ অন্যান্য রোগে মোট চিকিৎসা নিয়েছেন ১১ হাজার ২৫৩ জন।

চমেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রিফাত কামাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, স্ট্রোকের হার বর্তমানে বাড়ছে। তবে এখন আমাদের ওয়ার্ডে চিকিৎসা ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে। নিউরোলজি ওয়ার্ডে কোনো রোগী স্ট্রোক আক্রান্ত হওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যে যদি আসে, তবে আমরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আইভি থ্রম্বোসিসের মাধ্যমে মস্তিস্কের রক্তনালীতে যে অংশে রক্তজমাট হয়েছে, সেটি পুরোপুরি নিরাময় করতে পারি। গত এক বছরে ২৪ জন রোগীকে আইভি থ্রম্বোসিস দিয়েছি। অধিকাংশ রোগী সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।

তিনি আরো বলেন, নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের মাধ্যমে স্ট্রোক অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষ করে খাদ্যাভাসের দিকেও খেয়াল রাখা উচিত। কিছু কিছু খাদ্য স্ট্রোকের জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী। এরমধ্যে রয়েছে চিংড়ি, মাখন, দুধের স্বর, পান, সিগারেট ও তামাকজাতীয় যেকোনো পণ্য। অপরদিকে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় আঁশযুক্ত শাক সবজির রাখার পাশাপাশি মৌসুমী ফলমূল খেতে হবে। গরু ও খাসির মাংস খাওয়ার পরিমান কমাতে হবে। এছাড়া সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন ২০ মিনিট করে ব্যায়াম করতে হবে। অলস জীবন যাপন ও ফাস্টফুড জাতীয় খাবার অবশ্যই বর্জন করতে হবে।

চমেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল আলম খন্দকার দৈনিক আজাদীকে বলেন, গত দশ বছরের সাথে যদি তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে রোগের প্রকোপ বাড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেডিকেলের নিউরোলজি ওয়ার্ডে সেবার মানও বেড়েছে। স্ট্রোকের আক্রান্ত রোগী এখন ওয়ার্ড ছাড়িয়ে বারান্দাসহ এমনকি ওয়ার্ডের বাইরেও ভর্তি দিতে হচ্ছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের নোয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, কুমিল্লা, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলার স্ট্রোক আক্রান্ত রোগীদের জন্য একমাত্র ভরসা এই চট্টগ্রাম মেডিকেল। আমাদের সম্পদ সীমিত। এই সীমিত সম্পদের মধ্যেও আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ দিয়ে আসছি। ফলে মৃত্যুহারও কমেছে। তবে চট্টগ্রামে যদি স্ট্রোকের চিকিৎসায় একটি মানসম্মত বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা সম্ভব হয়, এক্ষেত্রে চমেক হাসপাতালের ওপর চাপটাও কমে যাবে। বর্তমানে মোট শয্যার প্রায় তিনগুণ রোগী ভর্তি থাকছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউন্নত বাংলাদেশ গড়তে প্রবাসী-দেশবাসীকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
পরবর্তী নিবন্ধদূষণ রোধে কক্সবাজারে সৈকতে ১২ ‘বর্জ্যমানবের’ বিচরণ