বাইশারীতে শিশুর মৃত্যু, থানচিতে শতাধিক পর্যটক উদ্ধার । বান্দরবান ও সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, চন্দ্রঘোনা-রাইখালী ফেরি চলাচল বন্ধ সড়ক প্লাবিত হয়ে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

টানা বর্ষণে তিন পার্বত্য জেলায় দুর্ভোগ

আজাদী ডেস্ক | বুধবার , ৮ জুলাই, ২০২৬ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে দেশের তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে বন্যা, পাহাড় ধস ও যোগাযোগ বিপর্যয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বান্দরবানে পাহাড়ধস হয়েছে ও পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, থানচিতে আটকে পড়া শতাধিক পর্যটককে উদ্ধার করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র এবং রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন সড়ক ও ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় তিন জেলার একাধিক স্থানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

বান্দরবান : জেলায় টানা বর্ষণে রুমাথানচি, লামাসুয়ালকসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়কে ছোটখাটো পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলা শহরের বালাঘাটা, কালাঘাটা, ইসলামপুর, বনরূপাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাইশারীতে রাঙ্গাঝিরি ছড়ার তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে আলিয়া সোলতানা () নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ায় থানচি উপজেলার তীন্দুরেমাক্রী এলাকায় আটকে পড়া শতাধিক পর্যটককে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে উদ্ধার করে থানচি সদরে আনা হয়। পরে তাদের সড়কপথে বান্দরবান জেলা শহরের উদ্দেশে পাঠানো হয়। থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহআলফয়সাল বলেন, ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু নদীর পানি বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটকেরা আটকা পড়েছিলেন। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তাদের উদ্ধার করা হয়। তবে থানচি উপজেলা ট্যুরিস্ট গাইড সমিতির সাধারণ সম্পাদক ক্লাইমেন ত্রিপুরা জানান, নাফাকুমে ৬৯ জন এবং জিন্নাপাড়ায় তিনজন গাইডসহ ২১ জন পর্যটক এখনও অবস্থান করছেন। এছাড়া থানচির আরও বিভিন্ন স্থানে পর্যটক আটকে থাকতে পারেন।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। জেলার সাতটি উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরি নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলা শহরের উজানীপাড়া ও মধ্যমপাড়াসহ নদীতীরবর্তী এলাকার বহু ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। বান্দরবান আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সন্তোষ মণ্ডল বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত জেলায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গত ছয় ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলেও পাহাড় ধসের ঝুঁকি থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝর্ণা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটক, ট্যুর অপারেটর এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী ও পাহাড়ধসঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।

রাঙামাটি : রাঙামাটিতেও ভারী বর্ষণ ও পাহাড় ধসের আশঙ্কায় গতকাল সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এ সময়ে সাজেকের সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝর্ণা, পাহাড়ি ট্রেইল, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটক, ট্যুর অপারেটর এবং সর্বসাধারণের ভ্রমণ নিষিদ্ধ থাকবে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে কর্ণফুলী নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে গতকাল বিকেল ৩টা থেকে চন্দ্রঘোনারাইখালী নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে রাঙামাটির সঙ্গে বান্দরবানের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। নদীর স্রোতের পরিস্থিতি বিবেচনা করে পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়িতেও টানা বর্ষণে জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে খাগড়াছড়িরাঙামাটি সড়কের মহালছড়ি উপজেলার চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালা এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এছাড়া দীঘিনালালংগদু সড়কের মেরুং হেডকোয়ার্টার এলাকা প্লাবিত হওয়ায় লংগদুর সঙ্গেও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

জেলার চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ বিভিন্ন খালছড়ার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলা সদর, মহালছড়ি ও দীঘিনালার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বন্যা ও পাহাড় ধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূতি চাকমা বলেন, মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এদিন দুপুর পর্যন্ত জেলার কোথাও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেনি।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। শুকনো খাবার, সুপেয় পানি এবং আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বন্যার আশঙ্কাপ্রবণ এলাকার বিদ্যালয়গুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবহির্নোঙরে পণ্য খালাস বন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধআত্মগোপনে গিয়ে অপহরণ নাটক, জিডির পর উদ্ধার ঋণগ্রস্ত যুবক