প্রবাহ

শক্ত হাতে দেশের হাল ধরুন, দুর্নীতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ

গত ক’বছর থেকে দেশে ফেসবুক ইউটিউবে আমলাতন্ত্র নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা সমালোচনা চলমান। মাত্র ১৮/২০ বছর আগেও স্মার্টফোন বা এন্ড্রয়েড ফোনের প্রচলন ছিল না বিধায় হয়ত এ আলোচনা সাধারণ জনগণের জানার বাইরে ছিল। অবসরে যাওয়া একজন ঝানু আমলা হয়তো তিনি অতীব সৎ ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। অন্যান্যদের চেয়ে তিনি হয়তোবা তাদের সরকারী কর্মকর্তাদের নিয়ে আলোচনা করছেন বেশি। সরকার পরিবর্তন হবে কিন্তু সরকারী কর্মকর্তারা তাদের চাকুরীতে বহাল থাকবে।

আমলা বিষয়ে আরেকটু খোলাসা করে বলতে গেলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বিবিএসই বলতে হয়। যারা সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে দেশের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মূল নিয়ন্ত্রক হল সরকার। যে সরকার ক্ষমতায় আসবে সেই সরকারই আমলাদের সহযোগিতা নিয়ে দেশ পরিচালনা করবে।

অবসরে যাওয়া ঐ ঝানু কর্মকর্তা আরও বলেন, আমলাদের মধ্যে অধিকাংশ সৎ নয়, তার মূলে সরকারই দায়ী। সরকার সৎ না হলে আমলারা সৎ তাকে কী করে!

আমাদের দেশের জন্য বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। সরকারী দলের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী যদি সৎ না হয়; তাহলে তাদের কারণে আমলাদের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সততা রক্ষা হয় না । যা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলা যাবে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এর নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)।

তারও আগে ২৩ বছরের পাকিস্তান শাসনে এই আমলাতন্ত্র দুইভাগে ভাগ করা ছিল। একটা হল জাতীয়, আরেকটি প্রাদেশিক। জাতীয় পর্যায়কে বলা হত সিভিল সার্ভিস পাকিস্তান (সিএসপি)। আর আমাদের প্রাদেশিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নাম দেয়া হয়েছিল ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (ইপিসিএস)। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার উভয় ক্যাটাগরীতে একীভূত করে। আমলাতন্ত্র দেশ পরিচালনায় সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে ইহা দেশের অতীব গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি।

ব্রিটেনে এর উৎপত্তি বলা যেতে পারে। তবে ভারতবর্ষে আমলাতন্ত্রের উৎপত্তি হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মাধ্যমে।

গ্রহণযোগ্য মতে সিভিল সার্ভিসের জন্ম হয় ১৬০১ সালে। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর দি গভর্নর এ্যান্ড কোম্পানি অব মার্চেন্টস অব লন্ডন ট্রেডিং ইন্টু দি ইস্ট ইন্ডিজ নামধারী লন্ডনের এক বণিক গোষ্ঠী রানী এলিজাবেথের নিকট থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় বাণিজ্য করার সনদ লাভ করে। ১৭০৯ সালে সে বণিক গোষ্ঠী আরও কতিপয় বণিক সমিতির সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় নতুন এক সংগঠন তৈরি করে। ইহার নামকরণ করা হয় “ইউনাইটেড কোম্পানি অব মার্চেন্ট অব ইংল্যান্ড ট্রেডিং ইন্টু দি ইস্ট ইন্ডিজ। ১৮৩৩ সালে সে কোম্পানিকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৬০১ সালে ব্যবসার উদ্দেশ্যে এ ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করে। কোম্পানীর উদ্দেশ্যে ছিল প্রাচ্যে ব্যবসা পরিচালনা করা। সেই লক্ষে তারা স্থানীয় নেতাদের অনুমতি সাপেক্ষে বাণিজ্য কেন্দ্র বা কুঠি স্থাপন করত। সাগরে আত্মরক্ষার জন্য তারা যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ বিগ্রহকে এড়িয়ে চলত। ১৭৪০ সাল পর্যন্ত কোম্পানীর অধিকারী ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূ–খন্ড। বাংলায় কলকাতায় অবস্থান ৩টি গ্রাম। এ সময় কোম্পানী পর্যায়ক্রমে ৪টি দুর্গ নির্মাণ করে।

১৭৫৭ সালে পলাশি যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর কোম্পানী ভারতে এক স্থায়ী সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে। এ সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী মীর জাফরকে সুবেদার তথা গভর্নর নিযুক্ত করে। এ মাসই কোম্পানী দিল্লির বাদশাহ শাহ আলম হতে বাৎসরিক ২৬ লাখ টাকার বিনিময়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা দেওয়ানী অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করে। ১৭৭৩ সাল থেকে কোম্পানী দেওয়ানী অধিকার প্রাপ্ত অঞ্চলে শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৭৭৭ সালে কলকাতা নগরীতে তাদের প্রশাসনিক কাজের জন্য প্রকান্ড দালান নির্মান করে। তাকে ডৎরঃবৎং ইঁরষফরহম বলা হয়। যার বর্তমান নাম মহাকরণ। ইহা ভারতবর্ষের মধ্যে অন্যতম প্রকান্ড প্রশাসনিক দালান হিসেবে আজও খ্যাতিমান। পরবর্তীতে ভারতবর্ষের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যায়।

১৮৩৩ সালে কোম্পানীর বাণিজ্যিক ক্ষমতা বিলুপ্ত করে একে শাসন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর পর কোম্পানীর সকল ক্ষমতা ব্রিটিশ রাজ্যের নিকট ন্যস্ত হয়। ফলে ১৬০১ সালের গর্ভনর এ্যান্ড কোম্পানী অব লন্ডন সপরিষদ ভারতীয় সেক্রেটারী অব স্টেটে রূপান্তরিত করা হয়। আর ব্যবসায়িক নেতৃত্ব দানকারী ও তাদের কর্মচারীরা সংগঠিত হয়ে উঠে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে।

ভারতীয় সিভিল সার্ভিস মূলত তিনটি পর্বে বিকশিত হয়।

(১) ১৬০১–১৭৭২ সাল পর্যন্ত। এ পর্বে কোম্পানীর মূল কার্যক্রম ছিল ব্যবসা পরিচালনা করা। তবে মাঝে মাঝে কোম্পানির কর্মচারীদের শাসনকার্য পরিচালনা করতে হয়েছে।

(২) ১৭৭২–১৮৫৫ সাল পর্বে কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনা গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে।

(৩) ১৮৫৬–১৯৪৭ সাল পর্বে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস এক দক্ষ শাসন ব্যবস্থায় রূপ লাভ করে।

ব্রিটিশরা ১৭৬৫ সাল থেকে ভারতবর্ষে পর্যায়ক্রমে রাজস্ব আদায়সহ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দিকে এগিয়ে যায়। এ সালে অবিভক্ত বাংলাকে ২২ জেলায় বিভক্ত করে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে। প্রতি জেলায় একজন করে কালেক্টর নিযুক্ত করে। বর্তমান জেলা প্রশাসকের পদবী সেই সময় কালেকক্টর বলা হয়। তার আগে নায়েব দেওয়ান রাজস্ব আদায় করত।

১৮২৯ সালে জেলা কার্যক্রম তদারকির সুবিধার্থে বিভাগীয় কমিশনার পদ সৃষ্টি করে। এসব কিছুতে ওয়ারেন হেস্টিংস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি ভারতের গর্ভনর নিযুক্ত হওয়ার পর প্রত্যেক জেলায় একটি দেওয়ানী ও একটি ফৌজদারী আদালতের ব্যবস্থা করেন।

ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে ১৮৫৩ সালে অবাধ প্রতিযোগিতা ভিত্তিক নিয়োগ কার্যক্রম প্রবর্তিত হয়। প্রতিযোগিতা ভারতীয়দের খুশি করতে হলেও ব্রিটিশরা কৌশল করে, যাতে ভারতীয়রা সহজে সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করতে না পারে। অর্থাৎ সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা হবে লন্ডনে। ফলে ভারতীয়দের পক্ষে দীর্ঘ সাগর পথ অতিক্রম করে লন্ডন পৌঁছা সহজ ছিল না। ১৮৬৪ সালে একজন ভারতীয় ছাত্র শ্রী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সিভিল সার্ভিসে নিযুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। ১৮৭১ সালে এসে ৩ জন মাত্র ভারতীয় এ সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত হন। এই ৩ জনই হলেন প্রথম বাঙ্গালী। ১৮৮৬ সালে সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল মাত্র ১২ জন।

এতে ব্রিটিশদের কৌশলে অসহযোগিতার কারণে ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এতে ইংল্যান্ডের পাশাপাশি ভারতেও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা অনুষ্ঠান আয়োজন এবং প্রার্থীদের বয়সসীমা বৃদ্ধি করা হয়।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৬ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশন নামে একটি কমিশন গঠন করে। এটি ব্রিটিশ ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারে বিভিন্ন চাকুরীতে নিয়োগ দানের কার্যক্রম পরিচালনা করত। ১৯১৯ ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রদেশে দায়িত্বশীল সরকার গঠিত হওয়ার পর ১৯৩৭ সালে বেঙ্গল পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ প্রদেশ পর্যায়েও অনুরূপ কমিশন গঠিত হয়।

ব্রিটিশ আমলে সিভিল সার্ভিসকে আইসিএস বলা হত। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সাথে সাথে পাকিস্তান সরকারও ভারতীয় সিভিল সার্ভিসকে দু’ভাগে ভাগ করে। ১৯৫০ সালে এসে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস নামে চিহ্নিত করে। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ব্রিটিশ ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের প্রত্যক্ষ উত্তরসূরী। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের মূল্যবোধ ও মানসিক গঠন ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের অনুরূপ।

১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সিএসপি ও ইপিসিএস দুই সিভিল সার্ভিসকে এক করে বিসিএস নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার এ বিসিএস ক্যাডারকে দেশ পরিচালনার সুবিধার্থে ২৬ টি ক্যাটাগরীতে ভাগ করে ফেলে। তৎমধ্যে ১৪ টি সাধারণ ক্যাডার ও ১২টি প্রফেশনাল ক্যাডার।

দেশে আজ খুবই কলুষিত পরিবেশ, দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। শুরুতে আলোচনা করা ঐ ঝানু আমলার যৌক্তিকতা হল সরকারই দেশের কর্ণদার। দেশ পরিচালনার জন্য তারাই নির্বাচিত বা অনির্বাচিত। তারা যদি সৎ না থাকে আমলারা সৎ তাকে কী করে। তিনি বুঝাতে চাচ্ছেন রাজনৈতিক সরকার বা সরকারী নেতাদের মাধ্যমে দেশে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করেছে। যে যেভাবে ব্যাখ্যা দিক না কেন, দেশে দুর্নীতি যে হারে বিস্তার লাভ করেছে তা এক প্রকার ভয়াবহ বলা যাবে।

গত ফেব্রুয়ারীতে সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। এই নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ হয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অতএব সরকার প্রধান জনাব তারেক রহমান শক্ত হাতে দেশের হাল ধরলে আগামী সাড়ে চার বছর দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দুর্নীতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধগ্রামীণ জনপদের মাটির ঘর-প্রজন্মের শেকড়ের নীরব স্মারক
পরবর্তী নিবন্ধবাকলিয়ায় চুলার আগুনে পুড়ল বসতঘর ও দোকান-গুদাম