বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও এবারের ঈদে কাঁচা চামড়ার বাজারে মিলেনি তার প্রতিফলন। চট্টগ্রাম শহর এবং গ্রামাঞ্চলে পানির দরে বিক্রি হয়েছে কাঁচা চামড়া। কোথাও কোথাও ক্রেতাও যায়নি। শত শত গরু–মহিষের চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। কাঁচা চামড়ার এই বেহাল দশায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এতিমখানা, মাদ্রাসা ও গরিব মানুষ। কারণ প্রতি বছর কোরবানির চামড়ার টাকায় অনেক এতিম শিক্ষার্থীর খাবার ও শিক্ষার ব্যবস্থা হয়। এবার কম দামে চামড়া বিক্রি হওয়ায় সেই অর্থও কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের লোকসানের পাশাপাশি বঞ্চিত হয়েছেন গরিব ও এতিমরাও। চট্টগ্রাম মহানগর এবং উপজেলা পর্যায়ে এবার মোট ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০টি চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।
দেশের চামড়ার বড় যোগান আসে ঈদুল আজহা থেকে। দেশে বছরে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হয়, যার ৬০ শতাংশের বেশি আসে কোরবানির মৌসুমে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ গরুর চামড়া। একসময় চামড়া শিল্পের জৌলুস থাকলেও এখন আর তা নেই। কৃত্রিম চামড়াসহ নানা প্রযুক্তি দেশের ট্যানারি শিল্পকে সংকটে ফেলেছে। গত কয়েক বছর কাঁচা চামড়া কিনে লোকসান দেওয়ায় অনেকে এবার চামড়া কিনেননি। আবার নতুন অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কিনে লোকসানের মুখে পড়েছেন।
সীতাকুণ্ডের মোহাম্মদ নুরুল আমিন নামে একজন কোরবানিদাতা বলেন, জীবনে এই প্রথম আমাদের বাড়িতে কেউ চামড়া কিনতে আসেননি। সকালে দুটি গরু কোরবানি দিয়ে সারা দিন অপেক্ষা করার পরও সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ না আসায় এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলেছি। শুধু নুরুল আমিন নন, বহু লোক চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ পানির দরে বিক্রি করেছেন।
কোরবানি এলেই পশুর চামড়া ঘিরে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা চামড়া সংগ্রহ করেন। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বাড়তি আয় হওয়ার পাশাপাশি এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলোর বছরব্যাপী খরচের একটি অংশ কোরবানির চামড়ার মূল্য দিয়ে যোগান দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি মোসলেম উদ্দিন জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম মহানগরী এবং উপজেলা পর্যায়ে দুই শতাধিক ব্যবসায়ী কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করেছেন। এর মধ্যে মহানগরীতে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯শ গরু, ৬ হাজার ৬৫০টি মহিষ এবং ১৭ হাজার ৭শ ছাগলের চামড়া মিলে মোট সংগৃহীত হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৫০টি চামড়া। ১৫টি উপজেলা পর্যায়ে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭৯০টি গরু, ৫ হাজার ৩শ মহিষ এবং ৩৬ হাজার ১শ ছাগল মিলে চামড়া সংগৃহীত হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ১৯০টি। মহানগর এবং জেলায় মোট ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০টি চামড়া সংগৃহীত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা আড়তদাররা চামড়াগুলো লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করেছি। প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে ট্যানারি পর্যন্ত পৌঁছাতে একেকটি চামড়ায় ৪৮০ টাকার মতো খরচ হয় বলে জানান তিনি।
কোরবানির পশুর চামড়ার সরকারি মূল্য নির্ধারণ থাকলেও বাস্তব বাজারে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায়নি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ট্যানারি মালিকেরা সরকার নির্ধারিত দরে চামড়া কিনেন না। সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি ফুটে অন্তত ২০ টাকা কমে তারা দর নির্ধারণ করে দেন। চট্টগ্রামে শুধুমাত্র একটি ট্যানারি থাকার ফলে এখানকার আড়তদাররা পুরোপুরি ঢাকার ট্যানারিগুলোর উপর নির্ভরশীল। ঢাকার ট্যানারিগুলো সরকার নির্ধারিত দরে চামড়া কিনলে এমন বেহাল অবস্থা হতো না উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, চামড়ার দাম না পাওয়ায় গরিব মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চামড়া বিক্রির টাকা গরিবদের মাঝে বিলি করা হয়। গরিব মানুষগুলোর হাতে কিছু টাকা আসে, যা এবার তলানিতে ঠেকেছে। এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২শ টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত একটি চামড়া বিক্রি হয়েছে।
চামড়ার বাজার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক মানুষ। তারা জানান, ২৫–৩০ বছর আগে একটা চামড়া বিক্রি করেছি ২৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ওই সাইজের গরুর চামড়া এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়।
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার কাঁচা চামড়ার দাম কমলেও লবণ, রাসায়নিক, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও চাপে রয়েছেন। একেকটি চামড়ায় লবণ দেওয়া থেকে শুরু করে পরিবহন করা পর্যন্ত প্রচুর খরচ হচ্ছে। ট্যানারিগুলো চামড়া নেওয়ার সময় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাদ দিয়ে দেয়। এখন ট্যানারি মালিকেরা সরকার নির্ধারিত দরে চামড়া না কিনলে এই খাতের সাথে জড়িত আড়তদার এবং ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির কবলে পড়বেন।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলেন, ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির সুযোগ না থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমেছে এবং এর প্রভাব পড়ছে দামে। ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি থাকলে বাজারে এতটা দরপতন হতো না। আগে বিদেশি ক্রেতারা সরাসরি কিনতেন। এখন সেই সুযোগ নেই। তারা বলেন, চামড়া শিল্পকে টেকসই করতে হলে প্রান্তিক বিক্রেতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে একই ধরনের অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা দেবে।
চামড়া বিক্রি না হওয়া এবং মাটিতে পুঁতে ফেলা প্রসঙ্গে কয়েকজন আড়তদার জানান, এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা প্রতি বছর ঘটে। তবে এখন পর্যন্ত প্রচুর চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার বেশি চামড়া সংগৃহীত হয়েছে উল্লেখ করে তারা বলেন, ওয়েদার ভালো থাকায় আমরা লবণ দিয়ে সবগুলো চামড়া প্রস্তুত করে রেখেছি।
৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে চামড়া কিনেছেন উল্লেখ করে তারা বলেন, এর সঙ্গে লবণ, পরিবহন, শ্রমিক এবং আড়তের খরচ যোগ করলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি পড়ে যাবে। এখন ট্যানারি মালিকেরা যদি নির্ধারিত দরে চামড়া না কিনে নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট করে নেন, তাহলে এই ব্যবসায় আর কেউ এগিয়ে আসবে না। সামনে আরো খারাপ দিনের অপেক্ষা করতে হবে।
সরকার এবার চামড়ার দাম প্রতি ফুটে ২ টাকা করে বাড়িয়েছে। ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরি ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে কার্যকর হবে।
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, ছোট আকৃতির একটি গরুতে ২০/২১ ফুট এবং বড় আকৃতির গরুতে ৩৫/৪০ ফুট চামড়া হয়। একটি মহিষেও ৩৫/৪০ ফুট এবং ছাগলে ৪ ফুটের মতো চামড়া পাওয়া যায়।












