দৈনিক আজাদী, আমাদের আজাদী

এ এস এম আবদুল গাফফার মিয়াজী | সোমবার , ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ

বাংলার সংবাদপত্রের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু একটি পত্রিকার পরিচয় বহন করে না; বরং তারা হয়ে ওঠে একটি জনপদ, একটি সংস্কৃতি এবং একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। দৈনিক আজাদী তেমনই একটি নাম। চট্টগ্রামের মানুষের কাছে আজাদী শুধু একটি সংবাদপত্র নয়, এটি আবেগ, ঐতিহ্য, বিশ্বাস এবং আপন অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান। তাই চট্টগ্রামের মানুষ ভালোবেসে বলে ‘দৈনিক আজাদী, আমাদের আজাদী।’

১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে দৈনিক আজাদীর যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকের দূরদর্শী উদ্যোগে প্রকাশিত এই পত্রিকা সময়ের পরিক্রমায় চট্টগ্রামের মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আজাদীর লক্ষ্য ছিল সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি মানুষের কথা বলা, সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা এবং চট্টগ্রামের স্বার্থ ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া।

একটি আঞ্চলিক সংবাদপত্রের জন্য ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের আস্থা ধরে রাখা সহজ বিষয় নয়। কিন্তু দৈনিক আজাদী সেই কঠিন পথ অতিক্রম করেছে দৃঢ়তা, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা এবং পাঠকের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের মাধ্যমে। আজ এটি শুধু চট্টগ্রামের নয়, বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প : দৈনিক আজাদীর জন্ম হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন সংবাদপত্র ছিল সমাজের বিবেক ও জনমতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। চট্টগ্রাম ছিল ব্যবসাবাণিজ্য, বন্দর, শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চট্টগ্রামের স্থানীয় সমস্যা, সম্ভাবনা ও মানুষের জীবনযাত্রার খবর জাতীয় পরিসরে সবসময় যথাযথ গুরুত্ব পেত না। এই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম থেকে একটি শক্তিশালী দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। সেই প্রয়োজন থেকেই আজাদীর জন্ম। প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকের স্বপ্ন ছিল এমন একটি সংবাদপত্র তৈরি করা, যা চট্টগ্রামের মানুষের কথা বলবে এবং একই সঙ্গে জাতীয় ঘটনাপ্রবাহকে পাঠকের সামনে তুলে ধরবে। সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে আজাদী হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের ঘরে ঘরে পরিচিত একটি নাম।

ভাষা ও মুক্তির সংগ্রামে আজাদী : বাংলার ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। ভাষার অধিকার থেকে শুরু করে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রাম, প্রতিটি পর্যায়েই সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দৈনিক আজাদীও সেই ইতিহাসের বাইরে ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি, মানুষের অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে আজাদীর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালির জাতীয় চেতনার বিকাশে সংবাদপত্রের যে ভূমিকা, আজাদী তার নিজস্ব অবস্থান থেকে সেই দায়িত্ব পালন করছে এবং আগামীতে করবে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদপত্রের ওপর নানা ধরনের চাপ ও সীমাবদ্ধতা ছিল। তবুও মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বিজয়ের স্বপ্নকে ধারণ করে সংবাদমাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজাদীর ইতিহাসও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে পথচলা শুরু করে, তখনও আজাদী মানুষের পাশে থেকেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক পরিবর্তন এবং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন, সবকিছুরই প্রতিফলন ঘটেছে এর পাতায় এবং দৈনিক আজাদী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকার গৌরবোজ্জ্বল সম্মান বহন করে আসছে।

চট্টগ্রামের কণ্ঠস্বর : দৈনিক আজাদীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি চট্টগ্রামের মানুষের কথা বলে। চট্টগ্রামের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ব্যবসাবাণিজ্য, শিক্ষা, শিল্প, বন্দর, পাহাড়, সমুদ্র এবং মানুষের জীবনযাত্রা, সবকিছুকে সংবাদ ও লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেছে। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল, ব্যবসাবাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম। এই অঞ্চলের উন্নয়ন, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে আজাদীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামের রাস্তা, জলাবদ্ধতা, যানজট, বন্দর, শিল্প, পরিবেশ, পর্যটন, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, বিভিন্ন জনস্বার্থের বিষয় নিয়ে আজাদী দীর্ঘদিন ধরে সংবাদ প্রকাশ করেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পত্রিকাটি শুধু সংবাদ প্রকাশ করেনি; বরং জনমত তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে।

সাংবাদিকতার নিজস্ব ঐতিহ্য : আজাদীর দীর্ঘ পথচলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সাংবাদিকতার ঐতিহ্য। সংবাদপত্রের মূল দায়িত্ব সত্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরা। সেই দায়িত্ব পালনে সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে আজাদী নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছে এবং লেঁজুড়ভিত্তিক সাংবাদিকতা থেকে দূরে থেকেছে আজাদী। একটি সংবাদপত্রের পাঠকই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আজাদীর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চট্টগ্রামের মানুষ সকালে হাতে তুলে নিয়েছে আজাদী। বাবা পড়েছেন, সন্তান পড়েছে; একসময় সেই সন্তানের সন্তানও আজাদীর পাঠক হয়েছে। এভাবেই একটি পত্রিকা কেবল সংবাদপত্র থাকে না, পরিণত হয় পারিবারিক ঐতিহ্যে।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান : সংবাদপত্র শুধু খবরের বাহক নয়; এটি সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও পৃষ্ঠপোষক। দৈনিক আজাদীর পাতায় দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসচর্চার নানা বিষয় স্থান পেয়েছে। চট্টগ্রামের বহু লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের লেখালেখির ক্ষেত্র তৈরিতে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আজাদীও এই সাংস্কৃতিক ধারাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে এবং চট্টগ্রামসহ সারাদেশে অনেক কবি সাহিত্যিক সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামের নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও আজাদীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। একটি অঞ্চলের ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না; সংবাদপত্রের পুরোনো সংখ্যাগুলোও হয়ে ওঠে সেই সময়ের জীবন্ত দলিল। আজাদীর দীর্ঘ প্রকাশনা ইতিহাস তাই ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্যও মূল্যবান সম্পদ।

মানুষের সুখদুঃখের সঙ্গী : আজাদীর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত এখানেই, এটি মানুষের সুখদুঃখের সঙ্গী। সমাজের সাধারণ মানুষের সমস্যা, প্রত্যাশা, সাফল্য ও বঞ্চনার গল্প সংবাদপত্রের পাতায় উঠে এসেছে। কোনো এলাকার রাস্তা ভাঙা, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা, কোনো মানুষের অধিকারবঞ্চনা কিংবা কোনো তরুণের সাফল্য, সবকিছুরই জায়গা হয়েছে আজাদীর পাতায়। আবার চট্টগ্রামের মানুষ যখন কোনো অর্জনে গর্বিত হয়েছে, কোনো সাফল্যে আনন্দিত হয়েছে কিংবা কোনো সংকটে পড়েছে, তখনও আজাদী সেই অনুভূতিকে ধারণ করেছে। এই কারণেই আজাদীর সঙ্গে পাঠকের সম্পর্ক কেবল সংবাদপাঠের সম্পর্ক নয়; এটি এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক।

সময় বদলেছে, আজাদীও বদলেছে : প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সংবাদপত্রের জগতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একসময় ছাপা কাগজই ছিল সংবাদ জানার প্রধান মাধ্যম। এখন অনলাইন সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস বদলে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের যুগে একটি ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ঐতিহ্য ধরে রেখে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। আজাদীও সেই পরিবর্তনের ধারায় এগিয়ে চলেছে। তবে প্রযুক্তি বদলালেও সংবাদপত্রের মূল শক্তি বদলায় না। সেই শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। দ্রুত সংবাদ পাওয়া যায় অনেক জায়গায়, কিন্তু নির্ভরযোগ্য সংবাদ পাওয়ার জন্য মানুষের আস্থা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য সেই আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আমাদের আজাদী’ : কেন চট্টগ্রামের মানুষ আজাদীকে ‘আমাদের আজাদী’ বলে? কারণ আজাদী কোনো দূরের প্রতিষ্ঠান নয়। এটি চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সঙ্গে বেড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রামের মানুষের আনন্দবেদনা, আশাহতাশা, সংগ্রামসাফল্য এবং স্বপ্নের সঙ্গে এর পথচলা। একটি সংবাদপত্রের জন্য এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে, যখন পাঠক তাকে নিজের বলে মনে করে! আজাদী তাই শুধু একটি নাম নয়; এটি একটি ইতিহাস। এটি চট্টগ্রামের সাংবাদিকতার ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি বহু প্রজন্মের স্মৃতি। এটি একটি জনপদের কণ্ঠস্বর।

ভবিষ্যতের পথে দৈনিক আজাদী : দৈনিক আজাদীর সামনে আগামী দিনের পথ আরও দীর্ঘ। সংবাদমাধ্যমের ধরন বদলাচ্ছে, পাঠকের চাহিদা বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। কিন্তু সত্য, ন্যায়, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের পাশে থাকার সাংবাদিকতার প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না। আগামী দিনে আজাদী আরও আধুনিক হবে, ডিজিটাল মাধ্যমে আরও বিস্তৃত হবে, নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে পৌঁছাবে,এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে তার ঐতিহ্য, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক অটুট থাকবে,এটাই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। দৈনিক আজাদী আমাদের শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমানের সঙ্গী এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে যে পত্রিকা চট্টগ্রামের মানুষের কথা বলেছে, তাদের সুখদুঃখের সাক্ষী হয়েছে এবং ইতিহাসের নানা বাঁকে পাশে থেকেছে, তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবেই গভীর।

আজাদী তাই শুধু একটি দৈনিক পত্রিকার নাম নয়, আজাদী চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়। আর সেই কারণেই আজও ভালোবাসা ও গর্বের সঙ্গে বলা যায় ‘দৈনিক আজাদী, আমাদের আজাদী।’

লেখক: পরিচালক, রিহ্যাব, কোচেয়ারম্যান (), চট্টগ্রাম রিজিওনাল কমিটি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইস্ট ডেল্টা হোল্ডিংস লিঃ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআঁরার আজাদী