চিঠি আসে না, ডাকপিয়নও আসে না,
তবু কেন মন যে মানে না।
জানালাতে বসে থাকি,
তোমার পথের খবর রাখি
তুমি আসো না, চিঠিও আসে না।
একসময় দূরত্ব মানেই ছিল অপেক্ষা। প্রবাসে থাকা সন্তানের চিঠির জন্য মা–বাবা অপেক্ষা করতেন দিনের পর দিন। দূর শহরে কর্মরত স্বামীর চিঠি ছিল স্ত্রীর কাছে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় স্মারক। হোস্টেলে থাকা সন্তানের হাতে লেখা কয়েকটি লাইনই হয়ে উঠত পরিবারের আনন্দের কারণ। কোনো চিঠিতে থাকত ঈদের শুভেচ্ছা, কোনো চিঠিতে বাড়ির খবর, কোথাও লেখা থাকত গ্রামের কার বিয়ে হলো, কার অসুখ হয়েছে কিংবা ফসলের অবস্থা কেমন। আর প্রেমের চিঠি ছিল একেবারেই অন্য এক জগৎ। একটি চিঠি লেখার আগে কতবার যে কাগজ ছেঁড়া হতো, কতবার একটি বাক্য কেটে আবার লেখা হতো, তার হিসাব নেই। শেষ পর্যন্ত খামে ভরে ডাকবাক্সে ফেলে দেওয়ার পর শুরু হতো আরেক অপেক্ষা। উত্তর আসবে তো।
তখন ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই থমকে যেত একটি বাড়ি। উঠোন পেরিয়ে তিনি যখন হাতে তুলে দিতেন কাঙ্ক্ষিত খামটি, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যেত সময়। কেউ ছুটে যেত চিঠি হাতে নিয়ে ঘরের কোণে। কেউ চোখের সামনে ধরে পড়ত প্রিয়জনের হাতের লেখা। কেউ আবার অক্ষর চিনতে না পেরে আশপাশে পড়তে জানা কারো কাছে গিয়ে কিংবা ডাকপিয়নকেই বলত ‘পড়ে শোনান’। সেই কয়েকটি পাতায় কখনো থাকত প্রবাসী সন্তানের খবর, কখনো মায়ের জন্য সন্তানের আকুতি, কখনো স্বামীর ভালোবাসা, কখনো দূর শহরের সংসারের টুকরো টুকরো গল্প। একটি চিঠি তখন একটি পরিবারের কাছে হয়ে উঠত পুরো একটি পৃথিবী।
কিন্তু সময় বদলেছে। বদলে গেছে মানুষের যোগাযোগের ধরনও। একসময় একটি চিঠি পৌঁছাতে কয়েক দিন, কখনো কয়েক সপ্তাহ সময় লাগত। এখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা মানুষটির কাছে মুহূর্তেই পৌঁছে যায় ছবি, ভিডিও, কন্ঠস্বর কিংবা কয়েক লাইনের বার্তা। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ই–মেইল কিংবা ভিডিও কল মানুষের দূরত্বকে প্রায় মুছে দিয়েছে। একটি মোবাইল ফোনেই এখন মানুষের ডাকঘর। চিঠি লেখার জন্য কাগজ–কলম লাগে না, খাম লাগে না, ডাকটিকিট লাগে না, ডাকবাক্স খুঁজতে হয় না। ফলে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমেছে। অনেক তরুণ–তরুণী হয়তো জীবনে হাতে লেখা ব্যক্তিগত চিঠিই লেখেনি। তাদের কাছে চিঠি মানে পরীক্ষার খাতা, সরকারি নোটিশ কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজ। অথচ একটি প্রজন্মের কাছে চিঠিই ছিল প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগের সবচেয়ে আবেগঘন মাধ্যম।
সময়ের সাথে হয়তো হাতে লেখা চিঠি আরও দুর্লভ হয়ে উঠবে। ডাকপিয়নের অপেক্ষাও একদিন হয়তো কেবল গল্পে শোনা যাবে। কিন্তু পুরোনো একটি খাম খুললে যে অনুভূতি জেগে উঠে, সেটি কোনো ‘নোটিফিকেশন’ দিতে পারে না। মোবাইলের স্ক্রিনে লেখা ‘ভালো থেকো’ আর প্রিয় মানুষের হাতের লেখায় লেখা ‘ভালো থেকো’ দুটি বাক্যের অর্থ একই হতে পারে। কিন্তু অনুভূতি এক নয়। কারণ চিঠির সাথে পৌঁছে যেত মানুষের হাতের স্পর্শ। তাই পুরোনো চিঠির মূল্য তাই আজও কমেনি। অনেক বাড়িতে এখনো কাঠের বাক্স, পুরোনো আলমারি কিংবা বইয়ের পাতার ভাঁজে যত্ন করে রাখা আছে কয়েক দশক আগের চিঠি। কাগজ হলদে হয়ে গেছে, কালির দাগ ফিকে হয়েছে, অনেক চিঠির লেখক হয়তো আজ পৃথিবীতেই নেই। কিন্তু তার হাতের লেখা রয়ে গেছে। একটি পুরোনো চিঠি হাতে নিলে শুধু কিছু শব্দ পড়া হয় না, ফিরে আসে একটি সময়, একটি সম্পর্ক, একটি মানুষ। ডিজিটাল বার্তা মুছে যেতে পারে, ফোন বদলে যেতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু একটি চিঠি বছরের পর বছর ধরে মানুষের স্মৃতি হয়ে টিকে থাকতে পারে।
আধুনগর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল খালেক জানান, চিঠি ছিল একসময় মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে আপন ভাষা। একটি চিঠির জন্য মানুষ দিনের পর দিন, কখনো মাসের পর মাস অপেক্ষা করত। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্ট শুনলেই বুকের ভেতর কেমন যেন আনন্দের ঢেউ উঠত। এই বুঝি এলো প্রিয় মানুষের চিঠি। একটি খাম হাতে পাওয়ার পর তার ভাঁজ খুলতে খুলতে যে আবেগ, যে শিহরণ, তা আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল বার্তায় অনুভব করা কঠিন। চিঠির প্রতিটি অক্ষরে মিশে থাকত মানুষের ভালোবাসা, অভিমান, বিরহ আর না বলা কথাগুলো। আজ প্রযুক্তি যোগাযোগকে সহজ ও দ্রুত করেছে। কিন্তু কেড়ে নিয়েছে অপেক্ষার সেই মায়া। তাই চিঠি হারিয়ে গেলেও তার স্মৃতি মানুষের হৃদয় থেকে হারিয়ে যাবে না। বরং পুরোনো কোনো চিঠির হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ আজও অনেকের কাছে একটি সময়, একটি মানুষ এবং এক টুকরো ভালোবাসার জীবন্ত স্মৃতি হয়ে আছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের ভূখন্ডে আধুনিক ডাকব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। ১৮৫৪ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক ডাকব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের পর এ অঞ্চলেও ডাকঘরের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আমলে এটি পাকিস্তান ডাক বিভাগের অধীনে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ নিজস্ব কাঠামোয় যাত্রা শুরু করে। সময়ের সাথে চিঠির পাশাপাশি মানি অর্ডার, পার্সেল, ইএমএস, সঞ্চয় ও বিভিন্ন আর্থিক সেবা যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ডাক বিভাগের অধীনে ৯ হাজার ৮০০ এর বেশি ডাকঘর প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমেও মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
আজ বিশ্ব ডাক দিবস। প্রতিবছর ৯ অক্টোবর ফিরে আসে ডাকঘর, ডাকপিয়ন আর চিঠির সেই পুরোনো পৃথিবীকে স্মরণ করিয়ে দিতে। ১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের বার্নে ২২টি দেশের উদ্যোগে যে চুক্তির মাধ্যমে ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়েছিল, সেই দিনটির স্মরণেই ১৯৬৯ সালে বিশ্ব ডাক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখন বিশ্বের ১৯২টি দেশ এই আন্তর্জাতিক ডাকব্যবস্থার অংশ।











