গ্রামের নাম শান্তিপুর। কিন্তু ভূত ও জিনের জ্বালায় গ্রামবাসী অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। রাতের বেলায় ভূতেরা চারিদিক ছড়িয়ে থাকে। হাটের মানুষকে একা পেলে পথরোধ করা, কারো ঘরের চালায় ঢিল ছুঁড়ে দেয়া তাদের প্রতিদিনকার কাজ। আর জিনেরা রাতের বেলায় কম জ্বালাতন করে। এরা দিনের বেলায় মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
ঘন অন্ধকারে ভূতেরা বেশি মিশে থাকে। তাছাড়া অমাবস্যা রাতে এদেরতো পোয়াবারো। বাঁশঝাড়ের ফাঁকে, শ্মশানঘাটে এরা ঘুরে বেড়ায়। কেউ একলা পথে এসে হেঁটে যাচ্ছে, তো আমবাগানের কোনো একটি ডাল থেকে নেকি স্বরে কোন ভূত বলতে থাকে– ওলোক, তুমি দাঁড়াও! তোমার সাথে কথা আছে। কাউকে পথ আগলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। বলে, তোমার ঘাড় মটকে দেব, হি–হি–হি, কখনোবা সাদা আলখাল্লা পরা, রক্তবর্ণ একচোখা ভূত, কানাভূত, হাতির মতো গোল পায়ের ভূত পথ আগলে ধরে। লোকেরা পড়ি মরি করে পালিয়ে বাঁচে। লোকেরা তাই দলবেঁধে অন্ধকারে পথ চলে। শুধু কী তাই গভীর রাতে কারো কারো বাড়ির উঠোনে এসে ভিড় করে। কখনো নাকি স্বরে, কখনো মিহি সুরে ঘরের লোকদের নাম ধরে ডাক দেয়। কিন্তু বাড়ির বাবা মায়েদের পরামর্শে কেউ অতরাতে দরজা খুলতে ভয় পায়। কেউবা ঘুমের ঘোরে দরজা খুলে দরজার ফাঁকে কালো ভূত, সাদা ভূত, নীল ভূতের নাচ দেখে ভয়ে কান্না জুড়ে দেয়, অমনি বড়রা এসে দরজা ঠেলে বন্ধ করে দেয়।
আর জিনের কথা কী বলবো। এরা কখনো মানুষের রূপ নিয়ে এসে দাঁড়ায় ইশকুলের সামনে, হয়তো ছোট ছাত্রদের বললো–তোমাকে বাবা নিতে পাঠিয়েছে, তুমি চল, বাবা মায়েরা বলে দেন, কেউ খাবারের লোভ দেখিয়ে কিংবা অন্যভাবে নিতে চাইলে যেনো না যায়, বরং তেমন হলে স্কুলের টিচারকে জানিয়ে দেয়। সেদিন হলো কী! আকাশ থেকে দুটো ডানাঅলা জিন এসে পথের একটি শিশুকে তুলে সোজা উড়াল দিয়ে মেঘের আড়ালে চলে গেলো। এর একদিন পরে তাকে পাওয়া গেলো গ্রামের শেষে তিনরাস্তার মোড়ে। গাঁয়ের লোকেরা এর সঠিক বিহীত করতে চায়। কিন্তু কেউ কোনো উপায় খুঁজে পায় না। শোনা গেলো, জিনেরা বহুরূপী, কখনো মানুষের বেশ ছেড়ে পাগলের বেশে, কখনোবা পশু–পাখির বেশে ঘুরে বেড়ায়।
কদিন আগে শিমুদের পুকুরে গভীর রাতে দাপাদাপি শুনে শিমুর বাবা মা বেরিয়ে এলো। অবাক হয়ে দেখতে পেলো, পুকুরের চারপাশ জ্যোৎস্না আলোয় ছেয়ে আছে। এ আলোয় পুকুরে জলকেলি করছে কতগুলো ছায়া আর রাক্ষুসে ভূত। এরা পুকুর হতে তাজা মাছ তুলে তুলে খাচ্ছে। আর গান গাইছে বিশ্রি ও বেসুরা স্বরে
“আমরা হলাম জিন
আমরা হলাম ভূত,
খাবো–দাবো, ভয় দেখাব
খেলব চি–কুৎ–কুৎ!
ঘরের লোকেরা দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেলো ভয়ে, জিন আর ভূত মিলে অমনি সেদিকটায় ছুটে এলে তড়িঘড়ি করে দরজা বেঁধে রক্ষা পেল।
কারো কারো ঘরের চালায় ভূতেরা ঝপাস করে জল ছুঁড়ে দেয়। কখনোবা জিনেরা দল বেঁধে আম–কাঁঠালের ডালে দোলনা টেনে টেনে কুড়ুৎ–কুড়ুৎ শব্দ করতে থাকে। কখনোবা জিন আর ভূতেদের মধ্যে লড়াই চলে। এতে করে রাতের গভীরে এক অস্বস্তিকর প্রভাব পড়ে। একাধিকবার বেশ কজন মিলে জিন–ভূতের সন্ধানে বের হয়। কিন্তু দেখা হয়নি, বোঝা গেলো, এরা মানুষের একতাকে ভয় পায়। কিন্তু পরক্ষণেই আবার আগের অবস্থা শুরু হয়। এমন দুরবস্থার সঠিক সমাধা করবে বলে গ্রামবাসী মনস্থির করে। কিন্তু কোনো উপায় খুঁজে পেলো না।
একদিন শেষ বেলাকার কথা। মাথায় পাগড়ি, গায়ে লম্বা জামা আর পায়ে মোজা পরা একটি কিশোর এলো গাঁয়ের মাঠে। তখন পাখিরা কিচিমিচি সুর তুলে নীড়ে ফিরছিল। আকাশে ছড়িয়ে আছে সোনালী আলো, ছেলেটিকে গায়ে আগে কেউ দেখেনি।
সে মনের খেয়ালে এক মন জুড়ানো সুরে গান গাইতে থাকে। সেই গান বড়ই মায়াবি। লোকেরা এমন সুরে মুগ্ধ হয়ে তাকে ঘিরে ধরলো। কিশোর বয়সী ছেলেটি বললো, “আমি দূরের গ্রাম থেকে এসেছি। মানুষের উপকার করাই আমার লক্ষ্য,” লোকেদের একজন বলবো–তুমি আমাদের কী উপকার করতে পারো?”
ছেলেটি পুনরায় শান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়, বলে-‘আমি জাদু জানি, আমি জাদুকর। শুনতে পেলাম কিছু জিন–ভূত তোমাদের শান্তি নষ্ট করছে। আমি এদের দমাতে চাই। অমন কথায় লোকেরা মনে মনে গভীর সান্ত্বনা অনুভব করে।
ক্রমে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ছেলেটি শান্তকণ্ঠে বললো–সন্ধ্যা হলো, এখন পাঠের সময়। শিক্ষার্থী বন্ধুরা পড়াতে মন দাও! আর মা–বাবারা তোমরা ঘরে ফিরে যাও। আমি যাচ্ছি জিন–ভূতকে দমন করতে। এ সময় একজন বৃদ্ধা বললো “আজ অমাবস্যার রাত। এমন রাতে জিন–ভূত তোমার ক্ষতি করতে পারে। তুমি একলা কোথায় যাবে? আরেকজন কিশোর বললো, “ তুমি কোথায় পাবে এদের ঠিকানা?” ছেলেটি কিছুটা নীরব থেকে মন্ত্র আওড়ালো। তারপর শান্ত কণ্ঠে বললো-“ওরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ” দূরের দিকে হাত উঁচিয়ে বললো-‘ওই দূরে গাঁয়ের শেষে পুরান বাড়ির দুপাশে জিন–ভূতের আস্তানা, আমি তা জাদুবলে জেনেছি।”
জাদুকর কিশোরের পিছু পিছু গাঁয়ের কয়েকজন কিশোর সঙ্গ দিতে চাইলো। ছেলেটি এতে সায় দেয়।
ছেলেটি মন্ত্র আওড়ে একটি উজ্জ্বল বাতি উঁচিয়ে তাতে আলো জ্বালালো ততক্ষণে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। ঘন অন্ধকারে চারপাশ ছড়িয়ে গেল।
তাদের পথচলা শুরু হয় জিন–ভূতের আস্তানার দিকে। সাথে আসা কিশোরদের আবেগ উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। তারা এসে থামলো গ্রামের শেষে উত্তর পাড়ায়। এখানে ঘন ঝোঁপঝাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। এসব মাড়িয়ে জাদুকর কিশোর নতুন মন্ত্র আওড়াতে থাকে।
এ সময় উত্তর পাড়ার বামপাশে বিশ্রি সুরের অগণিত শব্দ করতে থাকে। এমন শব্দের ভেতর হতে একটি কর্কশ স্বর ভেসে আসে-“আমি জিনের বাদশা, আমার ঢেরার কাছে কে মন্ত্র আওড়াতে এসেছ! দাঁড়াও! অমনি অগণিত জিন বিশাল ঢেড়া থেকে বেড়িয়ে এলো। শত শত জিন, কোনটা চেপ্টা আলুর মতো, কোনটি খোঁড়া, কোনটি বাদুড়ের মতো, জাদুকর তার সাথে থাকা উজ্জ্বল জ্যোতি বাড়িয়ে দেয়। আর মন্ত্র আওড়াতে থাকে। দেখা যায় একটি অলৌকিক শেকল এদের জড়িয়ে ধরে অল্প সময়ে। এরা বাঁচাও! বাঁচাও! শব্দ করতে শুরু করে।
এবার ডানপাশ হতে একইভাবে দলে দলে ভূতেরা নীল–কালো–গোলাপী ভূত! কোনটির মুখ নেই, নাক নেই, কোনোটি মোটা, কোনোটি চিকন, সবকটি বেশ ভয়ংকর! জাদুকরের সঙ্গে আসা কিশোরেরা ভয়ে কেঁদে ওঠে। জাদুকর বললো–ভয় পেয়োনা। এসময় মিহি ও নাকি সুরে একটি ভাসানো সুরের সিংহলা ভূত বললো–আমি ভূতের রানী, আমাদের বন্দী করতে চাস্্! তোদের চিবিয়ে খাবো। ভূতগুলি তেড়ে এলে মন্ত্রবলে উজ্জ্বল বাতির আগুন তাদের ছড়িয়ে দিলো। অমনি দলে দলে ভূতগুলি পুড়ে ছাই হলো। সেই হতে গ্রামবাসী জিন ভূত মুক্ত হলো।









