তরিকত অর্থ –পথ, রাস্তা, পদ্ধতি ইত্যাদি। সহজ ভাষায় বলতে গেলে –আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধি করার বিশেষ পথ কিংবা পদ্ধতিকে তরিকত বলে। তরিকত চর্চার উদ্দেশ্য হল চেতনার উৎকর্ষ সাধন করে স্রষ্টামুখী হওয়া। তরিকত হল সুবুদ্ধিচর্চার নাম, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধির নাম, চিন্তাশক্তির উন্মেষ ঘটানোর মাধ্যমে গবেষণাধর্মী,সৃষ্টিশীল মানসিকতা সৃষ্টির নাম,আত্মউন্নয়ন ঘটিয়ে চেতনাকে জাগ্রত করার নাম,সর্বোপরি আল্লাহর নৈকট্যতা অর্জনসহ আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়ার নাম। তাসাউফের পরিভাষায় – আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে চেতনাকে জাগ্রত করে আল্লাহর নৈকট্যতা অর্জনের নাম -‘তরিকত চর্চা’।
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অনেক মত– পদ্ধতি রয়েছে। স্বামী রামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘যত মত, তত পথ‘। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগপরিবর্তনে যুগসংস্কারক আউলিয়া পাঠিয়ে থাকেন।
পবিত্র কোরআন শরীফে আছে, ‘তোমরা উন্নত কৌশল ও হেকমতের মাধ্যমে মানুষকে সত্যের দিকে ধাবিত কর’। যুগসংস্কারকগণ হেকমতের মাধ্যমে সকল ধর্মাবলম্বীকে সত্যের দিকে আহবান করেন। এর নাম তরিকা। এভাবে যুগেযুগে অসংখ্য তরিকার সৃষ্টি হয়েছে। তরিকতপন্থীগণ বিভিন্ন তরিকার মাধ্যমে তরিকত চর্চা করলেও সকলের গন্তব্য কিন্তু এক ও অভিন্ন। তা হল–আল্লাহর নৈকট্যতা অর্জন। তবে এই চর্চা নিজে নিজে করলে সফল হওয়া কষ্টসাধ্য। একজন কামেলপীর–মুর্শিদ, অলি আউলিয়ার অনুসরণে তরিকতের চর্চা করলে গন্তব্যে পৌঁছতে অনেকটা সহজ হয়। কারণ অলি আউলিয়ারা সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয়ভাজন হয়েছেন। তাঁরাই ভালো জানেন কোন পথে অতি সহজেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। কারণ এই পথ তাঁরা পাড়ি দিয়ে এসেছেন। তাদের সংস্পর্শ ও অনুসরণে তরিকত চর্চা করলে সহজে আল্লাহর নেয়ামত অর্জিত হয়। তাঁরা বিভিন্ন কৌশল, রহস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভক্ত –শিষ্যদের শিক্ষা দিয়ে থাকেন। সাধারণত আওলিয়াদের আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে অনেক রহস্য নিহিত থাকে। এই রহস্যের পেছনে অন্তর্নিহিত যে শিক্ষা (কারণ) সেটি বিজ্ঞান। যে বিজ্ঞান দিয়ে মানবতার কল্যাণ হয়। আধ্যাত্মিকতা হলো অনুভূতিলব্ধ ও উপলব্ধিগত জ্ঞান। অপরদিকে বিজ্ঞান হলো পরীক্ষাগারে গবেষণালব্ধ জ্ঞান। বিজ্ঞানের জন্য ল্যাব এক্সপেরিমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিজ্ঞান বলে –কোনো কিছু আবিষ্কারের জন্য ল্যাব এক্সপেরিমেন্টের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাথে ল্যাব এক্সপেরিমেন্ট যুক্ত জ্ঞান দ্বারা মানবতার কল্যাণ হয়। রহস্যজ্ঞান যদি রহস্যই থেকে যায় তাহলে সেই জ্ঞানে মানবতার কল্যাণ হয় না। কামেল মুর্শিদের সংস্পর্শে তরিকত চর্চার মূল উদ্দেশ্য হলো চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে সৃজনশীল গবেষণাধর্মী মানসিকতা তৈরিকরণ। সৃষ্টির বৃহৎ থেকে বৃহত্তর, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর প্রতিটি বিষয়ে জ্ঞানে নিমগ্ন থাকা; যাতে আধ্যাত্মিক জ্ঞানে নিহিত বিজ্ঞানকে গবেষণা করে মানবসহ প্রকৃতির কল্যাণ করা যায়। চিন্তাশক্তির উন্মেষ ঘটলে গবেষণাধর্মী, সৃজনশীলতাসহ আত্মার উন্নয়ন ঘটে। আত্মার উন্নয়ন থেকে অন্তর্নিহিত ‘চেতনা’ (consciousness) জাগ্রত হয়। ‘চেতনা’ হলো আধ্যাত্মিক শক্তি। যেটি বেলায়তের শক্তি নামে পরিচিত। প্রতিটি মানুষের ভেতরেই প্রাকৃতিগতভাবে বেলায়তের শক্তি নিহিত। কেউ তরিকত চর্চার (সাধনা) মাধ্যমে অন্তর্নিহিত সুপ্তশক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারেন, কেউ পারেন না। এখানেই তরিকত চর্চার সফলতা আর ব্যর্থতা। চিন্তাশক্তির প্রসারণে ধীরেধীরে শক্তি অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক শক্তি জাগরিত হয়ে পরমশক্তির সাথে সংযোগ স্থাপন করে।
যেমন – এক বুদ পানি (ড্রপ ওয়াটার) কে যদি প্রশ্ন করা হয় তুমি কে? তখন বলবে– আমি এক বুদ পানি। এক বুদ পানিকে নদীতে নিক্ষেপ করলে সে পরিচয় দিবে আমি এক বুদ পানি নয় বরং আমি এখন একটি নদী। এক বুদ পানিকে মহাসাগরে নিক্ষেপ করা হয় তখন মহাসাগরে একাকার হয়ে পরিচয় দিবে ‘আমি মহাসাগর’। একইভাবে বান্দা যখন উর্ধ্বমুখী হয়ে মহাত্মার সাথে মিশে যায়, সেও ব্যক্তি থেকে সত্তাতে পরিণত হয়। দুইয়ে মিলে একাকার হয়। তারা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হয়ে (বিশেষ নেয়ামত) আল্লাহর বেলায়তপ্রাপ্ত হয়।
সুফিদের অনুসরণপূর্বক চিন্তার প্রসারণ ঘটিয়ে যদি গবেষণাধর্মী মানসিকতা সৃষ্টি করা না যায়, সুপ্ত আধ্যাত্মিক শক্তিকে জাগিয়ে তোলা না যায়; তাহলে সর্বসাধন বৃথা। এই তরিকত চর্চার কোনো মানে হয় না। তাইতো মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব রাহবারে আলম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান (ম.) মাইজভান্ডারী যথার্থই বলেছেন, ‘চিন্তাযুক্ত মানুষের জন্যই মূলত তরিকা; চিন্তাহীনদের জন্য তরিকা নয়’। এজন্য ভক্ত–শিষ্যদের উচিত অলি আউলিয়াদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড চুলচেরা বিশ্লেষণ করে চিন্তার উন্মেষ ঘটানো। চোখের সামনে কোনো ঘটনা ঘটে যাবে, আর আমরা চিন্তা করব না ; সেটা কাম্য নয়। তরিকত চোখের প্রতি পলকে পলকে চিন্তা করতে শেখায়। যে ভক্ত/শিষ্য কোনো কামেল পীর মুর্শিদের সংস্পর্শে তাসাউফ চর্চা করে চিন্তাশক্তির উন্মেষ ঘটাতে না পারে, আত্মার উন্নয়ন ঘটাতে না পারে; তার শিষ্যত্ব বৃথা। এ ধরনের তরিকত চর্চা অর্থহীন। অপরদিকে যে পীর, ভক্ত–শিষ্যকে চিন্তাযুক্ত গবেষণাধর্মী মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ করতে ব্যর্থ, সুপ্ত চেতনাকে জাগ্রত করতে পারে না, সেই পীর সাহেবের পীরগিরি বৃথা। পীর মুরিদের জ্ঞানচর্চার এই পরম্পরা যে দরবারে নেই সেখানে সত্যের বিকাশ হয় না। সুফি পরম্পরা টিকে থাকে না। অলি আউলিয়াদের সংস্পর্শে গিয়ে,তরিকতের নামে দরবারে সময় দিলাম, আসা–যাওয়া, ঘোরাফেরা, খাওয়া দাওয়া সবই করলাম, কিন্তু কিছুই বুঝলাম না, চিন্তা করতে শিখলাম না, নিজেকে পরিবর্তন করলাম না; সেরকম যাওয়া আসা অর্থহীন। আউলিয়াগণ রহস্যপূর্ণ যে জ্ঞান–বিজ্ঞান–প্রজ্ঞান দিয়ে গেছেন, সেই জ্ঞানের সঠিক চর্চা না হলে মানবতার কল্যাণ হবে না। রহস্যজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে যথাযথভাবে পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌঁছে দেয়া আলোকিত আহাল –ভক্ত শিষ্যসহ সকলের নৈতিক দায়িত্ব। অনেকসময় লক্ষ্য করা যায়– আমাদের মুরুব্বিরা আউলিয়াদের রহস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড না বোঝে কিংবা বুঝতে চেষ্টা না করে ইসলাহী কর্মকাণ্ড বলে চালিয়ে দেয়। নিজ অজ্ঞতার জন্য জ্ঞানের পরম্পরা সামনে এগুই না। ফলে দুরকম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। একটি হলো–গবেষণার অভাবে রহস্যজ্ঞান রহস্যই থেকে যাওয়ায় এর সুফল পাওয়া যায় না। অপরটি–যারা আউলিয়াদের রহস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড নিয়ে গবেষণা করতে কিংবা জানতে চায় তাদের চিন্তাযুক্ত গবেষণাধর্মী মানসিকতাকে অংকুরে বিনষ্ট হয়। তাদের অজ্ঞতা ঢাকার জন্য এসব রূপক কর্মকাণ্ড বলে চালিয়ে দেয়। ফলে তারা জানার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অথচ এতে নিহিত তাসাউফের নিগূঢ়তত্ত্ব। মূলত প্রকৃতিতে গায়েব (রহস্য) বলতে কিছু নেই। মাইজভাণ্ডারী দর্শনের প্রবর্তক ফরদুল আফরাদ গাউসুলআজম হযরত শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) মাইজভান্ডারী বলেছেন, “আল্লাহ যেদিন ‘কুন–ফায়াকুন’ বলেছেন, সেদিন সব প্রকাশ হয়ে গেছে”। দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার উপর এটি নির্ভর করে। যার জ্ঞানের দৃষ্টি যতটুকু সে ততটুকু দেখতে পায়। অবশিষ্ট অংশ তার জন্য গায়েব। চিন্তাযুক্ত গবেষণাধর্মী মানুষের জন্য কিছুই রহস্য কিংবা গায়েব নয়। রহস্য উদঘাটনের চিন্তায় মগ্ন থাকেন। সাধারণত মানুষ ৩ ডাইমেনশনে (দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতা) দেখতে পায়। গরু ছাগল বিড়াল, কুকুরসহ অনেক প্রাণী ৪ ডাইমেনসনে (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, কাল ) দেখতে পায়। এজন্য ভূমিকম্প, সুনামিসহ কোনোদুর্ঘটনা ঘটার পূর্বেই তারা দেখতে পায়। এবং দেখে তারা মানুষকে সংকেত দেয়। সমগ্র প্রকৃতি ১১ ডাইমেনশনে আছে। যারা তরিকত চর্চা করে, তারা চিন্তাশক্তির প্রসারণ ঘটিয়ে সমগ্র প্রকৃতিকে ১১ ডায়মেনসনে উপলব্ধি করার চেষ্টারত থাকে। আত্মার জাগরণ ঘটলে ১১ ডায়মেনশনে সমগ্র প্রকৃতিকে দেখা যায়।
অতএব মহাপুরুষদের সংস্পর্শে তরিকত চর্চা করে চিন্তাশক্তির উন্মেষ ঘটাতে পারলে প্রত্যেক তরিকত চর্চাকারী হয়ে উঠবেন এক একজন গবেষক, এক এক জন দার্শনিক। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষক তৈরি হয় তা নয়; বরং সুফিদের দরবারের অলিগলিতে এর চেয়েও অধিক দার্শনিক–গবেষক থাকে তাদের জ্ঞানের সামনে বিজ্ঞান অনেক সময় অসহায় (যদি যথাযথভাবে তরিকতচর্চা হয়)। অতএব চিন্তাশীল গবেষণাগাধর্মী মানব সৃষ্টির জন্য তরিকত চর্চার বিকল্প নেই!
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক; সাজ্জাদানশীন, মতিভাণ্ডার দরবার শরীফ, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।












