চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের স্বপ্নের শেষ নেই। একে নিয়ে অনেক কথা বুকের ভেতর ঘুরঘুর করে। ইতিহাসবিদদের মতে, দশম ও একাদশ শতকে দক্ষিণ পূর্ববঙ্গে ও আরাকানে চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন চন্দ্ররাজারা। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ ‘সু–লা–তাইং–সন্দয়া’ বাংলা অভিযানে এসে সীতাকুণ্ডের কুমিরা পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। এর শিলালিপিতে লেখা হয় ‘চেৎ–ত–গৌং’ যার অর্থ হলো ‘যুদ্ধ করা অনুচিৎ’। এরপর থেকে এই এলাকার নাম হয় চেত্তগৌং। কালক্রমে চেত্তগৌং থেকে চৈত্যগ্রাম, চিটাগাং, চাটিগ্রাম, চাটগাঁ, চট্টল, চট্টলা, চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি।
চট্টগ্রাম যেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ জনপদ, তেমনি চট্টগ্রামের নামের কারণও বৈচিত্র্যে ভরা। গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর মতে, ছত্রিশবার নাম বদল হয়েছে এই চট্টগ্রামের। এর মধ্যে সতেরটি নাম খুঁজে পেয়েছেন তিনি। চৌধুরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি তাঁর বইয়ে চট্টগ্রামের বত্রিশটি নামের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য গবেষকরা বলেছেন, না, তার চেয়েও বেশি নাম বদল হয়েছে চট্টগ্রামের। কারও মতে, এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের আটচল্লিশটি নাম পাওয়া গেছে।
হরিকেল নামে একটি রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায় বাংলার ইতিহাসে। ইতিহাসবিদদের ধারণা, এই হরিকেল চট্টগ্রামেরই অত্যন্ত প্রাচীন একটি নাম। চীনা পরিব্রাজক ইৎসিং–এর বর্ণনায় হরিকেল রাজ্যের কথা উল্লেখ করা হয়। এই রাজ্যটি বৃহদায়তনের ছিল এবং তার মূল ভূখণ্ড ছিল মধ্য চট্টগ্রাম।
বন্দরনগরটি ইসলামাবাদ নামেও পরিচিতি ছিল একসময়। জানা যায়, ১৬৬৬ সালে মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খান এই নামটি রেখেছিলেন। প্রাচীন গ্রিক ও মিশরীয় ভৌগোলিকদের বর্ণনায় চট্টগ্রামের কিছু স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়।
চট্টগ্রামের নামের সঙ্গে হযরত বদর শাহ (র.)-এর ‘আধ্যাত্মিক’ কাহিনিও জড়িত। আখ্যান আছে, ইসলাম প্রচারের জন্য বদর শাহ চট্টগ্রাম এসে দৈত্য–দানবের কাছ থেকে এক ‘চাটি’ পরিমাণ জায়গা ইবাদত করার জন্য চেয়ে নেন। চাটি অর্থ প্রদীপ। মাটির প্রদীপ। এ মাটির প্রদীপের আলো যতখানি স্থান আলোকিত করবে ততখানি জায়গা হযরত বদর শাহ (র.) পাবেন। তার চাটির আলো ও আজানের ধ্বনি শুনে এ এলাকা থেকে দৈত্য–দানবরা পালিয়ে যায়। সে ‘চাটি’ শব্দ থেকে ‘চাটিগাঁও’ নামকরণ হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ‘চাটিগাঁও’–এর ফরাসিরূপ ‘চাটগাঁও’। একে ‘বার আউলিয়ার দেশ’ বলা হয়।
খ্রিস্টীয় দশম শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগ পর্যন্ত এ জনপদের নামের সঙ্গে ‘চট্টগ্রাম’ শব্দটা যুক্ত হয়নি। তখন একে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করা হতো। লিখিত ইতিহাসে এ জনপদের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় গ্রিক ভূগোলবিদ প্লিনির লিখিত ‘পেরিপ্লাস’ বইয়ে। সেখানে ‘ক্রিস’ নামে একটি স্থানের বর্ণনা আছে। ইতিহাসবিদ ড. নলিনীকান্ত ভট্টাচার্যের মতে, সেটি বর্তমানের সন্দ্বীপ। ইতিহাসবিদ ল্যাসেনের ধারণা– সেখানে উল্লিখিত ‘পেন্টা পোলিশ’ আসলে চট্টগ্রামেরই আদিনাম।
পালবংশের শাসনামলে আরব পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দরকে সমন্দর নামে চিনতো বলে জানা যায়। ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম আসেন বিখ্যাত আরব পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। তিনি লিখেছেন :
“বাংলাদেশের যে শহরে আমরা প্রবেশ করলাম তা হলো সোদকাওয়াঙ (চট্টগ্রাম)। এটি মহাসমুদ্রের তীরে অবস্থিত একটি বিরাট শহর, এরই কাছে গঙ্গা নদী– যেখানে হিন্দুরা তীর্থ করেন এবং যমুনা নদী একসঙ্গে মিলেছে এবং সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে তারা সমুদ্রে পড়েছে। গঙ্গা নদীর তীরে অসংখ্য জাহাজ ছিল, সেইগুলি দিয়ে তারা লখনৌতির লোকেদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। …আমি সোদওয়াঙ ত্যাগ করে কামরু (কামরূপ) পর্বতমালার দিকে রওনা হলাম।”
পনের শতকের চট্টগ্রামের একটি বিবরণ পাওয়া যায় চীনা পরিব্রাজক ফেই–শিন এর ‘শিং–ছা–শ্যাং–লান’ নামের ভ্রমণ গ্রন্থে। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ–এর আমলে চীনা দূতদের মধ্যে ফেই–শিন ছিলেন। ১৪৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি উক্ত বইতে চট্টগ্রাম সম্পর্কিত বর্ণনা দেন :
“বাতাস অনুকূল থাকলে সুমাত্রা থেকে এই দেশে কুড়ি দিনে পৌঁছানো যায়। এ দেশ (চীনের) পশ্চিমে অবস্থিত ভারতবর্ষ নামে দেশটির অন্তর্গত। সম্রাট যুং–লোর রাজত্বের ত্রয়োদশ বর্ষে (১৪১৫ খ্রি.) সম্রাট দুইবার আদেশ জারি করার পরে প্রতিনিধি হৌ–শিয়েন এক বিরাট নৌবহর আর এবং অনেক লোকজন নিয়ে (বাংলার) রাজা, রানি এবং অমাত্যদের কাছে তাঁর (চীন সম্রাটের) উপহার পৌঁছে দেওয়ার জন্য রওনা হলেন। এই দেশটির উপসাগরের কূলে একটি সামুদ্রিক বন্দর আছে তার নাম চা–টি–কিয়াং। এখানে কোনো কোনো শুল্ক আদায় করা হয়। রাজা যখন শুনলেন আমাদের জাহাজ সেখানে পৌঁছেছে, তিনি পতাকা ও অন্যান্য উপহার সমেত উচ্চ পদস্থ রাজকর্মচারীদের সেখানে পাঠালেন। হাজারেরও বেশি ঘোড়া ও মানুষ বন্দরে এসে হাজির হল। ষোলটি পর্ব অতিক্রম করে আমরা সুও–না–উল–কিয়াং (সোনারগাঁও)-তে পৌঁছলাম। এই জায়গাটি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা; এখানে পুকুর, রাস্তাঘাট ও বাজার আছে, সেখানে সবরকম জিনিসের বেচাকেনা চলে। এখানে রাজার লোকেরা হাতি, ঘোড়া, প্রভৃতি নিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করলো।”
চট্টগ্রাম শহরের এক মনোমুগ্ধকর বর্ণনা পাওয়া যায় ব্রিটেনের নাগরিক আর্থার লয়েড তাঁর স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ লিভস ফ্রম আ ডায়েরি ইন লোয়ার বেঙ্গল–এ। তিনি লিখেছেন :
“ভাটিবাংলার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা চাটগাঁ। নিচু টিলা, তার চূড়ায় বাড়ি, ঘুরে ঘুরে হেঁটে উঠতে হয়। কোনো কোনো পাহাড়ে বা টিলায় উঠলে চমৎকার সব দৃশ্য চোখে পড়ে। দূরে দিগন্তে কর্ণফুলী গিয়ে মিশেছে সমুদ্রে, চারপাশে ছড়ানো–ছিটানো পাহাড়ের চূড়ায় বিন্দুর মতো সাদা বাংলো।”
আর্থার লয়েড ১৮৭১ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত দুই দফায় চট্টগ্রামের কালেক্টর ছিলেন। প্রায় দেড় শ বছর আগে লিখিত এই বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায় কেমন সুন্দর ছিল এই শহর। যার কারণে চট্টগ্রামের নাম হয় প্রাচ্যের রানি।
চট্টগ্রামের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। তা শুধু এ কালে নয়, আদিকালেও। ১৯১৫ সালেই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেছিলেন, ‘শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য–মহিমায় মহিমান্বিত বলিয়া নহে, অতি প্রাচীনকাল হইতে রাজনীতির সহিত ঘনিষ্ঠভাবে বিজড়িত থাকায়, চট্টগ্রাম রাজনৈতিক লীলাক্ষেত্র এবং ঐতিহাসিকের গবেষণার প্রকৃষ্ট স্থানও বটে।’
আমাদের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, অনেক ত্যাগ ও রক্তের মাধ্যমে যাকে আমরা অর্জন করেছি, ১৯৭১ সালে; সেই বাংলাদেশকে ২৪ বছর শাসন করেছিল পাকিস্তান। আমরা নিপীড়িত ছিলাম তাদের কাছে। এর আগে আমাদেরকে শাসন করতো ইংরেজরা। তাদের সকল অন্যায় আমাদের মেনে নিতে হতো। মাথা পেতে নিতে হতো সব রকমের অবিচার। তাদের শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ জনপদে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল ‘চট্টগ্রাম’। সেই ইংরেজ–সেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ ওঠে চট্টগ্রামে। ১৯৩০ সালে সংঘটিত ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’ স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এই যুব বিদ্রোহ এবং এর আগে ব্রিটিশ বিরোধী সকল বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য চট্টগ্রাম এই উপমহাদেশে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। তার কারণেই চট্টগ্রামকে অভিহিত করা হয় ‘বীর চট্টগ্রাম’ বা ‘বীর চট্টলা’ নামে।
চট্টগ্রামের বিপ্লবী নেতৃত্বের কারণে ভারতের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধী সেই সময় খুবই উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। বলেছিলেন: ‘চিটাগাং টু দ্য ফোর’। অর্থাৎ চট্টগ্রাম সর্বাগ্রে। রাজনৈতিক দিক থেকে যুগে যুগে চট্টগ্রাম অনন্য ভূমিকা পালন করে এসেছে। সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের অবদান অপরিসীম।
চট্টগ্রামের ভূ–খণ্ডগত অবস্থান যেমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, তেমনি ‘সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি অর্থনীতি–ধর্ম–ভাষা–সাহিত্য– সর্বক্ষেত্রে এখানকার জনগোষ্ঠীর কর্মকৃতি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত’ এবং স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। বাংলাদেশের ইতিহাসে চট্টগ্রাম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও তাৎপর্যময় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ।
এই চট্টগ্রামের সাহিত্য সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করার জন্য ২০০১ সালের ১লা জানুয়ারি চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘চট্টগ্রাম একাডেমি’। এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিলো চট্টগ্রামের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা, চট্টগ্রাম বিষয়ে ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যমণ্ডিত দলিল দস্তাবেজ গ্রহণ, লালন, সংরক্ষণ ও প্রচার করা, বৃহত্তর চট্টগ্রামের অঞ্চলভিত্তিক ইতিহাস তৈরি ও প্রকাশ করা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজসেবা প্রভৃতি ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের জীবনী ও তাঁদের সৃষ্টিকর্ম সংগ্রহ এবং প্রকাশ করা, বাঙালির অহংকার মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের ভূমিকা তুলে ধরা, চট্টগ্রামের সাহিত্য আন্দোলন, নাট্য আন্দোলন, সঙ্গীত আন্দোলন, আবৃত্তি আন্দোলন প্রভৃতি ক্ষেত্রে চট্টগ্রামবাসীকে সম্যক ধারণা দেয়া এবং পৃথক পৃথক গ্রন্থ প্রকাশ করা, চট্টগ্রামের প্রাচীন নিদর্শন, পুরাতত্ত্ব কীর্তি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা, চট্টগ্রামের শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতি তথা সার্বিক উন্নয়নে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, বইমেলা, লোকজমেলার আয়োজন করা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রতিভা বিকাশ ও উন্নয়নে সাহায্য করা এবং গুণী ব্যক্তিদের মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি। দেখতে দেখতে এই একাডেমির ২৫ বছর পূর্ণ হলো। আগামী ৬,৭ ও ৮ আগস্ট ২০২৬ চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে উদযাপিত হবে তিনদিনব্যাপী রজতজয়ন্তী উৎসব। ড. আনোয়ারা আলমকে আহ্বায়ক ও শারুদ নিজামকে সদস্য সচিব করে রজতজয়ন্তী উৎসব উদযাপন পরিষদ গঠন করা হয়। উৎসবে ‘ঐতিহ্যের চট্টগ্রাম’ নামে একটি স্মারক সংকলন প্রকাশিত হবে। প্রায় ১০০০ পৃষ্ঠার এই সংকলনের সম্পাদনায় আছেন প্রাবন্ধিক নেছার আহমদ, প্রধান সম্পাদক হিসেবে আমি রাশেদ রউফও যুক্ত আছি সংকলনের কাজে। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মোমিন উদ্দীন খালেদ। মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর মিঞা ও পরিচালকবৃন্দ সমগ্র আয়োজনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সবার যোগে সফল হোক এই উৎসব।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ফেলো, বাংলা একাডেমি।












