গড়িমসিতে সাড়ে তিন বছর পার

হালদা উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প-২ বন্ধ হয়নি পানি দূষণ, নষ্ট হ্যাচারিগুলো

মীর আসলাম, রাউজান | শনিবার , ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র মৎস্য প্রজননক্ষেত্র রক্ষায় নেয়া হালদা উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (২য় পর্যায়) নামের প্রকল্পটি শুরু করা হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে। সাড়ে ৪৬ কোটি টাকার এই প্রকল্প কাজ শেষ করার কথা রয়েছে ২০২৭ সালের জুনে। এই প্রকল্পের কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বারোপ করার কথা নদীর দুই পাড়ে আগে স্থাপন করা ৬টি হ্যাচারির আধুনিকায়ন, সংলগ্ন পুকুরসমূহ সংস্কার করে মাছ চাষের উপযোগী করা, নদীর পানি দূষণের জন্য দায়ী উৎসসমূহ চিহ্নিত করে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে চিরতরে বন্ধ করা, নদীতে যান্ত্রিক নৌযান ও নদীর মাছ চুরি বন্ধ করা, মৎস্যজীবীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার মত পদক্ষেপ নেয়া। গত ২১ এপ্রিল মৎস্য হেরিটেজ ঘোষিত হালদা নদীর দুই পাড়ে ঘুরে দেখা যায় এসব কর্মসূচির মধ্যে কোনোটিরই বাস্তবায়ন হয়নি। সাড়ে তিন বছর পার হলেও সংশ্লিষ্টদের গড়িমসিতে প্রকল্পের কাজে কোনো অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

মা মাছ ডিম দেয়ার সম্ভাবনার মাঝেও হ্যাচারিগুলোতে এখনো চলছে ঢিলেঢালা সংস্কার কাজ। নদীতে রাতদিন চলছে জাল পেতে বড়শি ফেলে মাছ শিকার, চলাচল করছে বালুবাহী বড় বড় যান্ত্রিক নৌযান, শাখা উপশাখা খাল হয়ে নদীতে এসে পড়ছে কলকারখানার রাসায়নিক বিষাক্ত বর্জ্য। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, হালদাপাড়ের শাহমাদারী হ্যাচারি ও মদুনাঘাট হ্যাচারিতে এখনো চলছে সংস্কার কাজ। সাথে থাকা পুকুরগুলো কচুরিপানায় ভর্তি। মদুনা ঘাট হ্যাচারিতে কর্মরত হ্যাচারি সহকারী আবদুর রহমান বলেন, ঠিকাদারের গড়িমসিতে সংস্কার কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। এই হ্যাচারিতে পোনা ফুটানোর কয়েকটি সাকুলার ট্যাঙ্ক অকেজো রয়েছে। বেশির ভাগ ট্যাঙ্ক সচল আছে বলে হ্যাচারি সহকারীর দাবি। শাহমাদারী হ্যাচারিতেও দেখা গেছে ঢিলেঢালা সংস্কার কাজ। দেখা যায়, সংলগ্ন পুকুরগুলোর বেশির ভাগ ঝোপজঙ্গলে পূর্ণ। জানতে চাইলে হাটহাজারী উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ সওকত আলী বলেন, শাহমাদারী হ্যাচারির পুকুরটি নদীর সাথে সংযুক্ত হওয়ার কারণে এটি সংস্কার করা যাচ্ছে না। এই হ্যাচারির সংস্কার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি জানান। রাউজান অংশের কাগতিয়া হ্যাচারিটি এখনো পড়ে আছে আগের মত বিধ্বস্ত অবস্থায়। সংস্কারের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় ঠিকাদার এখনো কাজ শুরু করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন রাউজান উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তফজ্জল হোসেন। এই উপজেলার অপর দুটি হ্যাচারি মোবারকখীল ও পশ্চিম গহিরা হ্যাচারির কাজ চলমান আছে বলে এই কর্মকর্তা জানান। হালদা পাড়ের অস্থায়ী নৌপুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক রমজান আলী বলেন, প্রকল্পের কোনো স্পিড বোট না থাকায় পুলিশের একমাত্র স্পিড বোটটি ব্যবহার করে অভিযান চালাতে হয়। হালদায় অভিযানে নামলেই পাওয়া যায় হাজার হাজার মিটার জাল। বিশেষ করে রাতের বেলায় অভিযানে বিপুল পরিমাণ জাল জব্দ করা হয়।

মৎস্য বিভাগের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পের কর্মসূচির অধীনে হালদার দুই পাড়ের চারটি উপজেলায় ৪০জন পাহারাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ কাজের জন্য মাসে প্রতিজনকে দেয়া হচ্ছে মাসিক ১০ হাজার টাকা করে। হালদা পাড়ের মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া এসব পাহারাদারের অনেকেই অন্য পেশায় জড়িত। তারা দায়িত্ব পালন না করেই মাসিক টাকা উঠিয়ে নিচ্ছেন। নদীতে তাদের নজরদারি না থাকায় হালদায় রাতদিন জাল বড়শি দিয়ে মাছ মারার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

জানা যায়, নদীতে নজরদারিতে রয়েছে ৬টি ড্রোন। তবে এসব ড্রোনের কার্যক্ষমতা খুবই দুর্বল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাছাড়া ওড়ানোর মত প্রশিক্ষিত লোকজন না থাকায় এগুলো তেমন ওড়ানো হয় না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নদীর পাড়ের জেলে সম্প্রদায়ের কয়েকজন নারী পুরুষের সাথে কথা বললে তারা বলেন, কোনো সময় ড্রোন ওড়ানোর দৃশ্য তাদের চোখে পড়েনি। হালদা রক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িত মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, অতীতে হালদা রক্ষা প্রকল্পের নামে নেয়া টাকা নয়ছয় হয়েছে। সর্বশেষ নেয়া সাড়ে ৪৬ কোটি টাকার পাঁচ বছরের এই প্রকল্পটিও হল অবস্থায় শেষ হতে চলেছে। হালদা পাড়ের মৎস্যজীবী শ্রীরাম জলদাস বলেছেন, অনুকূল পরিবেশ পেলে যেকোনো সময় মা মাছ ডিম দিতে পারে। এত টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও প্রকল্প পরিচালকের উদাসীনতায় শেষ মুহূর্তে এসে হ্যাচারিগুলোতে সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। নষ্ট হয়ে থাকা একটি হ্যাচারি সচল করার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এই অবস্থার মধ্যে এবারও হ্যাচারিগুলো থেকে সেবা পাওয়া যাবে কি না এই নিয়ে ডিম সংগ্রহকারীরা শংকার মধ্যে আছেন।

প্রকল্পের বেহাল অবস্থা নিয়ে হালদা গবেষক বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, প্রকল্প কর্মসূচি প্রণয়নে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নেয়া হয়নি। তারা নিজেদের ধ্যান ধারণায় হালদা প্রকল্পের কর্মসূচি প্রণয়ন করায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিস্ক্রীয়তায় বিশেষায়িত এই নদীটি দূষিত পানির নদীতে পরিণত হয়েছে। এমন পরিবেশে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকিতে রয়েছে। এক্ষেত্রে মৎস্য বিভাগের সাথে পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়নহীনতাকেই তিনি দায়ী করেন। এদিকে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও প্রকল্প পরিচালক নাজিম উদ্দিন ফোন রিসিভ করেননি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকাপ্তাই হ্রদে বন্ধ হলো মাছ শিকার
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬