
চট্টগ্রাম নগরীতে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে নারী চালক ও সহকারীসহ সম্পূর্ণ নারীদের পরিচালনায় বিআরটিসির বিশেষ মহিলা বাস সার্ভিস গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে একটি দোতলা ও একটি একতলা গোলাপী বাস দিয়ে কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এ সেবা দেওয়া হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় ঢাকার তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি ডিপো থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ভার্চ্যুয়ালি এ সেবার উদ্বোধন করেন। এসময় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র প্রান্ত থেকে চট্টগ্রামের অতিথিরা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। পরে সেখানে বেলুন উড়িয়ে চট্টগ্রামের বাস দুটির চলাচলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর বাস দুটি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে নগরের ফ্রি পোর্ট হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলাচল শুরু করে। পুরো রুটে নির্ধারিত ১২টি স্টপেজ রাখা হয়েছে। এসব পয়েন্টে নারী যাত্রীরা বাসে উঠতে ও নামতে পারবেন। কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা রুটে চলাচলকারী দ্বিতল বাসটি ৭৫ আসনের, আর একতলা বাসের আসন ৪৫টি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, এটি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি অঙ্গীকারের অংশ। তিনি সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছেন। এ বাসের চালক ও হেলপার সবাই নারী। চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, নারীরা যাতে গণপরিবহনে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের আশাও প্রকাশ করেন তিনি। সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, আমরা আশা করব, সরকার যে উদ্দেশ্যে এ কর্মসূচি শুরু করেছে, নারীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদভাবে চলাচল করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। সরকারের অঙ্গীকার সরকার বাস্তবায়ন করছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, দিনটি চট্টগ্রাম ও নারীসমাজের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানে হাজারো নারী কাজ করেন। তাঁদের নিরাপদে কর্মস্থলে যাতায়াত ও বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করতে সরকার এ বিশেষ বাসসেবা চালু করেছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, বাসের চালক ও কন্ডাক্টরও নারী। ফলে নারী যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই যাতায়াত করতে পারবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।
এ বাস সেবা দীর্ঘমেয়াদে থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই কনটিনিউ হবে। আপনারাও মা–বোনদের উৎসাহিত করবেন। শিল্প কারখানার মালিকদের বলব তারাও যেন তাদের কর্মচারীদের যেন বলেন, নারীদের জন্য দেওয়া এই বাস ব্যবহার করতে।
ঢাকা ও বগুড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও এ বিশেষ বাসসেবা চালু হলো উল্লেখ করে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, যাত্রীদের চাহিদা বাড়লে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বাসের সংখ্যা ও চলাচলের পথ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকার ৪০০টি নতুন বৈদ্যুতিক বাস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি নারীদের যাতায়াতের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখান থেকে বাস পাওয়া গেলে চট্টগ্রামে এ সেবা আরও সমপ্রসারণ করা সম্ভব হবে।
বাসের জন্য গোলাপী রং বেছে নেওয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, নারী সমাজের কাছে পছন্দের রং হিসেবে গোলাপির প্রচলন রয়েছে। সেটি বিবেচনায় নিয়েই বাসের রং নির্ধারণ করা হয়েছে। নারীদের এ বাসসেবা ব্যবহারে উৎসাহিত করতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার মালিকদের তাঁদের নারী কর্মীদের এ নিরাপদ যাতায়াত সুবিধা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার অনুরোধ জানান তিনি। অনুষ্ঠানে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. নাজিমুল হক, জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিআরটিএ চট্টগ্রামে বিভাগের পরিচালক মাসুদ আলম এবং বিআরটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী যাত্রার সাথী আক্তার নামে এক নারী যাত্রী বলেন, সাধারণ বাসে উঠতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। বাসে পুরুষ যাত্রীই বেশি থাকে। অনেক সময় সিট পাই না। নিরাপত্তা নিয়েও টেনশনে থাকতে হয়। এই বাস সার্ভিস চালু হওয়াতে খুব ভাল হল। এখন আর নিরাপত্তা নিয়ে টেনশনের থাকতে হবে না। উদ্বোধনের পর শুরুতে দ্বিতল বাসটি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পরে একতলা বাসটি যাত্রা করে। এসময় বাসের অপর যাত্রী রুবি আক্তার ও সাঈদা রহমান সহ অন্যান্য নারী যাত্রীরা বাসের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান, সেই সঙ্গে নগরীর অন্যান্য রুটেও এ সেবা চালুর দাবি রাখেন।
গোলাপী বাসের ভাড়া :
চট্টগ্রাম নগরীতে গতকাল থেকে যাত্রা শুরু হওয়া মহিলা বাস সার্ভিসের দূরত্ব অনুযায়ী সর্বনিম্ন ১০টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬৮ টাকা পর্যন্ত ভাড়া র্নিধারণ করা হয়েছে সরকারি সংস্থা বিআরটিসি থেকে। এই নির্ধারিত ভাড়ায় নগরীর নির্ধারিত রুটে চলাচল করতে পারবেন যাত্রীরা।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট–পতেঙ্গা পথে ১২টি স্টপেজে বাস থামবে :
নারীদের জন্য নগরীতে চালু হওয়া বাস দুটি প্রতিদিন ২২ থেকে ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রাপথে ১২টি নির্ধারিত স্টপেজ রয়েছে। কালুরঘাট থেকে শুরু হয়ে কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২নং গেট, জিইসি মোড়, লালখান বাজার, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, বারেকবিল্ডিং, ফ্রি পোর্ট, কাটগড়, পতেঙ্গা পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে সাতটায় কালুরঘাট থেকে প্রথম বাস ছেড়ে যাবে। এর আধঘণ্টা পর দ্বিতীয় বাসটি যাত্রা শুরু করবে। বাসগুলোর চালক ও সহকারী নারী, যাত্রী হিসেবেও কেবল নারীরাই চলাচল করবেন।












