কাদের আরাফাতসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

| বুধবার , ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল২ এ রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। গতকালের রায়টি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সপ্তম রায়।

ওবায়দুল কাদের ছাড়া এ মামলায় দণ্ডিত অন্যরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তারা সবাই পলাতক আছেন। তাদের মধ্যে সাদ্দাম ও ইনান ছাড়া বাকিদের অর্ধেক সম্পদ জব্দ করে জুলাই আন্দোলনে আহত এবং নিহতদের পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।

ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, রোম সংবিধিতে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করার বিধান আছে। এবারই প্রথম আমাদের ট্রাইব্যুনাল তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করেছে। সেই ৫০ শতাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাউন্ডেশন বা বিধিবদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদ ও আহতদের মধ্যে বিলি বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে যেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ হয়েছিল, সেসব বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার মনে হয় যে আজকের যে জাজমেন্ট হয়েছে, সরকার সেটিকে ফলো করতে পারবেন।

আপিলের পর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়টি বাস্তবায়ন হবে কি না, এ প্রশ্নে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, রায়ে দেখেন, এই জায়গায় আপনারা যেহেতু প্রশ্নটা তুলেছেন, আজকের এই রায় প্রকাশিত হওয়ার পরে ৩০ দিন পর্যন্ত আপিলের সময়সীমা থাকবে। ৩০ দিন পর্যন্ত কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার হয়তো সুযোগ নাই। কিন্তু ৩০ দিন পর থেকে বাংলাদেশ সরকারের এই রায় বাস্তবায়ন করতে আইনগত কোনো বাধা নাই।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট এবং মনে করি, এটি একটি প্রত্যাশিত রায় হয়েছে। আজকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই শহীদ ও আহতদের প্রতি আজ ন্যায়বিচার করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।

সাত আসামির সবাইকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচার কাজ চলে। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে শুনানি করেন এম হাসান ইমাম ও আইনজীবী ইসরাত জাহান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামীম।

রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী ইসরাত জাহান অনি বলেন, সকল সাক্ষ্যপ্রমাণ ও ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করে আসামিদের খালাস করানোর জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আইন অনুযায়ী যেভাবে এগোনো যায়, সেভাবেই আর্গুমেন্ট ও জেরা করেছি। কিন্তু মাননীয় ট্রাইব্যুনাল আমার চার আসামির বিভিন্ন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন।

সাদ্দাম, ইনান, নিখিল ও পরশের আইনজীবী অনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায় মানতে আইনজীবী হিসেবে আমরা বাধ্য। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ধৃষ্টতা আমাদের নেই। ট্রাইব্যুনালের রায় মানি, মান্য করি। কিন্তু আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট নই।

কাদের, নাছিম ও আরাফাতের আইনজীবী হাসান ইমাম বলেন, আমরা সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করেছি। জেরা করেছি, আর্গুমেন্ট করেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রিন্সিপাল অব কমন রেসপনসিবিলিটির সুবিধাঅসুবিধা সবকিছু মাননীয় ট্রাইব্যুনালে ব্যাখ্যা করেছি। রায়ে আমাদের এসব বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, রায় না দেখে বলতে পারব না।

আইনজীবী হাসান ইমাম বলেন, আমি একজন জজ ছিলাম। সেই হিসেবে বলছি, মাননীয় বিচারপতিদের জাজমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই, কিংবা বলার মতো ধৃষ্টতাও নেই। তবে আমিও এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। সুযোগ থাকলে আপিল করা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, আপিলে হয়তো আমরা আরও ভালো কোনো ফল পেতে পারি, ইনশাল্লাহ, আগামী দিনগুলোতে।

মিরপুরে শহীদ মেহেরুন্নেসার বাবা মোশাররফ হোসেন বলেন, হাসিনা ভারতেই থাক, ওইখানেই মরুক। মরার পরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিক অথবা তাকে দাফন করুক, সেটা তাদের ভারতের ব্যাপার। কিন্তু আমরা তাকে চাই না। যারা তাগড়া আসামি, তাদের দেশে নিয়ে এসে ফাঁসি দেওয়া হোক। তিনি বলেন, যারা দেশে আছে, তাদের বিচার করুক। দুইএকটাকে ফাঁসি দিক না। তারপরে বলব যে, সরকার বিচার করছে। আজ পর্যন্ত প্রদীপের বিচার হলো না। জিয়াউল হাসানের কিছু হলো না। তারা এমন শরীর নিয়ে জেলে এঙারসাইজ করে। তো দুইএকটা ফাঁসি হোক না, দেখাক না যে কারও ফাঁসি হয়েছে।

অভিযোগ গঠন থেকে রায় : গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। সেদিন প্রথম সাক্ষী হিসেবে শহীদ আসিফ ইকবালের বাবা এম এ রাজ্জাক জবানবন্দি দেন। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সবশেষ ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল২ মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে। পরে সোমবার ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার দিন ঠিক করে।

ছাত্রজনতার আন্দোলনের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। ইতোমধ্যে দুই ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় দিয়েছে। এসব রায়ে ৬১ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১১ জন পলাতক এবং চারজন কারাবন্দি রয়েছেন।

রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ : ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। গতকাল দুপুর সোয়া ১টার দিকে সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতিদের প্রবেশ পথে ককটেল ফাটানো হয় বলে শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান। এ ঘটনায় কারো হতাহত হওয়ার তথ্য নেই জানিয়ে তিনি বলেন, কে বা কারা একটি ককটেল ছুড়ে মারলে বিস্ফোরণ ঘটে। আমরা জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধখুঁটিতে বেঁধে ও পিঠে ইট তুলে দিয়ে যুবককে পিটিয়ে হত্যা
পরবর্তী নিবন্ধ৬৩ বিদেশি নাগরিক ২ দিনের রিমান্ডে