কাঁধে ব্যাগ, খাল পার হয়ে স্কুলে যায় ওরা

লামার গজালিয়া ইউনিয়ন, বমু খালে সেতুর জন্য অপেক্ষা

আলাউদ্দীন শাহরিয়ার, বান্দরবান | শনিবার , ১০ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

বান্দরবানের লামায় সেতু না থাকায় তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে বমু খাল পারাপার করতে হচ্ছে। খালের স্রোত ভেঙে পায়ে হেঁটে তাদের স্কুলে আসা–যাওয়া করতে হয়। একবার পা পিছলে পড়ে গেলে বড় কোনো দুর্ঘটনার শঙ্কা মাথায় রেখেই অভিভাবকদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে হয়।

কাঁধে স্কুলের ব্যাগ, কারো হাতে বই–খাতা, কেউ মায়ের কোলে, আবার কেউ ভিজে ভিজে খাল পারাপার করেই লেখাপড়া শিখতে স্কুলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। গর্ভবতী নারী কিংবা অসুস্থ রোগীদেরও একই কায়দায় খাল পেরিয়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীরা জানান, লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের সাতটি গ্রামের ১০ হাজার মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তি। বমু খালের দুপাড়ে বাইশফারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিত্তাবান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বড়থলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তিনটি স্কুলের প্রায় ৬ শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করছে। বমুখালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বমু খালের উপরে একটি সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। সেতু না থাকায় বর্ষা মৌসুমে শিশু, শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কদের ভোগান্তি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। পানির উচ্চতা ও স্রোত বেড়ে গেলে অনেক সময় পারাপার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হয় এবং জরুরি প্রয়োজনে রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন এই নদীর পথ ব্যবহার করে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। বর্ষাকালে পানির স্রোত বেড়ে গেলে অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেক সময় ঝুঁকির কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।

চিত্তাবান ও বাইশফাঁড়ি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী চতুর্থ শ্রেণির পাউঙি ম্রো ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মাংইয়ং ম্রো বলেন, প্রতিদিন এই খাল পার হয়ে স্কুলে আসতে হয় আমাদের। কারো বই ভিজে যায়, কারো ড্রেস ভিজে যায়। পানি বেশি থাকলে পারাপার করতে ভয় লাগে। তখন কেউ স্কুলে আসতে পারে না। এখানে একটি সেতু হলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সংকটের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় কৃষিতেও। কৃষকদের উৎপাদিত শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগের সমস্যার কারণে সময়মতো পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শুধু শিক্ষা ও কৃষি নয়, সেতুর অভাবে স্বাস্থ্যসেবাতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। অসুস্থ রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারের কারণে অনেক সময় বিলম্ব হয়। বর্ষায় এই সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

নয়াপাড়া ও মুরুং পাড়া বাসিন্দা উচহ্লা ও সিংপাক ম্রো বলেন, আমাদের অনেকেই জুম ও কৃষি কাজ করে সংসার চালায়। ব্রিজ না থাকায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা আসতে চায় না। যার কারণে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে গেলেও অনেক দূরে হেঁটে যেতে হয়। আর নায্যমূল্যও পাই না।

লামা গজালিয়া ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্তাবান পাড়া, পশ্চিম বাইশফারি, নয়াপাড়া, তুলাতলী মুরুং, মারমা পাড়া, ঢেকিছড়া, হেডম্যান পাড়াসহ সাতটি গ্রামে ১০ হাজার মানুষের বসবাস। সেখানে বেশীরভাগ ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। অধিংকাশ সেখানকার মানুষ কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। একইভাবে খালের এপারে বাইশফারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ওপারে চিত্তাবান পাড়া ও বড়থলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই তিনটি স্কুলে প্রায় ৬ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। সকলকেই এই বমু খাল দিয়ে পারাপার হতে হয় প্রতিদিন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সংকট দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানানো হলেও এখনো কার্যকর সমাধান হয়নি। সেতু নির্মাণ না হওয়াই কৃষিপণ্য থেকে নায্যমূল্য হারাচ্ছেন সেখানকার কৃষকরা। তবে সেতু নির্মাণ হলে এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা–বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বান্দরবান–লামা সড়কের মধ্যখান দিয়ে গেছে এলাকাটি। দূরত্ব প্রায় সাত কিলোমিটার ও গ্রামগুলো গহীনে। বাইশফারি ও চিত্তাবান পাড়া গ্রামের মধ্যখান দিয়ে বয়ে গেছে ১৮০ ফুট প্রশস্ত বমুখাল। এই খালটি সরাসরি চিম্বুক এলাকায় সংযোগস্থল। খালের এ পারে তিনটি গ্রাম ও ও পারে চারটি গ্রাম। একইভাবে এ পারে দুটি ও ওপারে একটি প্রাথমিক স্কুল রয়েছে। খালের স্রোত প্রায় সময় বাড়ে আবার কখনো হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি থাকে। স্কুলে আসা–যাওয়ায় অভিভাবকেরা সন্তানদের কোলে নিয়ে পার হচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসাইন বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বমু খালের ওপর সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। খালের পানি বেড়ে গেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বাড়ে।

বাইশফাঁড়ি স্থানীয় এনজিও কর্মী অংথোয়াইনু মারমা বললেন, ব্রিজ হবে হবে বলে বহুবার লোক এসে মাপজোখ করে গেছে। ফিতা টেনে দাগ দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উচাছিং মারমা বলেন, এখানে একটি সেতু নির্মাণ জরুরি। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ কম থাকায় প্রকল্প হাতে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী রনি সাহা বলেন, সেতুটি এলাকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতিন অঙ্কে কেউ নেই, তবু রেকর্ড বাংলাদেশের
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে এলপিজির বাজার কঠোর নজরদারিতে : জেলা প্রশাসক