বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি সই হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে এ চুক্তি সই হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের তরফে কোম্পানির চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম চুক্তিতে সই করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, ঢাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
এদিকে এ চুক্তির বিরোধিতা করে এদিন দুপুর থেকে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামের সামনে অবস্থান নেয় বেশ কয়েকটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। ইনভেস্ট বাংলাদেশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনালের (এনসিটি) জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে রেখে দুবাই সরকারের মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছর মেয়াদে টার্মিনালের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।
বাসস জানায় : চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালটির আধুনিকায়নে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। এই উদ্যোগকে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রাথমিকভাবে ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করবে। চুক্তি সইয়ের সময় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এককালীন অর্থ দিতে হবে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন, প্রযুক্তি সংযোজন ও পরিচালন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এনসিটিকে আধুনিক করতে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের আয় বা রয়্যালটির একটি অংশও পাবে। গড় টার্মিনাল আয়ের ওপর নির্ভর করে প্রতি কন্টেনারের জন্য এই অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কন্টেনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এই ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউতে নামিয়ে আনার সুযোগ থাকবে।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান কৌশলগত সম্পদগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতা দ্রুত বাড়ানো। তিনি বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন পদ্ধতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ এনসিটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উৎপাদন অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে এবং দেশের এই উন্নয়নে সহযোগিতা করতে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, সরবরাহ অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের যোগাযোগ আরও নির্বিঘ্ন হবে। ইসা কাজিম বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড তার পরিচালন দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং পণ্য পরিবহন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত সমন্বিত সক্ষমতা কাজে লাগাবে। এতে বাণিজ্য বাড়বে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র ও বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই অংশীদারত্ব। তিনি বলেন, চুক্তিটি এনসিটির পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের প্রতিবন্ধকতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা বাংলাদেশের বাণিজ্যকে বৈশ্বিক গতির সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যদ্বারে আমরা আরও দ্রুত কার্যক্রম, শক্তিশালী যোগাযোগব্যবস্থা এবং উচ্চতর মান নিশ্চিত করতে চাই।
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি নির্দিষ্ট কন্টেনার পরিচালনা স্থাপনার একটি এনসিটি। ২০০৭ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এটি দেশের বাণিজ্য অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। তবে কন্টেনার বন্দরে পড়ে থাকার সময়, জাহাজের পণ্য ওঠানামা শেষ করে বন্দর ছাড়তে যে সময় লাগে এবং যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা ও সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বন্দরটি এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও এনসিটিতে একটি কন্টেনারের গড় অবস্থানের সময় ৯ দিনের বেশি। অথচ সমপর্যায়ের কয়েকটি বন্দরে এ সময় দুই দিনেরও কম। একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজের অবস্থানকাল আড়াই দিনের বেশি, যেখানে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি বন্দরে তা ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টার মতো।
২০২৫ সালের কনটেনার পোর্ট পারফরম্যান্স সূচকে বিশ্বের ৪০০টি কন্টেনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৩৬৪তম। সরকারের হিসাবে, বন্দরের পরিচালনগত অদক্ষতা ও পর্যাপ্ত আধুনিকায়নের অভাবে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কন্টেনার বন্দরে পড়ে থাকার সময় এক দিন কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে।
এনসিটি পরিচালনার নতুন চুক্তিতে সেবার মান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মদক্ষতা সূচক, ধাপে ধাপে অর্জনের লক্ষ্য এবং নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাকের যাতায়াতে সময় এবং ক্রেনের উৎপাদনশীলতার মতো বিষয়ও রয়েছে। কোনো নির্ধারিত কর্মদক্ষতার লক্ষ্য টানা তিন মাস পূরণ করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক জরিমানা কার্যকর হবে।
টার্মিনালের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি, নিরীক্ষা এবং নিয়মিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কনন্টেনার ও জাহাজ পরিচালনা, আয় এবং অন্যান্য পরিচালন সূচক নিয়ে সাপ্তাহিক ও মাসিক প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থাও চুক্তিতে রাখা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে টার্মিনালের মালিকানা বা সার্বভৌম কর্তৃত্ব হস্তান্তর হবে না। নিরাপত্তা, শুল্ক, অভিবাসনসহ বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো যে দায়িত্ব পালন করছে, সেগুলো বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অধীনেই থাকবে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য দেশের ভেতরে সংরক্ষণ, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের পরিচয় ও পটভূমি যাচাইয়ের বিষয়ে সরকারি অনুমোদিত মানদণ্ড অনুযায়ী সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
চুক্তির পরও স্থানীয় কর্মসংস্থান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ডিপি ওয়ার্ল্ডের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের ফলে বন্দর ও পণ্য পরিবহন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকার–টু–সরকার নীতি এবং সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বের কাঠামোর আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রাক–যোগ্যতা যাচাই, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, বিভিন্ন বিষয়ে যাচাই–বাছাই এবং আলোচনা হয়েছে।
২০২৩ সালের ২৩ মার্চ অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর লেনদেন কাঠামোসংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়। ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২৫ জানুয়ারি দরপত্র জমা পড়ে। এরপর ২৭ জানুয়ারি থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত আলোচনা চলে। ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড এ ব্যবস্থা অনুমোদন করে। পরে ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিও অনুমোদন দেয়।
এ চুক্তি চট্টগ্রাম বন্দরের পঞ্চম কন্টেনার টার্মিনাল লালদিয়া কন্টেনার টার্মিনালের উন্নয়নকাজের সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নেওয়া হবে। ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস টার্মিনালটি নির্মাণ করছে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।











