জুলাই সনদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংসদে পাস করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিএনপির কাছে কী কী অগ্রাধিকার, আপনাদের সাথে পরিষ্কারভাবে তুলে দিতে চাই। বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল মিলে আমরা সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ সই করেছি। বাংলাদেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছে যে, যে জুলাই সনদ দক্ষিণ পাজায় সই করা হয়েছে, সেই জুলাই সনদ পাস করতে হবে। সেজন্যই আমরা বলেছি যে, এই জুলাই সনদ আমরা দক্ষিণ প্লাজায় সই করেছি, সেই জুলাই সনদের প্রত্যেকটি শর্ত প্রত্যেকটি লাইন ইনশাল্লাহ বিএনপি সংসদে পাস করবে।
গতকাল সোমবার বিকালে যশোরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে জেলা বিএনপির জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আসুন আমাদেরকে আজকে সতর্ক হতে হবে, আমাদেরকে সতর্ক হতে হবে সেইসব লোকেদের বিরুদ্ধে, যারা বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়। যারা দেশ স্বাধীনের সময়, দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানুষকে বিভ্রান্তির চেষ্টা করেছিল, যারা ’৮৬ সালে বিভ্রান্তি করেছিল, যারা ’৭১ সালে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল, যারা ২০০৯ সালে বিভ্রান্তি করেছিল। ঠিক এই সকল ব্যক্তি আজ আবার এসে ২০২৬ সালে বিভ্রান্তির চেষ্টা করছে।
জনগণের শান্তি নষ্ট করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আসুন আমরা নিজেদেরকে সতর্ক রাখব, যাতে আর কেউ দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে। যাতে করে আর আমরা কাউকে সুযোগ দেব না, জনগণের শান্তি নষ্ট করে ১৭৩ দিন হরতাল পালন করবে, সেই সুযোগ আমরা কাউকে দেব না। এবং বিভিন্ন রকম জুজু বুড়ির ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে পিছিয়ে রাখা যাবে না, বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। আজকে এই জনসভার যে প্রতিশ্রুতি, যেই প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কোনো টিকেট বিক্রি করতে চাই না। বরং আমরা বাস্তব কাজ করতে চাই। সেজন্য আমরা বলি, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। কে কে আছেন আমার সাথে দেশ গড়ার জন্য? এ সময় হাজার হাজার নেতা–কর্মী–সমর্থক হাত তুললে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাজারো–লক্ষ মানুষ দেশ গড়ার জন্য আছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
আসছে এলপিজি কার্ড : মেয়েরা যাতে বেতন ছাড়াই ডিগ্রি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পারে, তা সরকার নিশ্চিত করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, আমরা বলেছিলাম বাংলাদেশের জনসংখ্যা এই যে প্রায় ২০ কোটি, এর অর্ধেক হচ্ছে নারী। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এই নারীদের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে ফ্রি করে দিয়েছেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। প্রথমবার করেছেন স্কুল পর্যায়ে, দ্বিতীয়বার করেছেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে। খালেদা জিয়ার সেই কর্মসূচির অংশকে আমরা আরও সামনে নিয়ে যেতে চাই। এই জন্য আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, ইনশাআল্লাহ নারীদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা ডিগ্রি পর্যন্ত অর্থাৎ উচ্চতর পর্যন্ত ইনশাআল্লাহ বিনামূল্যে ব্যবস্থা করব।
গতকাল দুপুরে যশোরের শার্শা উপজেলায় উলশী খাল পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, শুধু মেয়েদের শিক্ষা ব্যবস্থা আমরা ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি করব না, একইসাথে আমাদের যে মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করতে পারবে, তাদের জন্য আমরা উপবৃত্তির ব্যবস্থা করব সরকার থেকে, যাতে করে তারা আরও উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে পারে।
নারীরা পাবেন এলপিজি কার্ড : পরিবারের নারীপ্রধানদের জন্য বিএনপির যে ফ্যামিলি কার্ড প্রতিশ্রুতি ছিল, সেই কর্মসূচি ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কার্ডে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা মিলবে, যা দিয়ে একজন নারী সন্তানকে ভালো খাবার খাওয়াতে পারবে। সেই সঙ্গে হাঁস–মুরগি পালন, গরু–ছাগল পালনের মাধ্যমে নিজের রুজি–রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারবে। নারীদের জীবনকে আরও সহজ করতে সরকার এলপিজি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি।
বাবার কাটা খালের পুনঃখননের সূচনা : পাঁচ দশক আগে জিয়াউর রহমানের যেখান থেকে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, যশোরের সেই উলশী খাল পুনঃখনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তার ছেলে তারেক রহমান। এদিন বেলা ১২টার দিকে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে এ খনন কার্যক্রমের সূচনা শেষে খালপাড়ে সুধী সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
কারা ফ্যাসিবাদের দোসর? : এদিকে জনসভায় সরকারপ্রধান তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের আস্থা আছে বিএনপির উপরে, বিশ্বাস করে বিএনপিকে। সেই জন্যই বাংলাদেশের মানুষ বিএনপিকে ১২ তারিখের নির্বাচনে ম্যান্ডেট দিয়েছে। যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি জনগণের কাছে দিয়েছে, সেই প্রতিশ্রুতি যাতে বিএনপি পালন করতে পারে, বাস্তবায়ন করতে পারে, তার ম্যান্ডেট জনগণ বিএনপিকে দিয়েছে। একদল লোকের এই ম্যান্ডেট পছন্দ নয় এবং সেই জন্যই দেখেছেন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তারা বক্তৃতা দিচ্ছে। তারা বলে বেড়াচ্ছে, বিএনপি বলে ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে গিয়েছে। আসুন আমরা দেখি, কারা ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে গিয়েছে?
তিনি বলেন, পাঁচ তারিখের পরে বিএনপি পরিষ্কার বলেছে, জুলাই–আগস্ট মাসে যারা মানুষ হত্যা করেছে, তাদের বিচার হতে হবে। কিন্তু আমরা দেখেছি পাঁচ তারিখের পরে কেউ কেউ বলেছিল, ‘আমরা সবাইকে মাফ করে দিলাম’। বলেছিল না? বলেছিল। কিন্তু আমরা কয়েকদিন আগে দেখেছি, যারা বক্তৃতায় জোরে জোরে কথা বলে, তাদেরকেই গিয়ে দেখেছি ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে ঢাকা থেকে অনেক দূরে গিয়ে মিটিং করতে। জনগণ যখন সেটা ঘিরে ফেলেছে, জায়গা, তখন আর তারা কোনো জবাব দিতে পারে না কেন ফ্যাসিবাদের সাথে গিয়ে মিটিং করেছে?
তারেক রহমান বলেন, আমাদের কাছে, বিএনপির কাছে এখন অগ্রাধিকার হচ্ছে, যে সরকারকে বাংলাদেশের জনগণ ১২ তারিখে নির্বাচনে নির্বাচিত করে, সেই বিএনপি সরকারের কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে মা–বোনদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা; সেই বিএনপির কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে হামের টিকার অভাবে যে বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে, তাদের টিকার ব্যবস্থা করা। এর বাইরেও বাংলাদেশের মানুষ, গ্রামের মানুষ, শহরের মানুষ, উপজেলার মানুষ, জেলার মানুষ যে স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে না, তাদের স্বাস্থ্যের সেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে, যে সকল বেকার যুবক আছে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা; আমাদের কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে যে কৃষক সঠিকভাবে এখনো কৃষি উপকরণ পাচ্ছে না, তার জন্য কৃষক সহায়তা প্রদানের নিশ্চয়তা করা; আমাদের কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের সন্তানদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া। আমাদের কাছে অগ্রাধিকার হচ্ছে মানুষের এসব দাবি পূরণ করা।
এর আগে শার্শায় উলশী খাল পুনঃখনন, হরিনারবিলে পাঁচশ শয্যার যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর ফলক উন্মোচন এবং দড়াটানায় যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।











