হালকা বৃষ্টিতেও গতকাল সোমবার নগরের কয়েক জায়গায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। বৃষ্টি থামার কয়েক ঘণ্টা পরও পানি জমেছিল সড়কে। বিশেষ করে প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর ও কাতালগঞ্জ এলাকায়। এতে দুর্ভোগ হয় পথচারীদের। সকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী ও কর্মস্থলে যাওয়া লোকজনের ভোগান্তি হয়েছে বেশি। এ সময় জলাবদ্ধতার অজুহাতে মনগড়া ভাড়া দাবি করেন রিকশাচালকরা।
নগরবাসী বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে বৈশাখের তাপদাহে অতিষ্ঠ ছিলেন তারা। গরমের তীব্রতা কমিয়ে জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি আনে রোববার দিবাগত রাত ও গতকাল সকালে হওয়া বৃষ্টি। কিন্তু জলাবদ্ধতা সেখানে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জানা গেছে, গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে পতেঙ্গা আবহওয়া অফিস। এছাড়া সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আমবাগান আবহাওয়া অফিস রেকর্ড করে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। এদিকে ২৪ ঘণ্টায় ১ থেকে ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে সেটা হালকা বৃষ্টিপাত হিসেবে গণ্য। ওই হিসেবে গতকাল নগরে বৃষ্টি হয়েছে হালকা। অর্থাৎ অল্প বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা হয়েছে নগরে। এদিকে গতকাল ১০টার দিকে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, পানিতে তলিয়ে গেছে মুরাদপুর–বহাদ্দারহাট সড়কের মুরাদপুর–মুহাম্মদপুর অংশ। এখানে হাঁটুর বেশি পানি জমেছিল, যা ছিল ঘনকালো বা কাদাযুক্ত। ১১টার দিকেও সেখানে পানি দেখা গেছে।
এসময় জনি নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা আজাদীকে বলেন, গত বছর মুরাদপুরে তেমন জলাবদ্ধতা হয়নি, পানি উঠলেও তা দ্রুত নেমে যায়। কিন্তু এ বছর বর্ষা আসার আগেই জলাবদ্ধতা কেন হল বুঝতে পারছি না।
মোহাম্মদপুর মাজার রোডের প্রবেশমুখে রয়েছে একটি কালভার্ট। সকাল ১০টার দিকে এ কার্লভার্টে মানুষের জটলা দেখা গেছে। এদের মধ্যে শহীদ নামে এক পথচারী আজাদীকে বলেন, আমার বাসা মোহাম্মদপুর। জরুরি কাজে বের হয়েছি। এখানে এসে দেখি ময়লাপানিতে সড়ক ডুবে আছে। হেঁটেই চলে যেতে পারতাম। কিন্তু ময়লার মধ্যে তো হাঁটা যাবে না। কিন্তু রিকশাওয়ালা মনগড়া ভাড়া দাবি করছেন।
এদিকে প্রায় বেলা প্রায় ২টা পর্যন্ত পানি জমেছিল প্রবর্তক মোড় এলাকায়। এখানে বদনা শাহ মাজারের সামনের সড়কের দুই পাশেই ছিল পানি। পানিতে ডুবে যায় কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা ও পাঁচলাইশ আবাসিক এলকার সড়ক। এছাড়া বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় চা বোর্ডের কার্যালয়ের পাশের গলি এবং জামালখানের একটি গলিতেও সকালে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
প্রবতর্ক মোড় এলাকায় পথচারীরা জানান, গোল পাহাড় মোড় পেরোতেই সড়কে জমে থাকা পানির কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েন তারা। রাস্তায় জমা পানি এড়িয়ে চলতে ওই অংশে অনেক পথচারীকে রোড ডিভাইডারের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। এদিকে প্রবর্তক এলাকায় সড়কে পানি জমে থাকার প্রভাবে জিইসির মোড়, গোলপাহাড়সহ আশপাশের সব এলাকায় তীব্র যানজট লেগে যায়।
জানা গেছে, প্রবর্তক মোড় এলাকায় সড়কের এক পাশে হিজড়া খালের সমপ্রসারণের কাজ চলছে। সেখানে খালের মুখে দেওয়া হয় অস্থায়ী বাঁধ। এ কারণে বৃষ্টি না হলেও এই এলাকার সড়কে পানি জমে থাকে। গতকাল বৃষ্টি হওয়ায় তা আরো তীব্র হয়। এছাড়া চকবাজার–মুরাদপুর সড়কের পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখের অদূরে মূল সড়কে চলছে কালভার্ট নির্মাণ কাজ। এজন্য খালে দেয়া হয়েছে বাঁধ। এর প্রভাবে কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা ও পাঁচলাইশ এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়।
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে মাসব্যাপী নালা–নর্দমা পরিস্কার কার্যক্রম জোরদার করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গতকাল সকাল থেকে নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পরিচালিত ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’–এ সরেজমিনে উপস্থিত থেকে তদারকি করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সকালে প্রথমে তিনি ৩৩নং ফিরিঙ্গীবাজার ওয়ার্ডের জে.এম সেন স্কুলের পেছনে অবস্থিত বান্ডেল খাল এলাকায় চলমান পরিষ্কার কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পরে পর্যায়ক্রমে ৩৪নং পাথরঘাটা ওয়ার্ডের বদর খালি খাল (ইসলাম কলোনী) এবং ৩৫নং বঙিরহাটা ওয়ার্ডের দক্ষিণ মধ্যম পীতম্বরশাহ এলাকায় নালা–নর্দমা পরিষ্কার কার্যক্রমে অংশ নেন।
এসময় ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরের বিভিন্ন স্থানে নালা–নর্দমা ময়লার স্তুপে পরিণত হয়েছে, যা জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কিছু অসচেতন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা যেখানে–সেখানে ময়লা ফেলে নালাগুলোকে কার্যত বর্জ্য ফেলার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না।
মেয়র বলেন, জনগণকে সচেতন না করতে পারলে এই কর্মসূচি শতভাগ সফল করা সম্ভব নয়। এই শহর আমাদের সবার। শহরের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। নিজ নিজ দোকান ও বাসার জন্য আলাদা ডাস্টবিন রাখতে হবে এবং নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলতে হবে। ডাস্টবিন চুরি হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে তদারকির আহ্বান জানান।
এদিকে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বভাসে বলা হয়, আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ও কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এসময় পশ্চিম অথবা দক্ষিণ–পশ্চিম ও অস্থায়ীভাবে দক্ষিণ অথবা দক্ষিণ–পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ১২ থেকে ২২ কিলোমিটার যা অস্থায়ী দমকা আকারে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার বা আরও অধিক বেগে প্রবাহিত হতে পারে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, এখন কালবৈশাখীর মৌসুম, এ সময় বৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। এভাবে আরও ৪–৫ দিন বিরতি দিয়ে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত ও দমকা বাতাস বয়ে যেতে পারে। এছাড়া যেসব এলাকায় মেঘের ঘনঘটা আছে, সেখানে শিলাবৃষ্টিও হতে পারে।













