নগরীর লালখান বাজার এলাকায় বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে টেক্সি থেকে নামিয়ে পুলিশের মারধর ও থানায় নিয়ে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। এই ক্রিকেটারের অভিযোগ, সোহেল নামের এক সোর্সকে সাথে নিয়ে খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম ভূইয়া, কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরী ও তারেক মারধরের ঘটনা ঘটিয়েছেন।
এ ঘটনায় খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমানসহ অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যকে খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। পরে তাদের মধ্য থেকে শফিকুল ইসলাম ভূইয়া ও মো. রাসেলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এদিকে গতকাল রাতে সিএমপির এক আদেশে বাকলিয়া থানার ওসি মো. সোলায়মানকে খুলশী থানার ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর বাকলিয়া থানায় ওসির দায়িত্ব পেয়েছেন সিটি এসবির পরিদর্শক জাহেদুল কবির।
ঘটনা তদন্তে একজন উপ–কমিশনারকে (ডিসি) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এ কমিটিকে ৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এর ভিত্তিতে নাঈম হাসানকে ‘মারধর ও হেনস্তার’ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হবে বলে জানিয়েছেন সিএমপির সহকারী কমিশনার (পিআর) আমিনুর রশিদ। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনায় নাম আসা সোর্স সোহেলকে ঘটনার রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ক্রিকেটার নাঈম হাসান ঘটনার রাতে সাংবাদিকদের জানান, ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষ করে শুক্রবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম আসার কথা ছিল তার। তবে বিলম্ব হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছান। এরপর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সিএনজি টেঙিতে করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। টেঙিটি এঙপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের এক সদস্য থামার সংকেত দেন। কয়েকজন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেন। এরপর তাকে নামিয়ে গলা ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তখন তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন, পরিচয়পত্রও দেখান। তবু তাকে ঘটনাস্থলে থাকা খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ভূইয়া হাতে থাকা লাঠি দিয়ে কোমরে আঘাত করতে থাকেন। শফিকুলের সঙ্গে সাদা পোশাকে থাকা (পুলিশের সোর্স সোহেল) এক ব্যক্তিও হাতে থাকা পাইপ দিয়ে তাকে পেটান।
মারধরের সময় ঘটনাস্থলে লোকজন জড়ো হয়ে যায় জানিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান বলেন, প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমার ক্রিকেটার পরিচয় দিলেও তারা মারধর থামায়নি। তারা বলছিল, তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না। মারধরের একপর্যায়ে আরেকটি সিএনজি টেঙিতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় জানিয়ে তিনি জানান, পুলিশের গাড়ি থাকলেও সেখানে তাকে তোলা হয়নি। তোলা হয় একটি টেঙিতে। সেখানেও তাকে মারধর করা হয়। মারধরের একপর্যায়ে তাকে থানায় নিয়ে যান এসআই শফিকুল ইসলাম। এরপর ওসির কক্ষে নেওয়া হয় তাকে। ওসির কক্ষেও তাকে হেনস্তা করা হয়েছে জানিয়ে নাঈম বলেন, ওসিকে তিনি যখন ঘটনার বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন তখন ওসি বারবার বলেন ‘চোখ নিচে নামাই কথা বল’। এর মধ্যে একটি ফোন পেয়ে ওসি শান্ত হন।
নাঈম হাসান বলেন, টেঙি থেকে নামানোর পর আমার ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। থানায় আসার পর ফোনটি পেয়ে আমি বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবালকে ফোন করি। তিনি বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরুকে বিষয়টি জানান। এরপর তারা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই। আজকে আমার সঙ্গে হয়েছে। আমার জন্য অনেক লোক এসেছে থানায়। কিন্তু অন্য সাধারণ লোকের জন্য কেউ থানায় আসবে না। আর কাউকে যাতে এভাবে হয়রানির শিকার হতে না হয়।
এ বিষয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, চোরাচালানের তথ্য ছিল সিএনজি টেঙিটির বিরুদ্ধে। তবে এই তথ্য কতটুকু সঠিক যাচাই করা হচ্ছে। আর অভিযান চালানোর আগে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযান কিংবা তল্লাশিতে পুলিশের কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে এখানে ভুলত্রুটি রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হবে।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ছুটিতে ঢাকায় থাকা খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম এসআই শফিকুল ইসলামকে তথ্য দেন, একটি সিএনজি টেঙিতে করে সোনার চোরাচালান আসবে। এই তথ্যের ভিত্তিতে শফিকুল লালখান বাজার এলাকায় অভিযানে যান। মনিরুল একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে চোরাচালানের এই তথ্য পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
ঘটনার রাতে খুলশী থানা অভ্যন্তরে নাঈমের বাবা মাহবুবুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, বিমানবন্দর থেকে নামার পর নাঈমের সঙ্গে আমার কথা হয়। পরে নাঈম পুলিশ কর্তৃক মারধরের শিকারের খবর জানায়। খবর পেয়ে থানায় এলে ডিউটি অফিসার আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
মধ্যরাতে নাঈমকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে হাজির হন তার আত্মীয়–স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরা। ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানান তারা। এদিকে গতকাল সকালে নাঈম হাসানের ভাই সাব্বির বাদী হয়ে মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এতে এসআই শফিকুল ইসলাম ভূইয়া, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশের সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি।









