নগরীর পাহাড়তলীতে বিড়ালছানা দেবে বলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ১০ বছরের শিশু আয়নী খুনের দায়ে একমাত্র আসামি সবজি বিক্রেতা মো. রুবেলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. সাইফুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। এসময় আসামি রুবেল কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ট্রাইব্যুনালের পিপি মাহমুদ–উল আলম চৌধুরী (মারুফ) দৈনিক আজাদীকে বলেন, শিশু আয়নীকে খুনের দায়ে আসামি রুবেলকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বিচারক। পাশাপাশি তাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও একই আইনের ৯(৪) খ ধারায় ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। বিচার প্রক্রিয়ায় মোট ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য রেকর্ড হয়। তিনি আরো বলেন, এ মামলায় গত ১৪ জুলাই আদালত যুক্তিতর্ক কার্যক্রম শেষ করেন। এর আগে গত ৮ জুলাই আসামিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা (আত্মপক্ষ সমর্থন) করা হয়। তারও আগে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শেষ করা হয়। এদিকে আয়নী খুনের মামলাটিকে ‘রারেস্ট অব রে’ তথা ‘অত্যন্ত বিরল’ মামলা হিসেবে অবহিত করেছেন আদালত। সেই সাথে বলেছেন, যেখানে মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র উপযুক্ত সাজা। রায়ে পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, একটি দশ বছরের নিরপরাধ শিশুর প্রতি সংঘটিত এই অপরাধ অত্যন্ত নির্মম। শিশুরা পৃথিবীকে সন্দেহ করতে শেখেনি। একটি বিড়ালের বাচ্চার প্রতিশ্রুতি একটি শিশুর কাছে যে সরল আনন্দের, সেই সরল আনন্দকেই এখানে অপরাধের ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল তিন মাসের পরিকল্পনার পরিণতি। আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, হত্যার পর আট দিন ধরে মৃতদেহ লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যখন শোকার্ত পরিবারটি সন্তানের খোঁজে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। এই দীর্ঘ সময়েও আসামির মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। আসামি পক্ষের মানবিক দিকগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে বিচারক বলেন, আসামির স্ত্রী ও দুটি অবুঝ সন্তান রয়েছে। তার বৃদ্ধা মা বিচার চলাকালে প্রতিটি ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত থেকেছেন। এই দিকগুলো আমাকে ভাবিয়েছে। কিন্তু আসামি যে অপরাধ করেছে তার ভয়াবহতা এই সকল মানবিক বিবেচনাকে ছাপিয়ে গেছে। পর্যবেক্ষণে বিচারক আরো বলেন, অর্থদণ্ডের বিষয়ে আমি একটি কথা বলতে চাই। আসামির দুটি নিরপরাধ শিশু সন্তান রয়েছে, যারা এই অপরাধের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নয়। বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের ভার প্রকৃতপক্ষে তাদের ওপরই পড়বে। আইন নিরপরাধকে শাস্তি দেয় না। এই কারণে অর্থদণ্ড স্বল্প পরিমাণে ধার্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলেও আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন।
২০২৩ সালের ২১ মার্চ নিখোঁজ হয় শিশু আবিদা সুলতানা আয়নী। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাকে কোথাও পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে তার মা পাহাড়তলী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। উক্ত জিডি তদন্তে আয়নী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সবজি বিক্রেতা মো. রুবেলের সম্পৃক্তা উঠে আসে। একপর্যায়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজের ৯ দিন পর নগরীর পাহাড়তলী থানার মুরগী ফার্ম এলাকার একটি ডোবা থেকে আয়নীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই সাথে আয়নীর গায়ের একটি গেঞ্জি, এক জোড়া স্যান্ডেল, একটি কালো পায়জামা ও একটি গাড় নেভী ব্লু রংয়ের হিজাবও উদ্ধার করা হয়। মুরগির ফার্মের পাশের কাজির দিঘী এলাকাতে পোশাক কর্মী মা বিবি ফাতেমার সাথে বসবাস করতেন আয়নী। তিনি পাহাড়তলীর আব্দুল হাদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তেন। অভিযুক্ত রুবেলও একই এলাকায় বসবাস করে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করতেন। গ্রেপ্তার পরবর্তী মো. রুবেল ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। আদালতসূত্র জানায়, আয়নীর লাশ উদ্ধার পরবর্তী তার মা বিবি ফাতেমা চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–২ এ একটি নালিশি মামলার আবেদন করেন। আদালত তখন অভিযোগটিকে এফআইআর হিসেবে ট্রিট করার জন্য পাহাড়তলী থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে পুলিশ মো. রুবেলের বিরুদ্ধে অপহরণ, ধর্ষণ, খুন ও লাশ গুমের অভিযোগে চার্জশিট দাখিল করেন। পরে আদালত এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
আদালতসূত্র আরো জানায়, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে রুবেলের কাছে আয়নী একটি বিড়ালছানার আবদার করেছিল। রুবেলও তাকে সে বিষয়ে আশ্বস্ত করে। একপর্যায়ে ঘটনার দিন রুবেল তার ফুফুর খালি বাসায় ডেকে নিয়ে গিয়ে আয়নীকে ধর্ষণ চেষ্টা করে। এতে ব্যর্থ হয়ে তিনি শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। পরবর্তীতে গুমের উদ্দেশ্যে বস্তায় ভরে লাশ ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। নিজের তরকারির ভ্যানে করেই পলিথিন মুড়িয়ে আয়নীর লাশ ডোবা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন রুবেল। বাদীর আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, আসামির সর্বোাচ্চ দণ্ডের ফলে ভিকটিম ন্যায় বিচার পেয়েছে বলে মনে করছি। আদালতের এই রায়ে সন্তুষ্ঠ আমরা।












