ইপিজেড থেকে কাপড় পাচারে সংঘবদ্ধ চক্র

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ১৭ আগস্ট, ২০২৩ at ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে বছরে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকার পণ্য পাচার হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় এই রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের দেশি বিদেশি অধিকাংশ কারখানা থেকেই পাচার হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পণ্য। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কাপড় থেকে শুরু করে নানা ধরনের পণ্য বের হচ্ছে ইপিজেড থেকে। সংঘবদ্ধ এবং প্রভাবশালী একটি চক্র বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার পণ্য পাচারের সাথে জড়িত। গোয়েন্দা সংস্থা একাধিক রিপোর্ট প্রদান করলেও অসাধু চক্রটির খুঁটির জোরে সবকিছু চাপা পড়ে যাচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম ইপিজেডই দেশের প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল। ১৯৮০ সালে এটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। নগরীর দক্ষিণ হালিশহরের ৪৫৩ একর ভূমির উপর গড়ে তোলা চট্টগ্রাম ইপিজেডে প্রায় ৫শ’ শিল্প প্লট রয়েছে। ১৯৮৩ সাল থেকে চীন, জাপান, তাইওয়ান, কোরিয়া, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের প্রায় দেড়শ’ কারখানা রয়েছে। চট্টগ্রাম ইপিজেডে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় তেরো হাজার কোটি টাকা। বিপুল এই বিনিয়োগে গড়ে তোলা দেশি, দেশিবিদেশি যৌথ এবং এককভাবে বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে উঠা শতাধিক কারখানায় তৈরি পোশাক, কাপড়, সুতা, জিনস প্যান্ট, জুতা, তাবু, খেলনাসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদিত হয়। দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক ইপিজেডের বিভিন্ন কারখানায় কাজ করে। এসব কারখানায় ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে এবং এর পুরোটাই বিদেশে রপ্তানি করার কথা। শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি এবং ইপিজেডকেন্দ্রিক বিশেষ কিছু সুযোগ সুবিধার কারণে এখানে উৎপাদিত পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম হয়।

প্রচলিত শুল্কহারের পুরোটাই পরিশোধসহ বিশেষ কিছু শর্তে ইপিজেড এ উৎপাদিত পণ্যের খুব সামান্য একটি শতাংশ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে। শুল্ক পরিশোধ ব্যতীত ইপিজেড থেকে কোন পণ্যই বাইরে আসার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রচলিত নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে সংঘবদ্ধ একটি চক্র চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে কোটি কোটি টাকার পণ্য বাইরে নিয়ে আসে। নানা পথে নানা পন্থায় এসব পণ্য চট্টগ্রাম এবং ঢাকার বড় বড় কাপড়ের বাজারে বিক্রি হয়। বিক্রি হয় খোলাবাজারেও। চট্টগ্রামের টেরিবাজার এবং ঢাকার ইসলামপুরের কাপড়ের বাজারের বড় অংশ দখল করে রয়েছে চট্টগ্রাম ইপিজেডের কাপড়। নগরীর আগ্রাবাদ এবং জিইসি মোড়ের ফুটপাতের জুতার বিশাল বাজার ছাড়াও নগরীর অভিজাত বিপনী বিতানগুলোতে থরে থরে শোভা পায় ইপিজেডের জুতাসহ নানা পণ্য। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে কোটি কোটি টাকার কাপড়সহ নানা পণ্য বেরিয়ে আসলেও ধরা পড়ার পরিসংখ্যান একেবারে নগণ্য। গত সোমবার নগরীতে ৫৫ লাখ টাকার কাপড়ের রোল ধরা পড়েছে।

সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা ইপিজেড থেকে কাপড় পাচারের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য উপাত্ত উল্লেখ করে বেশ আগে একটি রিপোর্ট প্রেরণ করেছে। এতে ইপিজেডের পণ্য কি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বিভিন্ন কারখানার মালিক এবং সংঘবদ্ধ জুট ব্যবসায়ী চক্রকে দায়ী করা হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি মালিকদের অধিকাংশই ইপিজেড থেকে নানা পন্থায় কাপড়সহ নানা পণ্য পাচার করে।

চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে প্রতিদিনই ঝুট বের করা হয়। কোন না কোন কারখানার ঝুটের চালান বের করে বাইরে আনা হয়। কারখানা থেকে জুট এবং ময়লা বের করার কথা বলে ভিতরে পণ্য ঢুকিয়ে পাচার করে দেয়া হয়। বাইরে ওয়াশিং এ নিয়ে যাওয়ার কথা বলেও পাচার হয় পণ্য। প্রতিদিনই কাভার্ডভ্যান ভর্তি করে কাপড় নিয়ে আসা হয়। এসব দেখেও দেখে না সংশ্লিষ্টরা। বিভিণ্ন সময় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে দুয়েকটি চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশ চালানই গন্তব্যে পৌঁছে যায়। ছোট কাভার্ডভ্যান বা বড় কাভার্ড ভ্যানের জন্য রেট নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত হারে টাকা পরিশোধ করে ইপিজেড থেকে পণ্য পাচার করা হয় বলেও ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। ঝুটের আড়ালে বের করে আনা কাপড় নামসর্বস্ব কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও ঢাকায় পাচার করা হয়। বিভিন্ন যানবাহন চেক করা হলেও কুরিয়ারের গাড়িগুলো নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে অবৈধপথে পণ্য পাচারকারী চক্রের মূল হোতা হিসেবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় পণ্য পাচারসহ নানা কারণে থানায় মামলা হয়েছে। তবে চক্রের মূল হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। সুমন, হুমায়ুন, তাজু এবং আনোয়ারসহ বেশ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সুমন এবং তাজু বছরের পর বছর ধরে ইপিজেড থেকে পণ্য পাচারের সাথে জড়িত বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। এরমধ্যে সুমনের বিরুদ্ধে দুদকেও অভিযোগ জমা পড়েছে।

কারখানার মালিক, কর্মকর্তা, কাস্টমস, বেপজা এবং পুলিশের একাধিক অসাধু কর্মকর্তা এবং কর্মচারীও পণ্য পাচার নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, বিশাল এই চক্র অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। এই চক্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া কঠিন। তাই ইচ্ছে থাকলেও অনেক কর্মকর্তাই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না বলেও সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে গত সোমবার বেপজার একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। তবে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, ইপিজেড থেকে নানাকাজে পণ্য বের করা হয়। এরমধ্যে কোনটি পাচার কিংবা কোনটি কাজে বের হচ্ছে তা দেখার সুযোগ আমাদের নেই। কাস্টমস বিষয়টি তদারক করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইপিজেড কাস্টমসের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ঘটনা ঘটে। তবে আপনারা যেভাবে বলছেন সেভাবে এখানে কোন পাচারের ঘটনা ঘটে না বলে তিনি দাবি করেন। কোন সংস্থার রিপোর্ট নিয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি।

ইপিজেড থানা পুলিশ বলেছে, কাপড় পাচারের ঘটনা শুনলেই আমরা অভিযান চালাই। বিভিন্ন সময় বহু কাপড় আমরা জব্দ করেছি। তবে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কিছু পণ্য পাচার হয়ে যায় বলেও পুলিশ স্বীকার করেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনির্বাচনকে উসিলা করে বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ চায় ওরা : শেখ হাসিনা
পরবর্তী নিবন্ধআনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক জোনের অবকাঠামো নির্মাণ সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে