অন্য কোনো দুনিয়ার সুড়ঙ্গ?

অর্ক রায় | বুধবার , ৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ

রাতের খোলা আকাশের দিকে তাকালে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোটি কোটি নক্ষত্রখচিত এক অপার রহস্যময় ক্যানভাস। আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবী, সবুজ অরণ্য, নদী কিংবা মানবসভ্যতার যাবতীয় অহংকার সবকিছুই এই মহাবিশ্বের বিশালতার কাছে এক ফোঁটা ধূলিকণার সমান। কিন্তু এই অনন্ত আকাশের বুকে এমন কিছু অতিপ্রাকৃত ও অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে, যা মানুষের কল্পনাশক্তিকেও হার মানায়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের তেমনই এক সবচেয়ে আকর্ষক, ভীতিপ্রদ এবং পরম রহস্যময় চরিত্র হলো ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। খালি চোখে যা কেবলই এক গাঢ় অন্ধকার শূন্যতা, কিন্তু যার বুকের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে স্থান, কাল এবং পদার্থবিজ্ঞানের সমস্ত চেনা নিয়মকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কৃষ্ণগহ্বর হলো মহাবিশ্বের এমন এক অঞ্চলের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র, যার আকর্ষণ বল এতই প্রবল এবং ভয়ানক যে এর নাগপাশ থেকে আলোর কণিকা ফোটন পর্যন্ত একবার ভেতরে ঢুকে পড়লে আর কখনো ফিরে আসতে পারে না। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, অত্যন্ত ভারী কোনো নক্ষত্র যখন তার জীবনের জ্বালানি পুড়িয়ে শেষ করে ফেলে, তখন তার নিজের প্রচণ্ড ওজনের ভারেই সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। মহাকর্ষের চরম টানে সেই নক্ষত্রটি নিজের ভেতর নিজেই চুপসে বা ধসে পড়তে শুরু করে। এভাবেই জন্ম নেয় একটি কৃষ্ণগহ্বর। এর ঠিক সীমানাটিকে বলা হয় ‘ঘটনা দিগন্ত’ এটি হলো সেই অদৃশ্য সীমান্তরেখা, যে রেখা একবার পার হয়ে গেলে এই মহাবিশ্বের আর কোনো কিছুর পক্ষেই বাইরে ফিরে আসা সম্ভব নয়। যেন মহাবিশ্বের এক মহাশূন্যের চোরাবালি, যা তার চারপাশের সবকিছুকে গিলে খাওয়ার জন্য হাঁ করে বসে আছে।

কিন্তু মুশকিল হলো, বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে মানুষের রোমাঞ্চ ততই গভীর হয়েছে। একসময়ের বিজ্ঞানীরা ভাবতেন কৃষ্ণগহ্বর বুঝি কেবলই সর্বগ্রাসী এক রাক্ষস, যা তার আশপাশের সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু বর্তমান শতকের বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন হকিং আমাদের চোখ খুলে দিলেন। তিনি গাণিতিক যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করলেন যে কৃষ্ণগহ্বরগুলো চিরতরে সবকিছুর সমাপ্তি ঘটায় না; বরং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়মে এগুলোর শরীর থেকেও একধরনের বিকিরণ বা শক্তি নিঃসারিত হয়, যা আজ ‘হকিং বিকিরণ’ নামে পরিচিত। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, কোটি কোটি বছর ধরে তিল তিল করে বাষ্পীভূত হয়ে একসময় এই দানবীয় কৃষ্ণগহ্বরগুলোও চিরতরে মিলিয়ে যেতে পারে। পদার্থবিজ্ঞান এবং কোয়ান্টাম জগতের এই অদ্ভুত মেলবন্ধন বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হলো, কৃষ্ণগহ্বর কেবল ধ্বংসের প্রতীক নয়; অনেকের মতে এটি হতে পারে মহাবিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বা অন্য কোনো সমান্তরাল দুনিয়ায় যাতায়াত করার জাদুকরি সুড়ঙ্গ বা ‘ওয়ার্মহোল’। আইনস্টাইনের তত্ত্বেও এই স্থান–কালের সুড়ঙ্গের কথা বলা হয়েছে। যদি কোনোভাবে ব্ল্যাক হোলের ভেতরের সেই প্রচণ্ড অভিকর্ষ বলের মুখে পুড়ে ছাই না হয়ে কেউ এর অন্যপ্রান্তে বের হয়ে যেতে পারে, তবে সে হয়তো পৌঁছে যাবে সম্পূর্ণ অচেনা কোনো গ্যালাক্সিতে বা অন্য কোনো কালপ্রবাহে। যদিও বর্তমান প্রযুক্তির বিচারে এটি পুরোপুরি অসম্ভব এবং কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনায়, তবুও মানুষের কৌতূহলী মন এই ভাবনাকে নিয়েই মেতে থাকে।

কৃষ্ণগহ্বর আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে এই মহাবিশ্ব কেবল নিয়মমাফিক চলা কোনো ঘড়ি নয়, বরং এটি এক অনন্ত রহস্যের গোলকধাঁধা। বিজ্ঞান আমাদের শেখায় কীভাবে যুক্তির আলো দিয়ে এই অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। বাংলাভাষী পাঠকদের কাছেও মহাবিশ্বের এই মহানাটক আজ কেবল কোনো জটিল গবেষণাগারের বিষয় নয়, বরং এটি মানব মনের অদম্য কৌতূহল এবং অজানাকে জানার চিরন্তন নেশার এক অনন্য কাব্য হয়ে বেঁচে আছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধব্যাঙামি ও ব্যাঙি
পরবর্তী নিবন্ধরাউজান বজলুর রহমান (রহ.) স্মৃতি সংসদের অভিষেক অনুষ্ঠান