‘লুজার’ শব্দটি হয়তো অনেকের কানে একটু অস্বস্তিকর শোনাতে পারে। কারণ সমাজে আমরা সাধারণত মানুষকে শ্রেণিবিন্যাস করি অর্থ, ক্ষমতা, পেশা, শিক্ষা কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে। কিন্তু এর বাইরেও মানুষের একটি অদৃশ্য শ্রেণি আছে। যাদের কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় নেই, অথচ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, বেঁয়াড়া মন্তব্য কিংবা অন্যের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার।
কিছু মানুষ আছেন, যারা কোথাও পুরোপুরি আপন হতে পারেন না, আবার পুরোপুরি পরও হয়ে থাকতে পারেন না। তারা যেন সম্পর্কের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। প্রয়োজনের সময় তাদের কথা মনে পড়ে, অথচ প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের অস্তিত্বও যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। কোনো আড্ডায় তারা থাকেন, কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন না; কোনো কাজে তারা যুক্ত থাকেন, কিন্তু কৃতিত্বের তালিকায় তাদের নাম থাকে না। কখনো কখনো নিজের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যের অবমূল্যায়নের শিকার হন। এভাবেই একসময় মানুষের মনে জন্ম নেয় এক ধরনের হীনম্মন্যতা ‘আমি কি সত্যিই অযোগ্য?’ অথচ প্রশ্নটি অনেক সময় নিজের কাছে না করে সমাজের আয়নার দিকে তাকানো প্রয়োজন। কারণ সমাজ সবসময় যোগ্যতার নিরপেক্ষ বিচারক নয়। এখানে কখনো পরিচয় যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, কখনো তোষামোদ সত্য কথার চেয়ে বেশি মূল্য পায়, আবার কখনো নীরব মানুষকে দুর্বল ভেবে তার ওপর অন্যায় আচরণ করা হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, জীবনের সব ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে হবে। মানুষকে নিজের অবস্থানের প্রতিও সৎ হতে হবে। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার মতো সাহস যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের সামর্থ্যকে চিনে নেওয়ার বোধও জরুরি। কারণ আত্মসমালোচনা মানুষকে ছোট করে না; বরং আত্মউন্নতির দরজা খুলে দেয়।
তাই ‘লুজার’ হওয়ার ভয় নয় বরং নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলার ভয় থাকা উচিত। অন্যের দেওয়া তকমা মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। মানুষকে শেষ পর্যন্ত মূল্যায়ন করে তার কাজ, যোগ্যতা, সততা, চিন্তা এবং আত্মমর্যাদা। জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং গতকালের নিজের চেয়ে আজ একটু ভালো হয়ে ওঠা। নিজের জায়গা নিজেকেই তৈরি করতে হয়। কারণ পৃথিবী সবসময় দরজা খুলে অপেক্ষা করে না, অনেক সময় দরজাটা নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়। আর সেখানেই ‘লুজার শ্রেণি’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম শিক্ষা অন্যের চোখে নিজের মূল্য খোঁজা নয়, নিজের যোগ্যতার আয়নায় নিজেকে দেখতে শেখা।












